kalerkantho


ভাষার দাবিতে তখন মিছিল মিটিং ছিল অপরাধ

মিরান উদ্দিন

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভাষার দাবিতে তখন মিছিল মিটিং ছিল অপরাধ

চার বন্ধু পুলিশের হাতে ধরা পড়েন, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিয়ে কোর্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাঁদের। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে বেড়ান মিরান উদ্দিন।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে মিছিল-মিটিং করাই ছিল তাঁদের অপরাধ। এলাকার মুসলিম লীগ নেতারা হুংকার দেন, অজপাড়াগাঁয়ের স্কুলপড়ুয়া কয়েকটা পিচ্চি ছেলে কিভাবে পাকিস্তানের বিরোধিতা করার সাহস পায়, তা দেখে নিতে হবে। ঘটনাটি ১৯৪৯ সালের। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন তত দিনে দানা বেঁধে উঠছে। আর সেদিনের এসব কথা জানা গেল মিরান উদ্দিনের কাছে। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় ভাষা আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।  

ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুড়ি ইউনিয়নের বানিয়াজুড়ি গ্রামের বাড়িতে মিরান উদ্দিনের সঙ্গে কথা হয় কালের কণ্ঠ’র। তিনি জানান, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা—১৯৪৮ সালের মার্চে ঢাকা সফরকালে পাকিস্তানের স্থপতি ও গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ এ ঘোষণা দেওয়ার পর বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাঙালি। মহানগর থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৪৯ সালে তার ঢেউ লাগে ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী গ্রামে। ঢাকা থেকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিসংবলিত কিছু লিফলেট পাঠিয়ে দেন তেরশ্রী কেএন ইনস্টিটিউটের ছাত্রদের কাছে। নির্দেশনা অনুযায়ী ইনস্টিটিউটের ছাত্ররা বের করে বিক্ষোভ মিছিল। পরে সমাবেশও করে তারা। তিনি (মিরান উদ্দিন) তখন ওই ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণির ছাত্র। মিছিল-সমাবেশে তাঁর সঙ্গে নেতৃত্বে আরো ছিলেন নবম শ্রেণির ওয়াজেদ উদ্দিন, নিরঞ্জন বসু, দশম শ্রেণির রেহাজ উদ্দিন এবং ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী যতিন দাস।

মিরান উদ্দিনের জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৮ আগস্ট। বয়স এখন প্রায় ৮৩। জানা গেল, আন্দোলনের সহযোদ্ধা ওয়াজেদ উদ্দিন ও রেহাজ উদ্দিন এরই মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক আগেই ভারতে চলে গেছেন নিরঞ্জন বসু ও যতিন দাস। সেই সময়ের সংগ্রামীদের মধ্যে এখন কেবল বেঁচে আছেন মিরান উদ্দিন।

দিন-তারিখ এখন আর ঠিকঠাক মনে নেই। তবে একটু ভেবে মনে করতে পারলেন যে সেদিন স্কুল প্রাঙ্গণের পলাশগাছটি ফুলে ফুলে ভরে ছিল। এ থেকে তাঁর ধারণা, সেটি ফাল্গুন মাসই হবে। তখন তিনি নবম শ্রেণির ক্লাস ক্যাপ্টেন। সেদিন স্কুলে আসার পর তাঁকেসহ ওয়াজেদ উদ্দিন, রেহাজ উদ্দিন, নিরঞ্জন ও যতিনকে ডেকে পাঠান স্কুলের শিক্ষক প্রমথনাথ নন্দী ও আফসার উদ্দিন। তাঁরা ঢাকায় বাংলা ভাষা নিয়ে চলমান আন্দোলন সম্পর্কে তাঁদের বোঝান। তাঁরা বলেন, উর্দু যদি রাষ্ট্রভাষা হয় তাহলে বাঙালিদের নিজস্বতা বলতে কিছু থাকবে না। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। দুই শিক্ষক ঢাকা থেকে ছাত্র সংগ্রামের পাঠানো লিফলেট ছাত্রদের হাতে দিয়ে সেগুলো ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে ছাত্রদের মাঝে বিলি করতে বলেন। মিছিল-সমাবেশেরও দিকনির্দেশনা দেন তাঁরা।  

মিরান উদ্দিন বলেন, লিফলেটের মূল বক্তব্য ছিল—রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। উর্দু হরফ চলবে না। প্রিয় দুই শিক্ষকের আহ্বানে সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দেয় ছাত্ররা। সকাল ১০টার দিকে স্কুলের সব ছাত্র ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিয়ে মিছিল নিয়ে এগোতে থাকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ঘিওর সদরের দিকে। তবে নদীর ঘাটে পৌঁছালে লোকজন ছাত্রদের আর এগোতে মানা করে। তারা জানায়, ঘিওর থানায় পুলিশ রাইফেল তাক করে অবস্থান নিয়েছে। মিছিল নিয়ে গেলে গুলি করতে পারে। এরপর আলোচনা করে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ছাত্ররা গ্রামের ভেতর দিয়ে মিছিল নিয়ে ফিরে আসে স্কুল প্রাঙ্গণে। সেখানে সমাবেশে বক্তব্য দেন ছাত্রনেতারা।

এই ভাষাসংগ্রামী আরো জানান, সে সময় তিনি লজিং থাকতেন তেরশ্রী গ্রামে মীর সাহেবের বাড়িতে। মিছিল-মিটিং শেষে বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলছিলেন গ্রামের মাঠে। হঠাৎ মীর সাহেব এক ছেলের মাধ্যমে তাঁকে সরে পড়ার জন্য খবর পাঠান। স্থানীয় চেয়ারম্যান তাইজুদ্দিন ঠাকুরের মাধ্যমে তিনি (মীর সাহেব) খবর পেয়েছেন, যেসব ছাত্র মিছিল-মিটিং আর লিফলেট বিলি করেছে তাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করবে। মীর সাহেবের পরামর্শে তিনি আশ্রয় নেন বড় মিলান গ্রামের সাত্তার মুন্সীর বাড়িতে। রাত যায় উত্কণ্ঠায়। সকালে জানতে পারেন পুলিশ ওয়াজেদ উদ্দিন, রেহাজ উদ্দিন, নিরঞ্জন ও যতিনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁর খোঁজে মীর সাহেবের বাড়িতেও তল্লাশি চালিয়েছে। আরো অনেকের বাড়িতে হানা দিয়েছিল পুলিশ। দুপুর নাগাদ খবর পান, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিয়ে আটক ছাত্রদের মানিকগঞ্জ কোর্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তেরশ্রী গ্রামের এত কাছে সাত্তার মুন্সীর বাড়িও নিরাপদ নয়—এটা বুঝতে পেরে রাতের আঁধারে তিনি সরে পড়েন। এরপর দূরের আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিলেন প্রায় দুই মাস। এর মধ্যে আটক ছাত্রদের মানিকগঞ্জ কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে তত্কালীন কংগ্রেস নেতা ও এমসিএ ভাবেশনন্দী তাঁদের জামিনের ব্যবস্থা করেন। একপর্যায়ে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। এর পরই মিরান উদ্দিন আত্মগোপন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসেন।

মিরান উদ্দিন জানান, বাংলা ভাষার পক্ষে মিছিল-মিটিং করায় স্থানীয় মুসলিম লীগ নেতা আবদুল গনী ও ইসমাইল হোসেনের ইন্ধনে পুলিশ ছাত্রদের গ্রেপ্তার করেছিল। তারা ছাত্রদের বলেছিল যে শিক্ষক প্রমথ নন্দীর নির্দেশে মিছিল করেছে, এমন মুচলেকা দিলে তোদের ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ছাত্ররা তাতে রাজি হয়নি।

এখনো প্রতিবছর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে এই ভাষাসৈনিকের হাতে সম্মাননা হিসেবে ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়। মিরান উদ্দিন বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন আমাকে অধিকার সচেতন করে তুলেছে, দেশের প্রতি ভালোবাসা শিখিয়েছে। ’


মন্তব্য