kalerkantho


মিছিলের নেতৃত্ব থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ

মিয়া মতিন

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মিছিলের নেতৃত্ব থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ

নবম শ্রেণির পরীক্ষা শেষ, সবে দশম শ্রেণিতে উঠেছেন মিয়া মতিন। এরই মধ্যে ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কিছু রাজনৈতিক কর্মী স্কুলে এসে সবার কাছে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং আন্দোলনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি সফল করতে স্কুলের আট শিক্ষার্থীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মিয়া মতিনও ছিলেন তাঁদের মধ্যে। পাঁচ দিনের প্রস্তুতি শেষে ২১ ফেব্রুয়ারি বিশাল গণবিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। মিছিলে অন্যদের সঙ্গে নেতৃত্ব দেন মিয়া মতিনও। এ কারণে ২৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। তবে জেলখানায় বসেও ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সরব ছিলেন তিনি।

মিয়া মতিনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের টনকী গ্রামে। গত ২৭ জানুয়ারি তাঁর বাড়িতেই বসেই কথা হয় ভাষা আন্দোলন নিয়ে। তিনি জানালেন, ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কোনো সরকারি স্বীকৃতি আজও পাননি।

তবে সেই সময়ে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া কিছু উপহারের কথা আজও মনে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছন। তারও স্বীকৃতি মেলেনি বলে জানালেন আখাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মিয়া মতিন।

মিয়া মতিন বলেন, “আমি কোনো নেতা ছিলাম না। তখন মোগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়তাম। ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে কয়েকজন কংগ্রেস নেতা আমাদের স্কুলে এসে ভাষার জন্য সংগ্রাম করতে হবে বলে জানান। শিক্ষকরাও আমাদের এ বিষয়ে উৎসাহ দিয়ে আন্দোলনে অংশ নিতে বলেন। ২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলন সফল করতে আমাদের ক্লাসের পুলিন চৌধুরী এবং আমিসহ আটজনের ওপর দায়িত্ব পড়ে। এর পর থেকে শিক্ষকদের উৎসাহে সহপাঠীদের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য বোঝানো শুরু করি আমরা। চাটাই কেটে বানানো হয় শ দুয়েক প্ল্যাকার্ড। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যতীন্দ্র সরকার এসবের জন্য অর্থের জোগান দেন। স্কুলের করণিক বীরেন্দ্র ভট্টাচার্যসহ কয়েকজন মিলে প্ল্যাকার্ডে বিভিন্ন স্লোগান লেখেন। এর মধ্যে ছিল ‘উর্দু ভাষায় লাথি মার, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চালু কর’, ‘রাষ্ট্রভাষা চাই’, ‘আমাদের ভাষা বাংলা ভাষা’। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে মোগড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ভাষা আন্দোলনের মিছিল বের হয়। বিদ্যালয়ের ৮০০-এর মতো শিক্ষার্থীর প্রায় সবাই এতে অংশ নেয়। শিক্ষক-কর্মচারীরাও যোগ দেন আন্দোলনে। আমি ছিলাম মিছিলের অগ্রভাগে। মূলত বিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন হলেও মিছিল বের হওয়ার পর এলাকার শত শত মানুষ এতে যোগ দেয়। একপর্যায়ে তা গণবিক্ষোভ কর্মসূচিতে পরিণত হয়। মিছিলটি মোগড়াবাজার, রেলওয়ে স্টেশনসহ আশপাশ এলাকা প্রদক্ষিণ করে। মোগড়াবাজার এলাকায় আয়োজিত সমাবেশে আমিসহ রাজু সাহা, চনু সাহা, আবুল হাসেম, আব্দুল মালেক, অরুণ দাস প্রমুখ বক্তব্য দেন। সমাবেশ থেকে জানানো হয়, রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবি মানা না হলে আন্দোলন আরো বেগবান করে তোলা হবে। ”

মিয়া মতিন বলেন, ‘ওই দিনের কর্মসূচির পর কিভাবে কী করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছিল। এরই মধ্যে আমরা যাঁরা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি, তাঁদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয় তত্কালীন মুসলিম লীগ সরকার। ওই সরকারের মন্ত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার টি আলী আখাউড়ার আব্দুল মজিদ, আব্দুর রশিদ, মালেক খাদেমকে নির্দেশ দেন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করে থানায় জমা দিতে। তালিকা পেয়ে পুলিশ অভিযান শুরু করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে আমাদের টনকীর বাড়িতে এসে পুলিশ আমার নাম ধরে কোথায় আছি জানতে চায়। পরে আমাকে পেয়ে তারা ধরে নিয়ে যায়। তবে পুলিশ আমার সঙ্গে কোনো খারাপ আচরণ করেনি। শুধু বলেছে আন্দোলন করায় সরকারের নির্দেশে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমিসহ আখাউড়ার আলী আজ্জম চৌধুরী, কসবার সুলতান খান, অহিদুজ্জামান ও অমল ঘোষকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। জেলখানায় বসেও ভাষা আন্দোলন নিয়ে আলোচনা হতো। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের বিজেশ্বরের আব্দুল মালেক, শাহবাজপুরের রবি নাগসহ আরো অনেকে আমাদের আন্দোলনের কৌশল শেখাতেন। ’

মিয়া মতিন জানালেন, প্রায় দুই মাস পর জেল থেকে ছাড়া পান তিনি। অ্যাডভোকেট আব্দুল বারীর সহযোগিতায় মুক্তি মেলে তাঁর। তবে এরপর আর পড়ালেখা হয়নি। জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। ১৯৫৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় ডেকে নিয়ে তিনিসহ কয়েকজন ভাষাসৈনিককে শার্ট-প্যান্ট উপহার দেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় একসঙ্গে তিন চাচাতো ভাই অহিদ মিয়া, আবুল খায়ের ও আবুল কালাম শহীদ হলে তিনিসহ টনকী গ্রামের ৭২ পরিবার একসঙ্গে ভারতে চলে যায়। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার মাধবপুর এলাকার ধীমানী ক্যাম্পে তাঁরা অবস্থান নেন। পরে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জহুর আহম্মদ চৌধুরীর কাছ থেকে পাওয়া চিঠির নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি আখাউড়ার মনিয়ন্দ এলাকায় অবস্থান নেন। সেখানে নৌকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পারাপারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।


মন্তব্য