kalerkantho


এসপি মিজানের নকল সার কারখানা

উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে টুঙ্গিপাড়ার দুটি সিলগালা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা এবং গোপালগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে টুঙ্গিপাড়ার দুটি সিলগালা

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এসপি মিজানের নকল সার কারখানায় অভিযান চালায় কৃষি বিভাগ।

‘এসপি মিজানের নকল সারের ৪ কারখানা’ শিরোনামে গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পর সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে হইচই পড়ে যায়। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ঢাকার জেলা প্রশাসক এবং গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসককে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতির লেবুতলায় এসপি মিজানের নকল সারের দুটি কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। তবে ঢাকার কেরানীগঞ্জে দুটি কারখানায় ঢুকতে পারেননি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

গতকাল দুপুরে প্রশাসনের লোকজন টুঙ্গিপাড়ায় এসপি মিজানের নকল কারখানায় যান। তবে পরিচালনাকারী লোকজন টের পেয়ে কারখানায় তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যায়। পরে কৃষি বিভাগ একজন ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের উপস্থিতিতে তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে নকল টিএসপি সার তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম ও কাঁচামাল জব্দ করেন। কারখানাটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। টুঙ্গিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ ব্যাপারে টুঙ্গিপাড়া থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক সমীর কুমার গোস্বামী কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ওই কারখানায় উত্পাদিত টিএসপি সার নকল বলে প্রতীয়মান হয়েছে। সেখান থেকে দুই হাজার ৫০০ বস্তা চুন (ডলোমাইট পাউডার), হাফ  প্রসেস পদার্থ ৫০০ বস্তা, তরল পদার্থ ৪০০ ড্রাম, আনুমানিক দুই মেট্রিক টন মাটি জাতীয় পদার্থ জব্দ করা হয়।

এরপর ওই কারখানটি সিলগালা করা হয়েছে।

সমীর কুমার গোস্বামী আরো বলেন, এ বিষয়ে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. এইচ এম মনিরুজ্জামান সংশ্লিষ্ট থানায় একটি জিডি করেছেন। এ ছাড়া সারের নমুনা আনা হয়েছে। তা পরীক্ষা করে যদি নকল প্রমাণিত হয় তাহলে দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহাবুর রহমান শেখ বলেন, ‘নকল সার তদন্তের বিষয়টি সম্পূর্ণ কৃষি বিভাগের। আমরা এখানে এসেছি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য। কারাখানা থেকে বিভিন্ন ধরনের সার তৈরির সামগ্রী পরীক্ষার জন্য নমুনা নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ’

 

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘কালের কণ্ঠ পত্রিকায় সংবাদ দেখে কৃষি বিভাগ এই কারখানায় তদন্তের জন্য আসে। আমাদের কাছে আইনশৃঙ্খলার জন্য সহায়তা চায়। এই কারণে আমরা এসেছি। কর্তৃপক্ষ এটা ভালো বুঝবে। তারা সার তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে  কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে সে বিষয়ে আমরা সহায়তা করব। ’

টুঙ্গিপাড়া উপজেলার লেবুতলায় ব্রিজের পাশে এসপি মিজানের মালিকানাধীন ফার্মনেস্ট অ্যান্ড মিল্ক প্রডাক্টস লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান ভাড়া নিয়ে ঢাকার মো. সাইদুর রহমান খান ও নারায়ণগঞ্জের ইমাম হোসেন ব্যবসা শুরু করেন। ওই ব্যবসায়ীরা কারখানায় নকল টিএসপি সার উত্পাদন করে তা বাজারে বিক্রি করে আসছেন—এমন একটি সংবাদ কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশ হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন গতকাল দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত অভিযান চালায়।

ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার হযরতপুর ইউনিয়নের ৫৩ নম্বর জগন্নাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে উঁচু প্রাচীর ঘেরা এসপি মিজানের খামারবাড়িতে গতকাল পরিদর্শনে যান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। দুপুর ২টায় এসপি মিজানের খামারবাড়িতে স্থাপিত নকল সারের কারখানা পরিদর্শনে গিয়েও ব্যর্থ হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি দল। পরিদর্শনদলটি দুপুর ২টা থেকে কারখানার প্রধান ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে বিকেল ৪টার সময় ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়। পরে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় তারা সরকারি কাজে বাধা প্রধান করার অপরাধে একটি সাধারণ ডায়েরি করে। পরিদর্শনদলের সঙ্গে ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার উপপরিচালক আব্দুল্লাহেল বাকি, অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) এম এম এ ছালাম, জেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফখরুল আলম।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার উপপরিচালক আব্দুল্লাহেল বাকি বলেন, ‘কালের কণ্ঠ পত্রিকায় রবিবার একটি সংবাদ প্রকাশের পর আমরা কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাজিকান্দি গ্রামে এসপি মিজানের খামারবাড়ি নামক স্থানে পরিদর্শন করতে যাই। সেখানে যাওয়ার পর খামারবাড়ির প্রধান ফটক বন্ধ দেখতে পাই। পরে আমরা গেটে নক করলে ভেতর থেকে আব্দুর রহমান নামের এক মধ্যবয়সী লোক এসে গেট খুলে আমাদের পরিচয় জানতে চান। আমরা রীতিমতো তাঁকে আমাদের পরিচয় দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার কথা জানালে তিনি গেটে তালা বন্ধ করে আসছেন বলে চলে যান। আমরা সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকি। এর মধ্যে বড় দেয়ালের প্রাচীরের ভেতরে ইটের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখতে পাই, ভেতরে বিশাল অট্টালিকা, সামনে খালি জায়গা পড়ে আছে। খালি জায়গায় প্লাস্টিকের বস্তা, যার মুখ বাঁধা অবস্থায় সারি সারি স্তূপ করে সাজিয়ে রাখা রয়েছে। ভেতরে ঢুকতে না পারায় সেগুলো সারের বস্তা কি না জানতে পারিনি। এ সময় আমরা স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, উঁচু প্রাচীর করা এটা বাড়ি নয়, সার কারখানা। ’ তিনি বলেন, এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারখানার প্রধান ফটকের সামনে বন্দুক নিয়ে সিকিউরিটি গার্ড দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না।

নকল সার খাদ্য নিরাপত্তায় মারাত্মক সংকট আনবে : সারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) প্রতিষ্ঠান টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেডের (টিএসপিসিএল) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোহাম্মদ হারুন নকল সার উত্পাদনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছেন। একই সঙ্গে এসব নকল কারখানার আলামত জব্দ করতে একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিআইসি।

এ বিষয়ে বিসিআইসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবাল গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা আমাকে নকল সার কারখানার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া নকল সার কী ধরনের কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি হয় তার নমুনা সংগ্রহ এবং কী ধরনের মেশিনে এটি তৈরি হয় তা দেখতে ঘটনাস্থলে আগামীকাল (সোমবার) একটি প্রতিনিধিদল বিসিআইসির পক্ষ থেকে যাবে। ’

কালের কণ্ঠ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে টিএসপিসিএলের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোহাম্মদ হারুন নকল সারের বিষয়ে অবহিত করে শিল্পসচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিসিআইসির চেয়ারম্যানসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে একটি চিঠি পাঠান গতকাল। ওই চিঠিতে বলা হয়, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এবং সাভারের হেমায়েতপুরে দুটি করে মোট চারটি নকল টিএসপি সার কারখানা গড়ে উঠেছে। এই চারটি কারখানা থেকে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার টন নকল টিএসপি সার উত্পাদিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য এক কোটি ৪০ লাখ টাকা। ভেজাল সার যেসব কাঁচামাল দিয়ে উত্পাদন করা হচ্ছে তা কৃষিজমিতে ব্যবহারের উপযোগী নয়। এই সার ব্যবহার করে কৃষকরা যেমন প্রতারিত হচ্ছে, তেমনি মাটির গুণও নষ্ট হবে। ফলে দেশের সার্বিক কৃষি উত্পাদন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করবে। এ ছাড়া নকল সার কারখানাগুলোতে ভেজাল সার সরকারি টিএসপি সারের বস্তায় ভরে এবং কিছু সার তিউনিসিয়া টিএসপি নামে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন টিএসপিসিএল কর্তৃক উত্পাদিত প্রকৃত টিএসপি সারের বিষয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে।

চিঠিতে নকল সার উত্পাদনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়, নকল সার থেকে দেশের কৃষকদের রক্ষা করতে এবং দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে এসব নকল সার উত্পাদনকারীর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং নকল সার কারখানা বন্ধ করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।


মন্তব্য