kalerkantho


সাক্ষাৎকার

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা করণীয় করব

কে এম নুরুল হুদা, প্রধান নির্বাচন কমিশনার

কাজী হাফিজ   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা করণীয় করব

সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য যা যা করণীয় সব কিছু করার এবং কারো কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে নতুন নিয়োগ পাওয়া কে এম নুরুল হুদা। তিনি বলেছেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য যা যা করণীয়, সাংবিধানিকভাবে ও আইনকানুনের ভিত্তিতে আমরা সব কিছুই করব।

এ বিষয়ে আমরা সবার সহযোগিতা ও সমর্থন চাই। কোনো দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার করব না। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমাকে জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের অন্য সদস্যদের সঙ্গে এ দায়িত্ব যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালনের আপ্রাণ চেষ্টা করব। ’

দেশের ১২তম সিইসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরের দিন গতকাল মঙ্গলবার কে এম নুরুল হুদা কালের কণ্ঠকে এসব কথা বলেন। রাজধানীর উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের ১/এ রোডের ২৯ নম্বর বাড়িতে থাকেন সাবেক সচিব কে এম নুরুল হুদা। সিইসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরপরই সরকারের পক্ষ থেকে ওই বাড়িতে প্রয়োজনীয়  নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনে জানিয়েছিলেন, দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত তিনি বাসায় থাকবেন। কিন্তু দুপুর পৌনে ২টায় সেখানে পৌঁছে জানা গেল তিনি তখনই বের হবেন।

তাড়াহুড়ার মধ্যেই নতুন সিইসি বললেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করাই এখন নতুন কমিশনের মূল চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে কমিশন কোনো ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। সংবিধান ও আইনকানুনের ভিত্তিতে কাজ করবে। এ ক্ষেত্রে  কোনো বিশেষ দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর গুরুত্ব থাকবে না।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ের নির্বাচনসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত জানতে চাইলে কে এম নুরুল হুদা বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো কিভাবে অ্যাড্রেস করা যায় সেটি কমিশন বৈঠকেই নির্ধারণ করতে হবে। কমিশনে আরো যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন তাঁদের সঙ্গে বসতে হবে। তাঁদের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ হয়নি। দুই-চার দিন পর এ বিষয়ে ভালো জানাতে পারব। তবে আমার নিজের ধারণা, প্রথমে আমাদের কাজের একটা ছক তৈরি করতে হবে—কখন কোনটি করব। নির্বাচন কমিশন কোন কাজ কতটা এগিয়ে রেখেছে তা এখনো জানি না। তবে আমি মনে করি, সার্বিকভাবে নির্বাচন কমিশন অনেক সমৃদ্ধ। একটা শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে কমিশন। এ কাঠামো ব্যবহার করে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। অতীতে এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। ভবিষ্যতেও তা অসম্ভব কিছু না। ’

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করতে হবে—এমনটি কখনো ভেবেছিলেন কি না জানতে চাইলে নতুন সিইসি বলেন, ‘কখনো ভাবিনি। তবে নিয়োগ পাওয়ার কয়েক দিন আগে  আমার কয়েকজন বন্ধু জানিয়েছিল তোমার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু কোন দল প্রস্তাব করেছিল তা জানায়নি। আর আমি জানতেও চাইনি। ’ সিইসি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়াকে কিভাবে দেখছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা চ্যালেঞ্জিং জব। অবশ্য আমরা আমাদের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব। সাংবিধানিক যে দায়িত্ব আমার ও নির্বাচন কমিশনের অন্য নতুন সদস্যদের ওপর অর্পিত হয়েছে তার যথাযথ মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা করব। ’

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেবেন জানতে চাইলে নুরুল হুদা বলেন, ‘এখনো তো সবার মনোভাব জানি না। দলগুলো কী ধরনের প্রতিক্রিয়া করে, কী বলে, কিভাবে সহযোগিতা করে—এসব না জেনে কিছু বলা যাবে না। আমাদের প্রতি তাদের আস্থা আছে কী নেই, কী ধরনের সুপারিশ বা পরামর্শ তাদের রয়েছে তা জেনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। আমি আশা করব, আমাদের প্রতি দলগুলোর অবশ্যই গঠনমূলক পরামর্শ থাকবে। আমরা সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করব, যাতে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণে উৎসাহী হয়। ’ রাজনৈতিক দল ও সুধীসমাজের সঙ্গে মতবিনিময় করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়েও এককভাবে আমার কিছু বলার নেই। কমিশনের সব সদস্যের সঙ্গে বসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ’

দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কঠিন বলে অনেকের যে ধারণা সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নুরুল হুদা বলেন, ‘আমার কাছে বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর গুরুত্ব নেই। আমাদের নির্বাচন কমিশন কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। আইনকানুনের ঊর্ধ্বে কোনো ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে আপস করবে না। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনি হাতিয়ার এবং এর অধীনে যে আইনগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো। কেউ আমার কাছ থেকে অন্যায্য সুবিধা পাবে না। আশা করি, আমার কমিশনের কাছ থেকেও পাবে না। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন চ্যালেঞ্জ হলেও নির্বাচিত সরকারের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে। সব দেশে তা-ই হয়, এই দেশে তা-ই হবে। দু-একটা টার্মে ডিস্টার্ব হবে। এরপরে আশা করি ঠিক হয়ে যাবে। ’

নতুন সিইসি কে এম নুরুল হুদা গত সোমবার রাতে নিয়োগ পাওয়ার পরপরই কালের কণ্ঠকে বলেছিলেন, ‘সবাইকে নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারব বলে আশা করি। নিরপেক্ষ ও সাংবিধানিকভাবে কাজ করাই  হবে আমার লক্ষ্য। আমাকে ও আমার কাজ নিয়ে কোনো বিতর্ক হবে না বলেই আমার প্রত্যাশা। ’ ওই রাতেই তিনি জানান, একসময় তিনি ফরিদপুর ও কুমিল্লার ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সংসদ সচিবালয় এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে। ২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তাঁকেসহ আরো অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তাঁরা চাকরি ফিরে পান। সচিব হিসেবে অবসর নেওয়ার সময় তাঁর চাকরি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত ছিল।

কে এম নুরুল হুদা ১৯৭৩ সালে প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে। সচিব পদ থেকে অবসর নেন ২০০৬ সালে। অবসরের পর তিনি মাল্টিসেক্টরাল প্রাইভেট কম্পানি জেমকনের মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড প্রজেক্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

নুরুল হুদার জন্ম ১৯৪৮ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যান বিভাগে সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকেও উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর জন্ম পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার নওমালাতে। তিনি একাত্তরে মুক্তিযদ্ধে অংশ নেন। এলাকায় তাঁর বাবা আবদুর রশিদ খানের নামে একটি ডিগ্রি কলেজ রয়েছে।


মন্তব্য