kalerkantho


ভাষা আন্দোলনই বিপ্লবের কৌশল শিখিয়েছে

অসিত কুমার দেব

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভাষা আন্দোলনই বিপ্লবের কৌশল শিখিয়েছে

‘১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সরকারি বাহিনী যখন ছাত্রদের মিছিলে গুলি করে তখন দাবানলের মতো ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। পরদিন আমরাও স্কুল থেকে মিছিল বের করি।

আমি তখন ময়মনসিংহের মৃত্যুঞ্জয়ী হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। ২৩ ফেব্রুয়ারি ডিসি অফিস ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে স্কুল থেকে মিছিল নিয়ে বের হই। অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থী ছাড়াও শত শত জনতা কর্মসূচিতে অংশ নেয়। ডিসি অফিস ঘেরাওকালে আমিসহ ১৬-১৭ জনকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। প্রথমে কোতোয়ালি থানায় নেওয়া হয়। সেখানে অনেক লোক আমাদের দেখতে যায়। থানা থেকে পরে আমাদের জেলখানায় নেওয়া হয়। চার দিন পর আমাদের আদালত থেকে জামিন দেওয়া হয়। কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মন্মথ দে, আমাদের স্কুলের হেডমাস্টার গোপীনাথ দত্তসহ সংশ্লিষ্ট সবাই জামিনের জন্য চেষ্টা করেছেন। ’ ভাষা আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনের এসব কথা শোনালেন ভাষাসৈনিক অসিত কুমার দেব। ৯১ বছর বয়সী এই ভাষাসৈনিক জানান, জেলখানায় বাঙালি পুলিশ সদস্যরা তাদের কোনো মারধর করেনি। ভাষার জন্য আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় উল্টো আপ্যায়ন করেছে। ভাষা আন্দোলনই স্বাধীনতাসংগ্রামের বীজ বুনে দিয়েছিল। এ আন্দোলনের সময় কিভাবে বিপ্লব করতে হয়, নিজের অধিকার আদায় করতে হয়, সেই চেতনা জাগিয়ে দিয়েছিল। বর্তমানে শেরপুরের নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা বাজারের কাছে বন্দটেকি গ্রামের বাড়িতে বসবাস করেন অসিত কুমার দেব। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করছেন। প্রতিষ্ঠানিকভাবে অবসর নিলেও মনের টান ছাড়তে পারেননি। এখনো বাড়িতে এলাকার ছাত্রদের ইংরেজি পড়ান।

জানা গেল, বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মন্মথ দের মাধ্যমে অসিত কুমার দেবের রাজনীতিতে হাতেখড়ি। সংবাদ সম্পাদক প্রয়াত বজলুর রহমান ছিলেন তাঁর সহপাঠী। তাঁদের ছিল গলায় গলায় ভাব। নকলার চরমধুয়া গ্রামে ছিল মন্মথ দের বাড়ি, যিনি স্থানীয়দের কাছে ‘পাচুদা’ নামেই পরিচিত ছিলেন।

চন্দ্রকোনায় বাড়ির বসতঘরের বারান্দায় বসে আলাপকালে অসিত কুমার দেব জানান, মন্মথ দের মাধ্যমেই আমার কমিউনিস্ট আন্দোলনের হাতেখড়ি। আগে চন্দ্রকোনা এলাকা ছিল একটা রাজনৈতিক মঞ্চ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের চারণক্ষেত্র ছিল চন্দ্রকোনা। এখানে কমিউনিস্ট পার্টি, ফরোয়ার্ড ব্লক, কংগ্রেসের অফিস ছিল। ছোট থেকেই আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয় ছিলাম। লুকিয়ে লুকিয়ে কমিউনিজমের পক্ষে কাজ করতাম। আমাদের বাড়িতে মন্মথ দে, মণি সিংহদের যাতায়াত ছিল। বজলুর রহমানসহ আমরা একসঙ্গে পার্টির কাজ করতাম। বজলুর ডাকনাম ছিল আবু। ও এসে আমাকে পার্টির কাগজপত্র দিয়ে যেত। আমি সেগুলো মানুষের মাঝে বিলি করতাম। এভাবেই রাজনীতির পাঠ শুরু।

অসিত কুমার দেব বলেন, ময়মনসিংহ শহরের মহারাজা প্যালেসের পেছনে গোলপুকুর পাড়ের কাছে আমাদের ভাড়া বাসা ছিল। ওখানে থেকেই পড়ালেখা করতাম। ময়মনসিংহে ভাষা আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে ছিলেন ১৬-১৭ জন। তাঁদের মধ্যে আমিও ছিলাম। সহপাঠী হিসেবে আন্দোলনে যাঁরা ছিল তাদের মধ্যে যোগেন ও সৌমেনের নাম এখনো মনে আছে। বাকিদের নাম ভুলে গেছি। আমাদের নেতা ছিলেন কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহ, মন্মথ দে ও অজয় রায়। তাঁরা আমাদের গাইড করতেন। ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’—ঢাকায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এমন ঘোষণার পর ঢাকাসহ সারা দেশের ছাত্র-জনতা উত্তাল হয়ে ওঠে। আমরা তখন প্রায় দিনই মৃত্যুঞ্জয় স্কুল থেকে বের হয়ে মিছিল করতাম। অন্য স্কুলগুলোতে গিয়ে ছাত্রদের মিছিলের জন্য বের করে আনতাম। কেবল জিলা স্কুলেই আমরা সুবিধা করতে পারতাম না। এ ছাড়া সব স্কুল থেকেই ছাত্ররা আমাদের মিছিলে শামিল হয়েছে। আমরা মিছিল করি, শুরুতে এটা স্কুল কর্তৃপক্ষ চাইত না। কিন্তু শরীরচর্চা শিক্ষক গোপাল বোস আমাদের খুব সহায়তা করেছেন। পাচুদা (মন্মথ দে) ও মণি সিংহ তাঁকে অনেক বুঝিয়েছেন। এখন গোপাল স্যারের কথা খুব মনে পড়ে। তিনি সহযোগিতা না করলে আমরা তখন আন্দোলনে শামিল হতে পারতাম না।

নিভৃত পল্লীতে থাকা এ ভাষাসৈনিক অনেকটা আড়ালেই পড়ে আছেন। কখনো একুশে ফেব্রুয়ারির কোনো অনুষ্ঠানেও ডাক পড়ে না তাঁর। জেলা পর্যায়ে সরকারিভাবে প্রতিবছর যে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়, সেখানেও তাঁকে ডাকা হয় না। অবশ্য এ নিয়ে অসিত কুমার দেবের কোনো খেদও নেই। বললেন, জানি না, আমি ভাষাসৈনিক কি না। তবে সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি, মিছিল করেছি, জেল খেটেছি। আমি নীরবে-নিভৃতে চলতেই পছন্দ করি। ওসব টানাটানি ভালো লাগে না। বিশ্বদরবারে আজ ২১ ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এতেই আমি দারুণ তৃপ্ত।  

শিক্ষা সনদ অনুসারে ১৯৩৫ সালের ৭ জুলাই নকলার চন্দ্রকোনা এলাকার দেববাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন অসিত কুমার দেব। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। বর্তমানে তিনিসহ দুই ভাই বেঁচে আছেন। আরেকজন ভারতে থাকেন। অসিত দেবের দুই ছেলে, উভয়েই চন্দ্রকোনা কলেজে শিক্ষকতা করছেন।  

অসিত দেব জানান, কয়েক স্কুল ঘুরে ১৯৫১ সালে তিনি ময়মনসিংহের মৃত্যুঞ্জয়ী স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। বায়ান্নতে দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে আনন্দ মোহন কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন। সেখান থেকে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে বিএ পাস করে ঢাকায় টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড করেন। ১৯৫৯ সালে চন্দ্রকোনা রাজলক্ষ্মী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৬২-৬৩ সালে ছয় মাস দৈনিক সংবাদে শিক্ষানবিশ সাব-এডিটর হিসেবে কাজ করেছেন। পরে নকলার গণপদ্দি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেখান থেকে পরে চন্দ্রকোনা রাজলক্ষ্মী উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শেষের দিকে এলাকার একটি কেজি স্কুলে সাত বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে শিক্ষকতা থেকে পুরোপুরি অবসর নেন। এখন বাসায় একটি ব্যাচে চার-পাঁচজনকে ইংরেজি পড়ান।

কিভাবে অবসর কাটছে—জানতে চাইলে অসিত কুমার দেব বলেন, নাতি-নাতনিকে নিয়ে ঘুরে বেড়াই। গরু লালন-পালন করি। আর বই পড়ি। এভাবেই কাটছে অবসর। জমিজমা থেকে যা ফসল পাই তা দিয়েই চলে যায়। তবে শিক্ষক মানুষ, বসে থাকতে মন চায় না। তাই কয়েকজনকে প্রাইভেট পড়াই।

কথায় কথা চলে আসে বর্তমান সময়ের রাজনীতি আর রাজনীতিকদের কথা। এই ভাষাসৈনিক বলেন, তখন যাঁরা রাজনীতি করতেন, তাঁদের একটা আলাদা সম্মান ছিল। সবাই তাঁদের সমীহ করত। কিন্তু এখন রাজনীতির সেই সম্মান-মর্যাদা অনেক লোপ পেয়েছে। রাজনীতিবিদদের এখন আর মানুষ ভালো চোখে দেখে না। রাজনীতি বুর্জোয়াদের দখলে চলে গেছে। এ জন্য নীরবে-নিভৃতে থাকতেই পছন্দ আমার।


মন্তব্য