kalerkantho


বিদেশে অর্থপাচারে ৫৫ জন চিহ্নিত

ফারজানা লাবনী   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বিদেশে অর্থপাচারে ৫৫ জন চিহ্নিত

বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচারের ঘটনায় জড়িত ৫৫ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স সেল (সিআইসি) ব্যাপক তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থপাচারের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে।

এদের মধ্যে চট্টগ্রামের প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ী রয়েছে, সে একাই যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করেছে ছয় লাখ ৩৯ হাজার ৮৬৯ ডলার। পাচারকৃত ওই অর্থ ফেরত আনতে সে দেশে মামলা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যদের বিরুদ্ধেও মামলা করতে যাচ্ছে এনবিআর।

পানামার ‘মোসাক ফনসেকা’র তথ্যে এই ৫৫ বাংলাদেশির নাম রয়েছে। এসব ব্যক্তি অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ পাচার করেছে। হুন্ডিতে পাচারের অঙ্কটাও নেহাত কম নয়। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করে তারা বিভিন্ন দেশে সেকেন্ড হোম করেছে। সংশ্লিষ্ট দেশে কিনেছে অকৃষি জমি ও ফ্ল্যাট। পাচারকৃত অর্থ গচ্ছিত রেখেছে সংশ্লিষ্ট দেশের ব্যাংকে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল অর্থপাচারের অভিযোগ ওঠার পর লস অ্যাঞ্জেলেস কনস্যুলেটের মাধ্যমে সে দেশে আইনজীবী নিয়োগ করে এনবিআর। সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি সংস্থার প্রাথমিক তদন্তে অর্থপাচারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় ইতিমধ্যে বাংলাদেশি ওই ব্যবসায়ীর এক লাখ ৫০ হাজার ডলার জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড সুপিরিয়র কোর্টে ওই ব্যবসায়ীর অর্থপাচার সম্পর্কিত মামলার ‘কেস ম্যানেজমেন্ট কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন সংশ্লিষ্ট দেশের মানি লন্ডারিং আইন অনুসারে সংশ্লিষ্ট আদালত এ মামলার শুনানির দিন ধার্য করবেন। অর্থপাচারকারী ওই ব্যবসায়ীর নামে সম্প্রতি ঢাকায় রমনা মডেল থানায়ও একটি মামলা করেছে এনবিআর।

অর্থপাচারের অভিযোগ নিশ্চিত হওয়ার পর অন্য ৫৪ ব্যক্তির বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে মামলা করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনা, ওই অর্থে বিদেশে কেনা সম্পত্তি জব্দ, পাচার হওয়া অর্থ থেকে রাজস্ব আদায়সহ পাচারকারীকে শাস্তির আওতায় আনতে জোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ব্যক্তির নামের তালিকা ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, সমাজের প্রভাবশালী এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু ক্ষমতাবানদের তদবির, সুপারিশ আর হুমকি-ধমকির মুখে অনেক সময়ই মাঝপথে তদন্ত থামিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে এনবিআর। তেমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি এড়াতে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান এবার তদন্ত শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে বিষয়টি অবহিত করেন। প্রধানমন্ত্রী এনবিআর চেয়ারম্যানকে অর্থপাচারকারীদের চিহ্নিত করতে সব রকমের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। কোনো ধরনের হুমকি-ধমকি, তদবির-সুপারিশে কাজ বন্ধ না করারও নির্দেশ দেন তিনি। একই ধরনের নির্দেশনা আসে অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকেও।

সূত্র জানায়, এনবিআরের তদন্তে অর্থপাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত ৫৫ ব্যক্তির তালিকায় থাকা আরো দুজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত। তাঁরা হলেন—মেসার্স ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. আসাদুল্লাহ ও পরিচালক এস এম শামীম। এনবিআর তদন্তে নেমে নিশ্চিত হয়েছে, উল্লিখিত ব্যক্তিরা মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচার করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি কিনেছেন।

সিআইসির একজন যুগ্ম পরিচালকের নেতৃত্বে সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটি অর্থপাচার-সংক্রান্ত বিষয়গুলো তদন্ত করছে। অর্থপাচারকারীর তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি কোন কোন দেশে আসা-যাওয়া করেছে তদন্তে তা বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কমিটি সরেজমিন তদন্তে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশও সফর করছে। বিস্তারিত তদন্তে সহায়তা নেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশের গোয়েন্দা সংস্থারও। পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দেশে আইনজীবীও নিয়োগ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স অ্যাক্টের অধীনে সার্বিক সহায়তা চেয়ে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের মাধ্যমে সে দেশের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস বরাবর অনুরোধপত্র পাঠানো হয়েছে।

সিআইসির তদন্তে বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে, এই ৫৫ অর্থপাচারকারী কোন দেশে, কোন মাধ্যমে, কী পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে; তা থেকে কী পরিমাণ রাজম্ব আদায় হবে, পাচারকৃত অর্থ দিয়ে কোন কোন সম্পদ কেনা হয়েছে এবং ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ কত।

তদন্তে আরো দেখা হচ্ছে, পাচারকৃত অর্থে কার নামে সম্পদ কেনা হয়েছে। সেকেন্ড হোম করতে জমা দেওয়া অর্থ কোন চ্যানেলে পাঠানো হয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেল হলে তা কোন ব্যবসার আড়ালে এবং ব্যাংকিং চ্যানেল না হলে কোন হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে।

জানা গেছে, পাচারকারীদের অনেকেই মানি এক্সচেঞ্জ কম্পানির মাধ্যমে অর্থ পাচার করেছে। এ অবস্থায় আয়-ব্যয়ের হিসাবে অসামঞ্জস্যতা পাওয়া যাওয়া ৩২টি মানি এক্সচেঞ্জ কম্পানির আয়-ব্যয়সংক্রান্ত হিসাব যাচাই করছে এনবিআরের কর নীতি শাখা।

এনবিআর সূত্র জানায়, তদন্তে অর্থপাচারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া ৫৫ জনই ব্যবসায়ী। ব্যাংকিং চ্যানেল ও হুন্ডির মাধ্যমে তারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করে আসছে। ব্যক্তি চিহ্নিত হওয়ার পর তারা কোন কোন দেশে বেশি অর্থ পাচার করেছে তার তদন্তে নামে এনবিআর। তাতে তথ্য বেরিয়ে আসে—এই ৫৫ ব্যবসায়ী সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, নিউজিল্যান্ড, কোরিয়াসহ ৩৩টি দেশে বেশি অর্থ পাচার করেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্ত কমিটির এক সদস্য কালের কণ্ঠকে জানান, অর্থপাচারকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। চিহ্নিত করার পর এখন পাচারকারীদের শাস্তির আওতায় আনা এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অর্থপাচারকারীদের প্রত্যেকেই এ দেশে সম্পদশালী হিসেবে পরিচিত। এদের বেশির ভাগই এ দেশে প্রভাবশালী। সরকারের নীতিনির্ধারক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা, প্রভাবশালী আমলাসহ এ দেশের নামিদামি ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের অনেকেরই রয়েছে সুসম্পর্ক।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান এ ব্যাপারে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অর্থপাচারকারীরা দেশের শত্রু। তাদের ধরতে এনবিআর কাজ করছে। ’


মন্তব্য