kalerkantho


ভিডিও ভাইরাল

‘সাংবাদিক শিমুলের মৃত্যু মেয়রের গুলিতেই’

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘সাংবাদিক শিমুলের মৃত্যু মেয়রের গুলিতেই’

সাংবাদিক শিমুল

শাহজাদপুরের পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরু দাবি করেছিলেন তাঁর বাসা হামলার শিকার হলে তিনি বাসা থেকে একটি ফাঁকা গুলি করেছিলেন। কিন্তু একটি ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, মেয়র শটগান হাতে রাস্তায় হাঁটছেন আর গুলি ছুড়ছেন। দেখা যায়, ঘটনাস্থলে পুলিশও উপস্থিত ছিল। গতকাল শনিবার সকাল থেকে মোবাইল ফোনে ধারণ করা এই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে পড়ে।

গতকাল সকালে নিহত সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুলের জানাজাপূর্ব সমাবেশে শাহজাদপুর সার্কেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল হাসনাত বলেছেন, পুলিশের সামনে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হালিমুল হক মিরুর করা গুলিতেই সাংবাদিক শিমুলের মৃত্যু হয়েছে।

শাহজাদপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বিজয় মাহমুদকে বৃহস্পতিবার মারধর করার অভিযোগে আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ মেয়র মিরুর বাড়ি ঘেরাও করলে মেয়র নিজে শটগান দিয়ে গুলি করেন। এ সময় দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুল গুলিবিদ্ধ হন এবং পরের দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল হাসনাত আরো বলেন, ‘শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পুলিশ সেখানে যথাসময়ে উপস্থিত হয়েছিল। ঘটনার সময় আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। মেয়রকে বারবার বারণ করার পরও তিনি গুলি ছোড়েন। একাধিক গুলি করেন মেয়র।

ওই সময় অন্য কোনো পক্ষ গুলি করেনি। ’

সাংবাদিক শিমুল নিহত হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নসহ সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংঠন প্রতিবাদ জানিয়েছে। এ ছাড়া দোষী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেছে। কমিটি ফর প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্টস (আইএফজে) এ ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

জানাজা ও দাফন : গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় শাহজাদপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এবং পরে শিমুলের বাড়ি মাদলা গ্রামের কবরস্থানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে দাফন করা হয় শিমুল ও তাঁর নানির লাশ। শুক্রবার শিমুলের মৃত্যুর খবর জানার পর তাঁর নানি রোকেয়া বেগম মারা যান।

শাহজাদপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শিমুলের জানাজাপূর্ব সমাবেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল হাসনাত বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক, যা আমাদের সামনেই ঘটেছে। অপরাধী যত ক্ষমতাশালীই হোক, আমরা তাকে আইনের আওতায় আনব। ’ ঘটনার পর মেয়রের বাড়ি থেকে শটগান ও ৪৩টি গুলি জব্দ এবং ঘটনাস্থল থেকে ছয়টি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তা জানান।

মেয়র মিরুকে গ্রেপ্তারের জন্য শুক্রবার রাত থেকে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, শিগগিরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। বৃহস্পতিবার ঘটনার পর মেয়র মিরু দাবি করেছিলেন, প্রতিপক্ষের গুলির জবাবে তিনি এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়েছিলেন।

জানাজা অনুষ্ঠানে শাহজাদপুরের সংসদ সদস্য মো. হাসিবুর রহমান স্বপন, সাবেক সংসদ সদস্য চয়ন ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন আল রাজিব, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আজাদ রহমান, সিরাজগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফজল-এ-খোদা লিটন, সাবেক সভাপতি হারুন-অর-রশিদ খান হাসান বক্তব্য দেন।

সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন বলেন, ‘শাহজাদপুরবাসী আগে থেকেই অবগত যে মেয়র ও তাঁর ভাইয়েরা অস্ত্রবাজি করে। এখানে তাঁর গুলিতেই সাংবাদিক মারা গেলেন। এটা অত্যন্ত লজ্জাকর। এতে আমরা মর্মাহত। ’ মামলাটি দ্রুত বিচার আইনে নিষ্পত্তির দাবি করে তিনি বলেন, সাংবাদিকের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করানো হবে।

অর্ধদিবস হরতাল পালিত : সাংবাদিক শিমুলের মৃত্যুর পর থেকে উত্তেজনা চলছে শাহজাদপুর উপজেলা শহরে। মেয়রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়েছে পৌর আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ভিপি রহিম ও ছাত্রলীগ নেতা বিজয়ের কর্মী-সমর্থক ও সাংবাদিকরা। শিমুল নিহত হওয়ার ঘটনায় গতকাল উপজেলাজুড়ে অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়েছে। এ সময় সব ধরনের দোকানপাট ও যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। উপজেলা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ এ হরতালের ডাক দেয়। এতে একাত্মতা ঘোষণা করেন শাহজাদপুর উপজেলায় কর্মরত সাংবাদিকরা। হরতালের সমর্থনে শহরে খণ্ড খণ্ড মিছিল বের হয়। হরতাল সমর্থকরা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।  

এদিকে সাংবাদিকের মৃত্যুতে সিরাজগঞ্জ প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে তিন দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল থেকে তিন দিন প্রেস ক্লাব ভবনে কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে এবং জেলায় কর্মরত সাংবাদিকরা কালো ব্যাজ ধারণ করবেন।

মামলা : শিমুল হত্যার ঘটনায় তাঁর স্ত্রী নুরুন্নাহার বেগম বাদী হয়ে মেয়রসহ ১৮ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) কমল দেবনাথ বলেন, ঘটনা তদন্তের পাশাপাশি পুলিশ এখন পর্যন্ত তিনজনকে আটক করেছে। তাঁরা হলেন মেয়রের দুই ভাই হাসিবুল ইসলাম পিন্টু ও মিন্টু এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য কে এম নাসির উদ্দিন (৪৮)।

‘জড়িতদের কোনো ছাড় নেই’ : স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, শাহজাদপুরে সাংবাদিক শিমুল হত্যার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জড়িতরা যতই প্রভাবশালী হোক, যে দলেরই হোক না কেন, তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় পাবনা জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে এসব কথা বলেন তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম আরো বলেন, আওয়ামী লীগের মতো বড় দলে ছোটখাটো কোন্দল থাকা অস্বাভাবিক নয়, তবে সীমা লঙ্ঘনকারীদের অপরাধের দায় আওয়ামী লীগ নেবে না।

হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি বিএফইউজে ও  ডিইউজের : শিমুল নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ, উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে বিএফইউজে ও ডিইউজে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের হামলা-মামলা ও নির্যাতনের নিন্দা জানানো হয়েছে। গতকাল এক বিবৃতিতে বিএফইউজের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, মহাসচিব ওমর ফারুক এবং ডিইউজের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আতিকুর রহমান চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরী বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে একজন সাংবাদিক এভাবে হত্যার শিকার হওয়া সভ্য সমাজে কাম্য হতে পারে না। স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রুপিং, কোন্দলের কারণে এ ধরনের জীবনহানি জনগণকে রাজনীতিবিমুখ করে তুলবে।

বিবৃতিতে নেতারা সাংবাদিক ঈশান-বিন-দিদার, ক্যামেরাপারসন আব্দুল আলীম, ফটো সাংবাদিক জীবন আহমেদের ওপর হামলাকারী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সাংবাদিক সিদ্দিকুর রহমান ও মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান।

বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচি : গতকাল বিকেলে রাজশাহী নগরীর সাহেববাজার রাজশাহী প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। রাজশাহী প্রেস ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইদুর রহমানের পরিচালনায় মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন এনটিভির রাজশাহী ব্যুরোর স ম সাজু।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের লিপু চত্বরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।

খুলনা প্রেস ক্লাবের সামনে সমকাল সুহৃদ সমাবেশের উদ্যোগে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে। মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন সমকাল সুহৃদ সমাবেশ খুলনার সদস্যসচিব সাধন চন্দ্র স্বর্ণকার। পরিচালনা করেন সমকালের খুলনা ব্যুরোপ্রধান মামুন রেজা। বক্তব্য দেন খুলনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি এস এম হাবিব, সাধারণ সম্পাদক সুবীর কুমার রায়, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য গৌরাঙ্গ নন্দী প্রমুখ।

পাবনা জেলা কমিটি ভেঙে দিল জাসদ : জাসদ পাবনা জেলা কমিটি ভেঙে দিয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটি। গতকাল জাসদের সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য শিরীন আখতার কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সভার নির্দেশনা অনুযায়ী পাবনা জেলা কমিটি ভেঙে দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি চিঠি দেন। গতকাল জাসদের দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহিল কাইয়ুম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। জাসদের সূত্রগুলো জানায়, সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে সাংবাদিক শিমুল নিহত হওয়ার ঘটনায় পাবনা জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুল হক মিন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়। মিন্টু শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র হালিমুল হক মীরুর ছোট ভাই। সংঘর্ষের সময় মিন্টু ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পাবনা জেলা কমিটি ভেঙে দিয়েছে জাসদ।


মন্তব্য