kalerkantho


দুই ভাই আর ক্যাডার নিয়ে ‘মিরু সাম্রাজ্য’

লিমন বাসার, শাহজাদপুর থেকে ফিরে   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দুই ভাই আর ক্যাডার নিয়ে ‘মিরু সাম্রাজ্য’

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌরসভার প্রায় শতকোটি টাকার কাজ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রথম থেকেই তত্পর ছিলেন মেয়র হালিমুল হক মিরু। এ জন্য রীতিমতো বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ তাঁর ‘সাম্রাজ্যে’ প্রবেশ করতে না পারে। তাঁর ভাই আর ক্যাডারদের সশস্ত্র মহড়া দেখে অভ্যস্ত এখানকার মানুষ। শুধু তা-ই নয়, মেয়র মিরু, তাঁর ছোট দুই ভাই হাবিবুল হক মিন্টু ও হাসিনুল হক পিন্টু চলাফেরা করতেন ভাড়া করা সশস্ত্র লোকজন নিয়ে। চাউর আছে, পাবনা থেকে ভাড়া করা সর্বহারা দলের সদস্যদের হাতে ছিল তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব।

সমকালের সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুলকে গুলি করে হত্যা করার ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন মেয়র মিরু। এত দিন ভয়ে যারা মিরুর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস করেনি এখন তারা মুখ খুলছে অবলীলায়। এলাকায় বোমাবাজি, গুলিবর্ষণ, লুটপাট, দখল, টেন্ডারবাজি, মারধরসহ তিন ভাইয়ের নানা অপকর্মের তথ্য উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের কথায়।

কয়েক দিন আগেও মিরুর যে বাড়ি ছিল সরগরম। এখন যেন তা ভূতের বাড়ি।

উপজেলা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, সাংবাদিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ এখন মিরুর বিচারের দাবিতে সোচ্চার। পুরো শাহজাদপুর এলাকা ব্যানার-ফেস্টুন লাগিয়ে ছেয়ে ফেলা হয়েছে মেয়র মিরুর ছবির সঙ্গে ফাঁসির দড়ি লাগানো ছবি দিয়ে। সেখানে তাঁকে খুনি আখ্যায়িত করে ফাঁসির দাবি জানানো হয়েছে। বিচার চাওয়া হচ্ছে তাঁর দুই ভাইয়েরও।

মেয়র মিরুর ঘনিষ্ঠ এক সহচর জানান, তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছিল জাসদের রাজনীতি দিয়ে। সেটি ১৯৮০ সালের কথা। ১৯৯২ সালে অল্প সময়ের জন্য বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন। তবে দলে যোগ দেওয়ার পরপরই উচ্চাভিলাষী মিরু নতুন চিন্তা শুরু করেন। বিএনপি ছেড়ে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। দলে যোগ দিয়েই ১৯৯৬ সালে নৌকার বিরুদ্ধে (বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে) ভোট করায় প্রথমবার ও ২০০৪ সালে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দ্বিতীয়বার সংগঠন থেকে বহিষ্কার হন। পরবর্তী সময়ে দলে ফিরে আসেন সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের আশীর্বাদে। এখন পর্যন্ত লতিফের খাস লোক হিসেবে পরিচিত মিরু। এসব কারণেই মিরু জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগান খুব সহজেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহজাদপুরের একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা জানান, পৌর মেয়র মিরু হলেও পৌরসভা চালাতেন তাঁর ছোট দুই ভাই মিন্টু ও পিন্টু। পৌরসভার বিভিন্ন কক্ষে সশস্ত্র অবস্থায় ছিল তাঁদের বিচরণ। তাঁদের কথার বাইরে গেলেই হুমকিধমকি ও লাঞ্ছিত হতে হতো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

 

পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি নজরুল ইসলাম জানান, তাঁর মেয়াদে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে নগর পরিচালনা অবকাঠামো উন্নতীকরণ প্রকল্পে (আইজিআইআইপি) শাহজাদপুর পৌরসভায় ১৯টি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য ২০১৬ সালের প্রথম দিকে ১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। এরপর নির্বাচনে তিনি হেরে গেলে মেয়র মিরু ফের দরপত্র আহ্বান করেন। সেই দরপত্রে তাঁর ভাইদের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জাহান ট্রেডার্স কাজ পায়। সেই দরপত্রে পৌর এলাকায় যে রাস্তা তৈরি হয় সেগুলো কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে নষ্ট হয়ে যায়। আবার অনেক রাস্তা না করেই প্রলেপ দিয়ে কাজ শেষ করা হয়। অনেক জায়গায় বক্স কালভার্ট করা হলেও সংযোগ রাস্তা করা হয়নি। যদিও ওই কাজের ৬০ শতাংশ বিল উত্তোলন করা হয়েছে। বাকি বিল তোলার প্রক্রিয়াও এগিয়ে গেছে বহুদূর। একই প্রকল্পে দুটি প্যাকেজে আরো ১৬ কোটি টাকার কাজের দরপত্র আহ্বান করা হবে ৮ ফেব্রুয়ারি। এই কাজটিও নিজেদের কবজায় নিতে সব পরিকল্পনা করে রেখেছিল মিরু বাহিনী। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে আইজিআইআইপির সব মিলিয়ে শত কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করার আছে শাহজাদপুর পৌরসভাকে ঘিরে।

উন্নয়নকাজে অনিয়ম এবং দেরিতে কাজ শুরু, কাজ না করেই বিল তোলা প্রসঙ্গে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিনিধি ও আইজিআইআইপির প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, এই পৌর এলাকার বিভিন্ন কাজে অনিয়মের একাধিক অভিযোগ তাঁদের কাছে রয়েছে। তাঁরা অনেক কাজের বিলও আটকে রেখেছেন। সর্বশেষ পরিস্থিতি তাঁরা অবগত হওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও জানালেন।

স্থানীয় লোকজন জানায়, ছোট দুই ভাই মেয়র মিরুর কুকর্মে নতুন মাত্রা যোগ করেন। মেয়রের লাইসেন্স করা শটগান ব্যবহার করতেন তাঁরা। সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রও থাকত একাধিক। ঘটনার দিন উপজেলার মণিরামপুর কালীবাড়ি মোড় থেকে শাহজাদপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বিজয় মাহমুদকে মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যান মেয়রের ভাই পিন্টু। মেয়রের বাড়িতে নিয়ে তাঁকে মারধর করা হয়। ওই সময় সেখানে মেয়রের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা ছিল। তাদের অনেকের বাড়ি পাবনায়। বিজয়ের সঙ্গে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল বিগত পৌর নির্বাচনের সময় থেকে। সর্বশেষ বিজয়দের বাড়ির সামনের রাস্তা মেরামত ও সংস্কারকাজ অসমাপ্ত রাখা নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। ওই রাস্তার কাজটি পেয়েছেন পিন্টু ও মিন্টুর অনুগত ঠিকাদার। তাঁদের ওপরে কেউ কখনো যাতে মাথা উঁচু না করে সে কারণেই এই পরিকল্পিত হামলার ঘটনা।

শাহজাদপুরের চরাঞ্চল নলুয়া এলাকার বাসিন্দা মেয়র মিরু। কিন্তু তাঁর বেড়ে ওঠা পাবনায়। শিক্ষাজীবনের শুরুও পাবনায়। পরে শাহজাদপুর কলেজে পড়তে আসেন। নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয়দানকারী মিরু কোথাও যুদ্ধ করেননি বলে দাবি করেন শাহজাদপুরের মুক্তিযোদ্ধা আজাদ শাহনেওয়াজ ভূঁইয়া।

স্থানীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা জাসদের সভাপতি শফিকুজ্জামান শফি বলেন, এসএসসি পাসের পর বিডিআর জওয়ান হিসেবে সরকারি চাকরি শুরু করেন মিরু। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে মাত্র এক বছর পরে সেখান থেকে পালিয়ে যান তিনি। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলে পাবনা থেকে পালিয়ে শাহজাদপুরে চলে আসেন। এরপর জাসদের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি। তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচন করারও বিশেষ খায়েশ রয়েছে মিরুর। এ কারণে বর্তমান সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন ও সাবেক সংসদ সদস্য চয়ন ইসলামের সঙ্গে  বিরোধ রয়েছে তাঁর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিরুর পরিবারের সদস্যদের অনেকেই এখনো জাসদের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তাঁর আলোচিত দুই ভাইয়ের একজন হাবিবুল হক মিন্টু এখনো পাবনা জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। যদিও তাঁকে ওই সংগঠন গত রবিবার বহিষ্কার করে। মেয়র মিরুর ভাইয়েরা মূলত পাবনাতেই বসবাস করেন। তাঁদের নামে পাবনার একটি থানায় মাদকের মামলা রয়েছে। মিন্টুর ঘনিষ্ঠ সহচর নিস্তার হোসেনের নামে হত্যাসহ ১৪টি মামলা রয়েছে। মেয়র মিরু পালিয়ে গেলেও তাঁর দুই ভাই গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সহযোগীরাও পালিয়ে গেছে। বিগত পৌর নির্বাচনের সময় নিস্তারসহ ওই বাহিনীর সদস্যরা শাহজাদপুরজুড়ে প্রকাশ্য তাণ্ডব চালিয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, পৌর এলাকার মণিরামপুরে মিরু এখন যে বাড়িতে বসবাস করেন সেটি হিন্দুদের সম্পত্তি। প্রাচীন এই বাড়িটিতে এখনো সেই ঐতিহ্যের ছাপ রয়েছে। মেয়র মিরু ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের উচ্ছেদ করে বাড়িসহ জায়গাটি দখলে নিয়েছেন। এই বাড়ির পেছনে হিন্দুদের আরো অন্তত ১০টি পরিবারের জায়গা এখন মেয়র মিরুর দখলে।

সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর-এনায়েতপুর) আসনের সরকারদলীয় এমপি হাসিবুর রহমান স্বপন জানান, মিরু দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন। তাঁর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার। তিনি বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার

করতে ইতিমধ্যেই জেলার কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মিরু এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মানুষ যেসব অভিযোগ করছে সেগুলো সত্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


মন্তব্য