kalerkantho


রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনদের মত

ব্যক্তি নিয়ে নয়,প্রশ্ন তড়িঘড়িতে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ব্যক্তি নিয়ে নয়,প্রশ্ন তড়িঘড়িতে

কে এম নুরুল হুদা

কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) কেমন হলো—এ প্রশ্নের জবাবে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের বক্তব্য হচ্ছে, এ কমিশনের মূল্যায়ন হবে তাদের কাজকর্ম দেখে। কমিশনের সদস্যরা কতটা সাহসিকতার সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেটা দেখার পরই বলা যাবে এই কমিশন কেমন হলো।

কারো মতে, এই কমিশনের নিরপেক্ষতাও নির্ভর করবে নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতার ওপর।

নবগঠিত ইসি নিয়ে বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। এক পক্ষ বলছে, যাঁদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হলো, তাঁরা ব্যক্তি হিসেবে কেমন তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। তবে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়েছে। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তড়িঘড়ি করে। সার্চ কমিটিকে দেওয়া সুধীসমাজের মতামতের প্রতিফলন নেই এই নিয়োগপ্রক্রিয়ায়। আরেক পক্ষ বলছে, এবারের নিয়োগপ্রক্রিয়াটি ছিল এক ধরনের এসিড টেস্টের মতো। এ টেস্টে উত্তীর্ণ যোগ্য ব্যক্তিরাই নিয়োগ পেয়েছেন। নতুন ইসি নৈতিক দায়িত্ব থেকে ভালো কাজ করবেন বলে তাদের আশা।

 

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘নতুন নির্বাচন কমিশনে বিএনপির প্রস্তাব করা নাম থেকে যেমন একজন নিয়োগ পেয়েছেন, আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত নাম থেকেও তেমন একজনই নিয়োগ পেয়েছেন। তবু বিএনপি সমালোচনা ছাড়তে পারেনি। এটা তাদের পুরনো অভ্যাস। তারা যেসব নাম প্রস্তাব করেছে তাঁদের সবাইকে নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলেও বিএনপি মানত না। ’

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (এনএসইউ) দুই দিনব্যাপী সিভিল ফেস্টের সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের এসব কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, ‘এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে বিএনপি অবশ্যই নির্বাচনে যাবে বলে মনে করি। বিএনপির নেতাদের যাঁদের বুদ্ধিসুদ্ধি আছে, তাঁরা আর কোনো ভুল করবেন না। ’ ওবায়দুল কাদের প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘শুনলাম, নতুন সিইসি নুরুল হুদাকে জনতার মঞ্চের লোক বলা হচ্ছে। বিএনপি কি তাহলে জনতার বাইরের লোক?’

অন্যদিকে বিএনপির পক্ষে দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, নতুন সিইসি জনতার মঞ্চের নেতা ছিলেন। নির্বাচন কমিশন খারাপ-ভালো যাই হোক না কেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিরপেক্ষ না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দুদু এ কথা বলেন। তিনি বলেন, দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন করলে কেমন নির্বাচন হয় তা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দেখা গেছে। এ কারণেই একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও যাঁদের সহযোগী কমিশনার হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে, তাঁদের সহায়তা করার জন্য নিরপেক্ষ-নির্দলীয় সরকার দরকার। যাতে সবার গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা যায়।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একাংশের সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সব রাজনৈতিক দলের মত নিয়ে সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতি গঠিত নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়ে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক। যোগ্য, দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিরাই নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁরা নিরপেক্ষ থেকে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবেন। গতকাল সচিবালয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি সাংবাদিকদের আরো  বলেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সংবিধান প্রদত্ত এখতিয়ারে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। এর আগে সব দলের মতামত নিয়েছেন। এটি রাষ্ট্রপতির মহানুভবতা। এখন বিএনপির আগামী  নির্বাচনে না আসার আর অজুহাত রইল না। ’

জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে নতুন নির্বাচন কমিশনারদের স্বাগত জানালেও দলটির কো-চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী জি এম কাদের বলেছেন, তাঁদের কাজের মাধ্যমেই ভবিষ্যতে মূল্যায়ন করবে দেশবাসী।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার নতুন সিইসিকে একজন সৎ ব্যক্তি উল্লেখ করে বলেন, ‘তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁকে আমি ব্যক্তিগতভাবেও ভালো মানুষ হিসেবে জানি। আমাদের প্রস্তাবিত নাম এখানে আসছে কি না, তা দেখার বিষয় নয়। যাঁদের ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তাঁরা যদি সুন্দর-সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারেন এবং জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেন তাহলেই আমাদের প্রস্তাব সমাদৃত হবে। ’ নির্বাচন কমিশনার হিসেবে একজন নারীকে নিয়োগ দেওয়ায় স্বাগত জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এটি একটি ভালো দৃষ্টান্ত। মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে আমরা এ জন্য অভিনন্দন জানাই। ’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘এই কমিশনের ওপর দায়িত্ব অনেক। সবাই ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার বিশ্বাস, কমিশন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারবে। ’ তিনি আরো বলেন, সবাইকে কেউ খুশি করতে পারবে না। তবে রাষ্ট্রপতি যাঁদের বেছে নিয়েছেন, সব রাজনৈতিক দল তাঁদের গ্রহণ করবে বলে তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ বলেছেন, ব্যক্তিগত বিবেচনা ও পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে কোনো সংস্থা গঠিত হলে তার কাজকর্ম সম্পর্কে আগাম মূল্যায়ন করা দুষ্কর। তাই নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে সিপিবি আগাম মূল্যায়নমূলক মন্তব্য করতে পারছে না। নির্বাচন কমিশন ভবিষ্যতে কেমনভাবে তার দায়িত্ব পালন করে তা দেখেই সিপিবি তার মূল্যায়ন জানাবে। সিপিবির মতে, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দিয়েছেন। সিপিবি নেতারা আশা করেন, নতুন নির্বাচন কমিশন তার মেরুদণ্ড শক্ত রেখে অবাধ-নিরপেক্ষ-গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেছেন, নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাও নির্ভর করবে নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতার ওপর। সরকার নিরপেক্ষ না হলে নির্বাচনকালীন যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় জড়িত হয় তাদের পক্ষে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়। সামনের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হলে শুধু সরকার নয়, নির্বাচন কমিশনেরও বিচার দেশের ১৭ কোটি মানুষ গণ-আদালতে অনুষ্ঠান করবে।

নতুন নির্বাচন কমিশনকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব এম এ আউয়াল এমপি বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনই প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে। আর সরকার সহায়তা করে থাকে। আমরা তাদের সহায়তা করব। আশা করছি, এবারও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে। তারা নিরপেক্ষ থেকে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে। ’

ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়াকে ইতিবাচক হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির আাান্তরিকতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।  

এদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনে যাঁরা নিয়োগ পেলেন, ব্যক্তি হিসেবে তাঁরা কেমন, তাঁরা কী করবেন তা বলা দুরূহ। এঁদের সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই। তবে যে প্রক্রিয়ায়, যেভাবে তাড়াহুড়ো করে এ নিয়োগ দেওয়া হলো তা প্রশ্নাতীত নয়। আমরা সার্চ কমিটির কাছে যেসব প্রস্তাব রেখেছিলাম, তার কোনো প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি না। কোনো মানদণ্ডের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনে এঁদের বেছে নেওয়া হলো সেটা আমরা এখনো জানি না। আমরা সার্চ কমিটিকে বলেছিলাম, যাঁদের নাম সুপারিশ করা হবে তাঁদের সম্পর্কে তথ্য যেন আগেই প্রকাশ করা হয়। যাতে নিয়োগের আগেই প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে জনগণ জানতে পারে। কিন্তু এত তড়িঘড়ি করে কেন নিয়োগ সম্পন্ন করা হলো সে প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছি না। এ অবস্থায় আমাদের সঙ্গে সার্চ কমিটির যে মতবিনিময় তা কি শুধুই লোকদেখানো—এ প্রশ্নও রয়েছে। ’

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদ বা জানিপপের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহর অবশ্য ভিন্নমত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এবার এক ধরনের অ্যাসিডটেস্টের মতো কঠিন পরীক্ষা, যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। সার্চ কমিটির চুলচেরা বিশ্লেষণের পর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে প্রস্তাবিত ১০ জনের মধ্যে পাঁচজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে টানটান উত্তেজনারও অবসান হয়েছে। আমরা আশা করব, এই নির্বাচন কমিশন বিদায়ী নির্বাচন কমিশনের ভুল-ত্রুটিগুলোর পুনারাবৃত্তি ঘটাবে না। ’

নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ আরো বলেন, ‘এবার দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একজন অভিজ্ঞ সাবেক সেনা কর্মকর্তাকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি আগে নির্বাচন সম্পর্কিত কাজে যুক্ত ছিলেন। সব মিলিয়ে আমার বিবেচনায় যোগ্য ব্যক্তিদের একটি ভালো দল এবারের নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পেয়েছে। অতীতে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে তাঁরা সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আশা করছি, নির্বাচন কমিশনেও তাঁরা সফল হবেন। ’


মন্তব্য