kalerkantho


চিরতরে থেমে গেলেন সুরঞ্জিত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



চিরতরে থেমে গেলেন সুরঞ্জিত

অগ্নিসাক্ষী রেখে জীবনের বন্ধনে জড়ানো স্বামী-স্ত্রীর যুগল ছবিটি যথারীতি টাঙানোই আছে ঘরের ভেতরের দেয়ালে। কিন্তু জীবনের পথ চলতে চলতে তাঁদের একজনের জীবনদীপ নিভে গেল ভোরের আলো ফোটার আগেই।

শয়নকক্ষের বিছানা, খাবারঘরের চেয়ারই শুধু নয়, পাঁচতলা বাড়িজুড়েই যেন শূন্যতা, হাহাকার। নিজ বিছানায় আর কখনো বিশ্রাম নেবেন না তিনি। বাড়ির সামনে ফুলের গাছ, ফলের গাছ। এসবের সৌন্দর্যও আর দেখা হবে না তাঁর। রাজধানীর জিগাতলার যে বাড়ি থেকে প্রাত্যহিক ব্যস্ততায় বেরিয়ে ক্লান্তি নিয়ে ফিরতেন সেই বাড়িতেও ফেরা হবে না। কারণ গত বৃহস্পতিবার রাতেই বাড়ি থেকে শেষবারের মতো বেরিয়েছিলেন প্রখর যুক্তিবোধ ও হাস্যরসে ভরা অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। গতকাল রবিবার সকালে হাসপাতাল থেকে বাসায় যদিও ঢুকেছিলেন, তবে প্রাণ ছিল না দেহে। বাক্হারা, নিষ্প্রাণ মানুষটিকে জিগাতলার প্রিয় প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দুপুরে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে নেওয়া হয়। সেখান থেকে নেওয়া হয় জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে। কি হাসপাতাল, কি বাসা, কি ঢাকেশ্বরী মন্দির, কি সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ—কোথাও কেউ আর বলছেন না, ‘সুরঞ্জিতদা ভালো আছেন?’ কেউ বলছিলেন, ‘অ্যাই লাশ দেখো। চুপ হয়ে গেছেন সুরঞ্জিতদা। ’

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ও আইনের ধারা অনর্গল বলতে পারা বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক অনেক ভারী বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়েও কৌতুক যোগ করে হাসাতেন সবাইকে। যুক্তির শাণিত অস্ত্রে প্রতিপক্ষকে কৌশলে আঘাত করার শিল্প ছিল তাঁর আয়ত্তে। সেই বাগ্মী মানুষটিই চিরদিনের জন্য নীরব হয়ে গেলেন ৭১ বছর বয়সে। গত বুধবার সরস্বতী পূজার অনুষ্ঠানেও বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি। পরদিন থেকেই ফোন ধরছিলেন না। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বৃহস্পতিবার রাতেই তাঁকে নেওয়া হয় ধানমণ্ডিতে ল্যাবএইড হাসপাতালে। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় গত শনিবার রাতে তাঁকে রাখা হয় লাইফ সাপোর্টে। অবশেষে গতকাল ভোর ৪টা ২৪ মিনিটে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন বলে জানিয়েছেন তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী কামরুল হক।

গতকাল দুপুর ১২টায় জিগাতলার বাসা থেকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে। সেখান থেকে মরদেহ নেওয়া হয় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী, হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। আজ সোমবার প্রথমে সিলেটে, পরে সুনামগঞ্জ জেলা শহরে এবং শেষে নিজ নির্বাচনী এলাকা দিরাই-শাল্লায় নেওয়া হবে সুরঞ্জিতের মরদেহ। দিরাইয়ে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।

সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা এলাকা থেকে জনমানুষের প্রতিনিধি হয়ে দ্রুতই জাতীয় নেতা হয়ে উঠেছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কথায় দেশ কাঁপিয়েছেন, সংসদে তুলেছেন আলোচনার ঝড়। রাজপথ, মঞ্চ, সংসদ, টেলিভিশনের টক শো—সবখানে তাঁর বক্তব্যই মনোযোগ কাড়ত সবার। কাউকেই ছাড় না দিয়ে কথা বলার মানুষটি ছিলেন দেশের ‘এক নম্বর পার্লামেন্টারিয়ান’।

একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা, দেশের প্রথম সংসদসহ সাতবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রক্তে হিমোগ্লোবিনের অভাবজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। গত বৃহস্পতিবার ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। অবস্থার অবনতি হলে শনিবার রাত ৮টায় তাঁকে নেওয়া হয় হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ)। পরে রাতেই লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। তাঁকে দ্রুত বিদেশ পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। গতকাল সকালে সিঙ্গাপুরে পাঠানোর জন্য এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সও প্রস্তুত করা হচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই গতকাল ভোরে খুলে নেওয়া হয় তাঁর লাইফ সাপোর্ট। পরিবার-বন্ধু-শুভানুধ্যায়ী ও দলের নেতাকর্মীদের সব আশার ইতি ঘটিয়ে সুরঞ্জিত চলে যান না ফেরার দেশে। তাঁর প্রয়াণে দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। টেলিভিশন, অনলাইন গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টেলিফোন, মোবাইল ফোন, ফ্যাক্সবার্তায় মুহূর্তেই দেশ থেকে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে এ দুঃসংবাদ। এ মৃত্যুসংবাদে সুনামগঞ্জের বিশেষ করে দিরাই-শাল্লার সর্বস্তরের মানুষ বাক্হারা।

হাসপাতাল ও হাসপাতালের সামনে গতকাল সকালেই ভিড় জমে শোককাতর স্বজন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের। সকাল ৯টার দিকে হাসপাতাল থেকে জিগাতলার বাসায় মরদেহ নিয়ে যাওয়ার সময় লাশবাহী গাড়ির সঙ্গে অন্যান্য গাড়িতে শেষযাত্রায় সঙ্গী হন দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। সুরঞ্জিতকে নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে স্মৃতিতে কাতর হয়ে পড়েন অন্যান্য দলের নেতারাও। শোকার্ত মানুষের চোখের জলে যেন ভেসে যায় সুরঞ্জিতের বাসাটি।

চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে সুরঞ্জিত ছিলেন সবার ছোট। তিন ভাই মারা গেছেন। একমাত্র বোন কলকাতায় আছেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর স্ত্রী জয়া সেনগুপ্ত কাজ করেন বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকে। সৌমেন সেনগুপ্ত তাঁদের একমাত্র সন্তান। অন্য অনেকের চেয়ে বড় বেশি ভেঙে পড়েন সুরঞ্জিতের স্ত্রী জয়া সেনগুপ্ত। সকালে সুরঞ্জিতের মরদেহ বাসায় নিয়ে গেলে জয়া ভেসে যান চোখের জলে। সুরঞ্জিতহীন ফাঁকা বিছানায় হাত রেখে করেছেন বিলাপ। ‘এখন কে ভরসা দেবে?’—এ প্রশ্ন করে জয়া অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন নির্বাক। পরে তিনি বলেন, ‘জেলে যাওয়ার পর এ বাড়িতে একাই এসেছিলাম, এখনো একা রয়ে গেলাম। ’

বাসার মূল দরজা দিয়ে ঢুকে এগিয়ে ডানে খাবারঘর। কাঠের টেবিলের দুই পাশে চারটি চেয়ার। তার সঙ্গে আছে পরিবারের বড় কর্তা সুরঞ্জিতের চেয়ারখানি। এ চেয়ার এখন শুধুই স্মৃতি। তাতে আর বসবেন না সুরঞ্জিত। পরিবারের সদস্যরা জানান, খাবার খেতে খেতেও দেশ নিয়ে আলোচনায় মেতে থাকতেন সুরঞ্জিত। তাঁর ভাবনায় ছিল দেশ ও দেশের মানুষ। শত ব্যস্ততার মধ্যেও স্ত্রী জয়া, ছেলে সৌমেন, পুত্রবধূ ও নাতিকে নিয়ে একসঙ্গে খাবার খেতে চেষ্টা করতেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তাঁদের সঙ্গে তিনি আর খেতে বসবেন না।  

‘এমন চুপচাপ আপনাকে মানায় না’ : সাংবাদিকদের বড় ভালোবাসতেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। চিরপরিচিতজনের মতো আচরণ করতেন তিনি। সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের দাবি, বড় ভাইয়ের মতো শাসনও ছিল। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের সম্পাদক প্রণব সাহা অন্য অনেকের মতোই শোকার্ত। শনিবার গভীর রাতে গিয়েছিলেন ল্যাবএইড হাসপাতালে ‘প্রিয় দাদাকে’ দেখতে। প্রণব সাহা বলেন, “ভয়ে ভয়ে গেলাম ল্যাবএইডের সিসিইউর ভেতর, এই ভেবে যে ধমক দিয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলবেন—‘তুমি তো ভুল শিরোনাম পড়ে এলে প্রণব। আমি নাকি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। মনে করছ মইরা গেছি। ’ কিন্তু না, কিছুই বললেন না। নানা যন্ত্রের নল জড়িয়ে রেখেছে তাঁকে। কী করে কথা বলবেন বাগ্মী সুরঞ্জিত। সংবিধান উদ্ধৃত করে, কাউলের উদাহরণ টেনে আর কখনোই কি সংসদ কাঁপাবেন সাতবারের পার্লামেন্টিরিয়ান সুরঞ্জিত। এমন নীরব দাদাকে দেখিনি কখনোই। ডা. বরেন চক্রবর্তীও তেমন ভরসা দিতে পারছিলেন না। ”

স্মৃতি থেকে প্রণব ফেসবুকে লিখেছেন, “...গত বুধবার ছিল সরস্বতী পূজা। পূজার অনুষ্ঠানে বত্তৃদ্ধতা করেছেন। বৃহস্পতিবার বেশ কয়েকবার ফোন বাজলো কিন্তু ধরলেন না। পরে জানলাম শরীর ভালো নেই দাদার। শনিবার রাতে দীপুদা জানালেন, দাদা ল্যাবএইডে, এয়ার এম্বুলেন্সে বাইরে নিতে হবে। তারপর এলো লাইফ সাপোর্ট দেবার খবর। দাদা একবার দেখেন—কত টিভি ক্যামেরা, সবাই আপনার খবর বলছে, শুধু আপনি চুপ। একবার সিসিইউর বাইরে এসে বলেন দাদা, ‘প্রণব, সব ঠিক হয়ে যাবে। ’ যেভাবে বলেন সব সময়, সংসদের করিডরে, ঢাকেশ্বরী মন্দিরে, প্রেস ক্লাবের বারান্দায়। বুঝিয়ে দিন আইনের ধারা, সংবিধানের অনুচ্ছেদ বা অভিভাবকের মত যেমনটা বলেছিলেন ‘টিভিতে এত কড়া কথা কওনের কাম কি?’ না, দাদা আপনার কথাই শুনেছি, ভবিষ্যতেও শুনবো, যেমনটা মনোযোগ দিয়ে শুনতাম সংসদের বিতর্ক। শুধু আরেকটিবারের জন্য হলেও বরেনদাকে হাত নেড়ে জিগাতলা হয়ে ফিরে যান দিরাই-শাল্লার হাওরে। কারণ বারবারই আজ চোখ চলে যাচ্ছিল বিষণ্ন জয়া বৌদির রঙ্গিন সিঁথিতে, সেখানে কোনো পরিবর্তন দেখতে চাই না। সৌমেন বা জয়ন্ত সেন দীপুকে যেন কোনো কিছুর আয়োজন করতে না হয়। ”

সুরঞ্জিতের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শোকবার্তায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের কথা স্মরণ করে বলেছেন, তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো। দেশ এক নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিবিদকে হারাল, আওয়ামী লীগ হারাল দলের একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতাকে। শেখ হাসিনা সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী ও সুসংহত করতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অবদানের কথাও স্মরণ করেন। তিনি বলেন, সুরঞ্জিত দেশের প্রথম সংবিধান রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মতে, এই মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যকে হারাল।

সকালে ল্যাবএইড হাসপাতালে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে স্মৃতি ও শোকে কাতর ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তিনি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব। পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তিনি নাম্বার ওয়ান বলে আমার মনে হয়। তাঁর মৃত্যুতে বিরাট শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এটা সহজে পূরণ হবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। ’

ল্যাবএইড হাসপাতাল থেকে সকাল ৯টার দিকে জিগাতলার বাসায় নেওয়া হয় মরদেহ। সেখানেও যান ওবায়দুল কাদের। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও সেখানে যান। মুহিত বলেন, ‘পার্লামেন্ট হ্যাজ লস্ট আ গ্রেট পার্লামেন্টারিয়ান। এ গ্রেট লস। সে আপাদমস্তক পলিটিশিয়ান ছিল। সংসদে দাঁড়ালেই হতো। ’

জিগাতলার বাসায় যান জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, স্থানীয় সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস, আওয়ামী লীগ নেতা মুকুল বোস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আহমদ হোসেন, হাছান মাহমুদ, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সুজিত রায় নন্দীসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

ভাটিবাংলার মানুষের প্রাণের নেতা সুরঞ্জিত ছিলেন নানা রঙের জীবনের অধিকারী। মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে, প্রগতিশীল বিভিন্ন আন্দোলনে তাঁর অবদান ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। সত্তরের প্রাদেশিক পরিষদে সুরঞ্জিত ছিলেন অন্যতম কনিষ্ঠ সদস্য। বর্তমান সংসদের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন তিনি। ষাটের দশকে উত্তাল সময়ে রাজনীতির পরীক্ষিত সৈনিক ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ, গণতন্ত্রী পার্টি থেকে শেষে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। সর্বশেষ তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। দেশের সংবিধান প্রণয়নে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। এ বিষয়ে রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘সংবিধান প্রণয়নে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বে কেউ যদি আঘাত করার চেষ্টা করত, তাহলে উনি মন্ত্রী থাকা অবস্থায়ও তার প্রতিবাদ করেছেন। ’

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জন্ম ১৯৪৬ সালে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার আনোয়ারাপুরে। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পরে ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের পক্ষে ব্যাপক গণজোয়ারের মধ্যেও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ন্যাপ থেকে জয়ী হয়ে সবার নজর কাড়েন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন পাঁচ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে।

১৯৭৯ সালের সংসদে ছিলেন একতা পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে। ঐক্য ন্যাপ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ১৯৯১ সালে। ‘ছোট দলের বড় নেতা’ হিসেবে পরিচিত সুরঞ্জিত পরে যোগ দেন বড় দল আওয়ামী লীগে। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হন। পরে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অন্য আসন থেকে উপনির্বাচনে জয়লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে সংসদবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলে ‘সংস্কারবাদী’ হিসেবে পরিচিতি পান সুরঞ্জিত।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় এলে সুরঞ্জিতকে প্রথমে মন্ত্রিসভার বাইরে রাখা হয়েছিল। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে তাঁকে রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। রেলমন্ত্রী হওয়ার পর সুরঞ্জিত কৌতুকের সুরে বলেছিলেন, ‘আমি শেষ ট্রেনের যাত্রী। ’

সুরঞ্জিত মন্ত্রী থাকা অবস্থায় তাঁর এপিএস ওমর ফারুক তালুকদারের নেতৃত্বে অর্থ কেলেঙ্কারি ধরা পড়ার পর ২০১২ সালের ১৬ এপ্রিল বাধ্য হয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। রেলমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি রেলসেবায় নতুন মাত্রা যোগ করতে সচেষ্ট ছিলেন। রেলমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যাওয়ার পর তাঁকে ‘দপ্তরহীন মন্ত্রী’ হিসেবে রাখা হয়েছিল। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

প্রয়াত এই রাজনীতিকের প্রতি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে শ্রদ্ধা জানান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, ঐক্য ন্যাপের আহ্বায়ক পঙ্কজ ভট্টাচার্য, রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষের নেতৃত্বে মিশনের ভক্তরা, বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি জয়ন্ত সেন দীপুর নেতৃত্বে পূজা উদ্যাপন পরিষদ, গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান, স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজি সেলিম, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন, ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার আদর্শ সোয়াইকা এবং রাজনৈতিক শাখার কর্মকর্তা রাজেশ উইকি। আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতারাও সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

শোক প্রকাশ : সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিকল্প ধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, এলজিআরডি ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মো. মসিউর রহমান রাঙ্গা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ফারজানা ইসলাম, জাসদ সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার ও গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন। এ ছাড়া সিপিবি, জাসদ (আম্বিয়া), ন্যাপ, বাসদ, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, জেপির পক্ষ থেকেও শোক জানানো হয়।  

ভারতীয় হাইকমিশনারের শোক : সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। গতকাল এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘তিনি (সুরঞ্জিত) নিঃসন্দেহে একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ, খ্যাতিমান ও মর্যাদাসম্পন্ন রাজনীতিক ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে এ দেশের অপরিমেয় ক্ষতি হলো এবং তা পূরণ হওয়ার নয়। ড. জয়া সেনগুপ্তসহ তাঁর পরিবারের অন্য সদস্য, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আমরা আমাদের আন্তরিক সমবেদনা জানাই। ’

খালেদা জিয়ার শোক : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এক শোকবার্তায় বলেন, ‘তাঁর মৃত্যুতে আমি শোকাহত। আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধান প্রণয়নে অন্যতম রচয়িতা হিসেবে তাঁর ভূমিকা এ দেশের মানুষ চিরদিন মনে রাখবে। ’


মন্তব্য