kalerkantho


সিইসিসহ ৪ কমিশনারের নাম একাধিক দলের

তৈমুর ফারুক তুষার   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সিইসিসহ ৪ কমিশনারের নাম একাধিক দলের

সার্চ কমিটির কাছে জমা দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবিত নামের তালিকা থেকেই পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন করা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ (সিইসি) পাঁচজনের নামই একাধিক দলের প্রস্তাবিত তালিকায় ছিল। তবে সিইসি নিয়োগে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ক্ষমতাসীন ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি, তরীকত ফেডারেশন ও ন্যাপ এবং জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রস্তাবে ছিল সিইসি কে এম নুরুল হুদার নাম। গতকাল মঙ্গলবার প্রায় দুই ডজন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

গত সোমবার সাবেক সচিব কে এম নুরুল হুদাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সাবেক সচিব রফিকুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব তালুকদার, অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ বেগম কবিতা খানম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদৎ হোসেন চৌধুরীকে নির্বাচন কমিশনার করে ইসি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। ইসি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে গত ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করেন। কমিটির আহ্বানে সাড়া দিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইসি গঠনের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি করে নামের তালিকা জমা দেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবিত নামের মধ্যে অন্তত চারটি দল সিইসি হিসেবে নুরুল হুদার নাম প্রস্তাব করেছিল। জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাপ ও তরীকত ফেডারেশন তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিল। মাহবুব তালুকদারের নাম প্রস্তাব করেছিল বিএনপি।

রফিকুল ইসলামের নাম প্রস্তাব করেছিল পাঁচটি দল। দলগুলো হলো জাতীয় পার্টি, জাসদ (ইনু), সাম্যবাদী দল, তরীকত ফেডারেশন ও জাতীয় পার্টি (জেপি)। বেগম কবিতা খানমের নাম প্রস্তাব করেছিল আওয়ামী লীগ, সাম্যবাদী দল, ন্যাপ ও গণতন্ত্রী পার্টি। শাহাদৎ হোসেন চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেছিল সাম্যবাদী দল ও গণতন্ত্রী পার্টি।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবিত নামের তালিকা ঘেঁটে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ১৪ দলের শরিক দলগুলোর প্রস্তাবিত তালিকায় একাধিক নামের মিল ছিল। তবে শরিক দলগুলোর নেতারা বলছেন, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নামের তালিকা তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন রাজপথে একসঙ্গে কাজের মধ্য দিয়ে দলগুলোর মধ্যে চিন্তার ঐক্য গড়ে উঠেছে। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করেন এমন সৎ, যোগ্য, নির্দলীয় ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে খানিকটা মিল থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।

সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সার্চ কমিটির কাছে যে নামগুলো প্রস্তাব করেছিলাম তার মধ্য থেকে তিনজন নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। আমাদের তালিকায় রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও শাহাদৎ হোসেন চৌধুরীর নাম ছিল। ’

গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সার্চ কমিটির কাছে দেওয়া আমাদের নামের তালিকা থেকে দুজন নির্বাচন কমিশনে স্থান পেয়েছেন। কবিতা খানম ও শাহাদৎ হোসেন চৌধুরীর নাম আমরা প্রস্তাব করেছিলাম। কর্মজীবনে সততার কারণে কবিতা খানমকে আমরা তালিকায় স্থান দিই। আর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদৎ চৌধুরীকে রেখেছিলাম চারদলীয় জোট সরকারের আমলে যে ভুয়া ভোটার তালিকা তৈরি হয়েছিল তা বাদ দিয়ে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কারণে। ’

সার্চ কমিটির কাছে ১৪ দলের একাধিক শরিক দলের প্রস্তাবিত নামের তালিকার সঙ্গে গণতন্ত্রী পার্টির নাম মিলে যাওয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমরা নিজেদের মধ্যে কোনো আলোচনা করে নামের তালিকা করিনি। যেহেতু আমরা দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে মাঠে আছি, রাজনীতি করছি সুতরাং আমাদের মধ্যে চিন্তার ঐক্য আছে, নীতিগত মিল আছে। সে কারণেই অন্যদের সঙ্গে নাম মিলে গিয়ে থাকতে পারে। ’

নবগঠিত ইসির চার নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে একজনের নাম জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রস্তাবিত তালিকায় ছিল। দলটির মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সার্চ কমিটির কাছে যে তালিকা জমা দিয়েছি সেখানে রফিকুল ইসলামের নাম আছে। আমরা চেয়েছিলাম এমন ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন হোক, যাঁরা শুধু সৎ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিই নন, শক্ত হাতে নির্বাচন পরিচালনা করতেও সক্ষম। সে বিবেচনা করেই আমরা সার্চ কমিটির কাছে পাঁচজনের একটি নামের তালিকা জমা দিয়েছিলাম। ’ 

তরীকত ফেডারেশনের মহাসচিব এম এ আউয়াল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের তালিকা থেকে সিইসিসহ তিনজনকে নির্বাচন কমিশনে রাখা হয়েছে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সৎ, যোগ্য, কর্মক্ষম ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব করেছিলাম। রাষ্ট্রপতি যে সার্চ কমিটি গঠন করেছেন তাতে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই স্থান পেয়েছেন। তাঁরা চাকরিজীবনে কোনো ধরনের অন্যায় করেননি। সিইসি কে এম নুরুল হুদা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর অতীত রেকর্ড খুবই ভালো। অতীতে তিনি নিরপেক্ষতার সঙ্গে সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন। ’

ন্যাপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যে পাঁচজনের নাম প্রস্তাব করেছিলাম সেখান থেকে দুজন নবগঠিত ইসিতে স্থান পেয়েছেন। কে এম নুরুল হুদা ও কবিতা খানমের নাম আমাদের প্রস্তাবিত তালিকায় ছিল। ’

একাধিক দলের প্রস্তাবিত তালিকার সঙ্গে নাম মিলে যাওয়ার প্রসঙ্গে ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমরা যাঁদের যোগ্য মনে করেছি তাঁদের নামই প্রস্তাব করেছি। অন্যরাও তাই করেছেন। কিন্তু আমরা একে অন্যের সঙ্গে কোনো আলোচনা করে নাম প্রস্তাব করিনি। ’

জাসদ (ইনু) কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা যে পাঁচজনের নাম প্রস্তাব করেছিলাম তাঁদের মধ্যে রফিকুল ইসলামের নাম ছিল। ’

ওয়ার্কার্স পার্টির একটি সূত্র জানায়, সার্চ কমিটির কাছে পাঁচ সদস্যের যে তালিকা দেওয়া হয় সেখানে কে এম নুরুল হুদাকে সিইসি করার প্রস্তাব ছিল ওয়ার্কার্স পার্টির। তবে কমিশনার পদে যাঁদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল তাঁরা কেউই স্থান পাননি নবগঠিত ইসিতে।

জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টির প্রস্তাবিত নামের তালিকায় ছিলেন নুরুল হুদা ও রফিকুল ইসলাম। ’

তবে রাজনৈতিক দলগুলোর তালিকায় নাম ছিল কি না সে বিষয়ে কিছু জানেন না বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন নবগঠিত ইসির একাধিক সদস্য। এ বিষয়ে রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর তালিকায় আমার নাম থাকার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। ’

কবিতা খানম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো দলের পক্ষ থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। দলগুলোর তালিকায় আমার নাম থাকার বিষয়টি জেনেছি পত্রিকা পড়ে। ’


মন্তব্য