kalerkantho


আ. লীগ বিএনপির সমান প্রতিনিধিত্ব!

কাজী হাফিজ ও আজিজুল পারভেজ   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আ. লীগ বিএনপির সমান প্রতিনিধিত্ব!

নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের লক্ষ্যে গঠিত সার্চ কমিটি আজ সোমবার রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশের জন্য ১০ জনের নাম চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে। বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে বৈঠকে নাম চূড়ান্ত করে সন্ধ্যায় তা রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছে হস্তান্তর করতে পারে কমিটি।

এর মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) নামও নির্দিষ্ট করে প্রস্তাব করা হবে। এ ক্ষেত্রে সিইসি হিসেবে সাবেক সচিব কে এম নুরুল হুদার নামই বেশি আলোচিত হচ্ছে। বিএনপির দেওয়া তালিকা থেকেও নাম থাকতে পারে ১০ জনের তালিকায়। তবে সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে নামের তালিকা জমা দেওয়ার আগে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করবে না। রাষ্ট্রপতি সম্মতি দিলে পরে তা জানানো হতে পারে। তালিকা দেওয়ার সময় রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন কমিশন গঠন সম্পর্কে বিশিষ্ট নাগরিকদের সুপারিশের একটি সারসংক্ষেপও দেওয়া হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, দু-এক দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি সিইসিসহ অন্য কমিশনারদের নিয়োগের কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিশ্বস্ত সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কে এম নুরুল হুদার বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল রবিবার রাতে সার্চ কমিটির একজন সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিইসি হিসেবে বেশ কয়েকজনের নাম আছে।

আমরা এখনো চূড়ান্ত করিনি। তবে তাঁরও (কে এম নুরুল হুদা) সম্ভাবনা আছে। ’

সার্চ কমিটির সদস্য মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মাসুদ আহমেদ গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কালকের (সোমবারের) বৈঠকে আমরা ১০ জনের নাম চূড়ান্ত করার চেষ্টা করব। প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুজন করে মোট ১০ জনের নাম সুপারিশ করব। ’সার্চ কমিটির আরেক সদস্য গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রস্তাবিত নাম থেকে সমসংখ্যক নাম রাখার। শেষ পর্যন্ত তা না হলেও বড় দলগুলোর প্রস্তাব থেকে নাম থাকবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবের বাইরেও দু-একটি নাম যোগ হতে পারে।

গতবার ইসি গঠনের সময় রাষ্ট্রপতির কাছে সার্চ কমিটির সুপারিশ করা নামের তথ্য গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছিল। তবে এবারও তা জানানো হবে কি না—এ প্রশ্নে কমিটির একজন সদস্য গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, এ বিষয়েও সোমবারের (আজ) বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে সার্চ কমিটির এ সদস্য বলেন, ‘আমরা কমিটির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়েছিলাম। সে অনুমতি পাওয়া গেছে কি না, তা এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানি না। ’

তবে রাষ্ট্রপতির প্রেসসচিব জয়নাল আবেদীন গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে জানান, সোমবার (আজ) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটির সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

সার্চ কমিটি গঠিত হওয়ার পর ইসি গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে নামের প্রস্তাব নিয়েছিল। এরপর বিশিষ্টজনদের সঙ্গেও দুই দফা বৈঠক করে কমিটি। পরে ২০ জনের নামের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা হয়।

সূত্র জানিয়েছে, যদি শেষ পর্যন্ত সাবেক সচিব কে এম নুরুল হুদার নাম সিইসি হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়, তাহলে তিনিই হবেন নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে আসা প্রথম আমলা, যিনি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন।  

সূত্র মতে, কে এম নুরুল হুদা বাদে সিইসি হিসেবে আরো যাঁদের নাম আলোচনায় রয়েছে তাঁরা হলেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও কলামিস্ট আলী ইমাম মজুমদার, সাবেক সচিব মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান, আবদুল করিম, আবু আলম মো. শহীদ খান, পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ ও ইসির বর্তমান কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মোবারক।

১০ জনের তালিকায় আরো যাঁরা থাকতে পারেন বলে ধারণা পাওয়া গেছে তাঁদের মধ্যে আছেন দুজন সাবেক সচিব, দুজন বিচারপতি, একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও একজন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদের নামও থাকতে পারে বলে ধারণা পাওয়া গেছে। তাঁর নামটি বিএনপির দেওয়া তালিকায় রয়েছে। এবার দেশে প্রথমবারের মতো একজন নারী নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের সম্ভাবনাও রয়েছে।

দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের অনেকেই নির্বাচন কমিশনারদের সংখ্যা পাঁচ থেকে কমিয়ে তিনজন করার সুপারিশ করেছেন। তবে এ বিষয়ে সার্চ কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘আমাদের কমিটির কার্যপরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সার্চ কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের সুপারিশ রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে হবে। তিন সদস্যের উপস্থিতিতে কমিটির কোরাম গঠিত হবে। কমিটি ন্যূনপক্ষে একজন নারীসহ প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের সুপারিশ করবে। প্রতিটি পদের বিপরীতে কমিটি দুটি করে নাম দেবে। এ কারণে নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ পাঁচটি পদের জন্য ১০টি নামই সুপারিশ করতে হবে। ’ 

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা গতকাল সন্ধ্যায় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করবেন আগামীকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টায়।  

বর্তমান নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক, মোহাম্মদ আবু হাফিজ ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ নিয়েই যোগ দেন ইসিতে। তার ছয় দিন পর ১৫ ফেব্রুয়ারি আরেক নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ শপথ নিয়ে ইসিতে যোগ দেন। পাঁচ বছরের মেয়াদ হিসেবে সিইসিসহ চার নির্বাচন কমিশনারের শেষ কার্যদিবস হচ্ছে আগামী বুধবার (৮ ফেব্রুয়ারি)। আরেকজন বিদায় নেবেন ১৪ ফেব্রুয়ারি।

যাঁদের নাম সুপারিশ করা হতে পারে : নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের জন্য যাঁদের নাম সুপারিশ করা হতে পারে বলে আলোচনায় এসেছে তাঁদের বেশির ভাগই সাবেক সচিব। নির্বাচন কমিশনে ২০০৭ সালে একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১২ সালেও সে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়। এবারও একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা এ পদে নিয়োগ পেতে পারেন বলে আলোচনা চলছে। ২০০৬ সালের বিচারপতি এম এ আজিজের নেতৃত্বাধীন কমিশনে পুলিশের একজন সাবেক প্রধান নিয়োগ পেয়েছিলেন। এবারও একজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া এবার রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে  ইসিতে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ রাখার প্রস্তাব ছিল। বিষয়টি সার্চ কমিটির বিবেচনায় রয়েছে। কয়েকটি রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের এবারের নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের সুপারিশ রাখে। এ সুপারিশও রক্ষা হতে পারে।

দলগুলোর প্রস্তাবিত নামের বাইরেও সার্চ কমিটি তাদের নিজস্ব অনুসন্ধান থেকে দু-এক জনের নাম যুক্ত করতে পারে—এমন আভাস মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয় থেকে কয়েকবারই দেওয়া হয়েছে। জানা যায়,  ইতিমধ্যেই কমিটির সদস্যরা কিছু যোগ্য ব্যক্তির নাম সংগ্রহ করে তাঁদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার জন্য গোয়েন্দা সংস্থারগুলোর সহযোগিতা চেয়েছেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক দল প্রস্তাবিত নামগুলো থেকে বাছাই করা ব্যক্তিদের সম্পর্কেও গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত সিইসি হিসেবে যাঁরা নিয়োগ পান তাঁদের মধ্যে সাতজন ছিলেন বিচারপতি এবং চারজন সাবেক সচিব। ১৯৭২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সাবেক বিচারপতিরাই সিইসি পদে নিয়োগ পেয়ে আসছিলেন। এর পরিবর্তন হয় ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর। ওই সময় বিচারপতি এ কে এম সাদেক পদত্যাগ করেন এবং সিইসি পদে প্রথমবারের মতো একজন সাবেক সচিব (মোহাম্মদ আবু হেনা) নিয়োগ পান। এরপর ২০০৫ সালের ২০ মে  আপিল বিভাগে কর্মরত একজন বিচারপতি (বিচারপতি এম এ আজিজ) সিইসি হিসেবে নিয়োগ পেলেও ব্যাপক আন্দোলনের মুখে ২০০৭ সালের ২১ জানুয়ারি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর পরের দুই সিইসি হচ্ছেন সাবেক সচিব।  

এখানে আরো লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে—শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার আমলে সিইসি হিসেবে সরকারের সাবেক সচিবরাই নিয়োগ পেয়েছেন। এ কারণে ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের ধারণা এবারও সাবেক কোনো সচিবকে এই দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সম্ভাব্য সিইসি হিসেবে যে কয়জনের নাম আলোচনায় রয়েছে, তাঁদের সবাই সাবেক সচিব।

প্রসঙ্গত, ইসি পুনর্গঠন নিয়ে গত ১৮ ডিসেম্বর থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে বঙ্গভবনে পর্যায়ক্রমে ৩১টি রাজনৈতিক দলের সংলাপ হয়। প্রথম দিন সংলাপে অংশ নেয় বিএনপি। ১১ জানুয়ারি বৈঠক করে আওয়ামী লীগ। এক মাসে পাঁচ দফায় এ সংলাপ হয়। সংলাপের পর রাষ্ট্রপতি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে গত ২৫ জানুয়ারি আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি করে দেন। আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন কমিটির আহ্বায়ক। অন্য পাঁচ সদস্য হচ্ছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মাসুদ আহমেদ, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য শিরীণ আখতার। ২৫ জানুয়ারি রাতে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।


মন্তব্য