kalerkantho


লড়াকু সিদ্দিকুর রহমান রানার আপ

জ্যাজের হাসিতে পর্দা নামল বসুন্ধরা ওপেনের

শাহজাহান কবির   

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



জ্যাজের হাসিতে পর্দা নামল বসুন্ধরা ওপেনের

বসুন্ধরা বাংলাদেশ ওপেন জয়ী থাইল্যান্ডের জ্যাজ ইয়ানুয়াতাননের সঙ্গে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান (মাঝে) এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

আগের দিন বলেছিলেন প্রথম কয়েক হোলেই বোঝা যাবে শিরোপা লড়াইয়ে তিনি পারবেন কি পারবেন না। কাল শুধু শুরুটা নয়, পুরো ফ্রন্ট নাইন শেষ করলেন সিদ্দিকুর রহমান সেই লড়াইয়ের আশা জাগিয়ে। কিন্তু ব্যাক নাইন থেকেই তাঁর ধীরে ধীরে পতন। শেষ তিন-চার হোলে যখন খেলছেন তখন প্রায় জেনেই গেছেন দ্বিতীয় সেরাই হয়তো বা হচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো, বসুন্ধরা বাংলাদেশ ওপেনের তৃতীয় আসরের যবনিকা ঘটল ঘরের ছেলে সিদ্দিকের দ্বিতীয় হওয়া আর থাই গলফার জ্যাজ ইয়ানুয়াতাননের প্রথম এশিয়ান ট্যুর শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে। ২১ বছর বয়সী গলফারের হাতে শিরোপা ট্রফি তুলে দিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান প্রাইজমানি হিসেবে ৫৪ হাজার ডলারের চেক তুলে দিয়েছেন তাঁর হাতে।

বসুন্ধরা ওপেনের তিন আসরের মধ্যে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জিতে নিলেন কোনো থাই গলফার। গত আসরে থিটিফুন চুয়াপ্রাকংও জিতেছিলেন তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম শিরোপা। কাল শেষ দিনেও যে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন জ্যাজ, তাতে অবশ্য বোঝার উপায়ই ছিল না এর আগে কখনোই তিনি শীর্ষে থেকে শেষ রাউন্ডে খেলেননি। ভারতীয় তরুণ শুভঙ্কর শর্মা চাপে ঠিকই ভেঙে পড়েছেন।

লিডার গ্রুপে থেকেও শেষ পর্যন্ত সেরা তিনেও তিনি শেষ করতে পারেননি। সব মিলিয়ে খেলেছেন ১০ আন্ডার। যেখানে ১৩ আন্ডার খেলে জ্যাজের ঠিক পেছনে থেকেই শেষ করেছেন সিদ্দিক। আগের দিন -৮ এ শেষ করেছিলেন, অর্থাৎ কাল আবারও ৫ আন্ডার খেলেছেন দেশসেরা এই গলফার। কিন্তু জ্যাজ যে কোনো ভুল করেননি, ৪ আন্ডার খেলে তিনিও স্কোর নিয়ে গেছেন -১৭তে। তাঁর একটু ভুলচুকেই কেবল সুযোগটা নিতে পারতেন সিদ্দিক। ফ্রন্ট নাইনের পারফরম্যান্সে যেমন জ্যাজকে পেছনে ফেলেছিলেন তিনি ৩ আন্ডার খেলে, জ্যাজ সেখানে খেলেছিলেন ২ আন্ডার। লিডারবোর্ডে তখন ১৫ আন্ডার জ্যাজের, সিদ্দিকের ১১ আন্ডার। এই গ্রাফে পরের ৯ হোলে লড়াইটা জমে ওঠার খুব ভালো সম্ভাবনাই ছিল। কিন্তু এই ব্যাক নাইনেই প্রথম তিনটি হোল পার খেলার পর ১২ নম্বর হোলে দিনের প্রথম বোগি হয়ে গেল সিদ্দিকের। আগের হোলে বার্ডি খেলে জ্যাজ তাঁর ওপর চাপ বাড়িয়ে থাকবেন হয়তো। দুজনের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকে এর পর থেকেই। ১৩ নম্বর হোলে তাঁরা যখন খেলছেন তখন জ্যাজ ১৬ আন্ডার পারে, সিদ্দিক নেমে গেছেন ১০ আন্ডারে। পরের ৬ হোলে ৬ শটের ব্যবধান কমানোটা তখন সত্যিই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

তাও হতো যদি জ্যাজ কোথাও ছাড় দিতেন। ভাবা যায়, ক্যারিয়ারে প্রথম এশিয়ান ট্যুর শিরোপা জয়ের পথে শেষ রাউন্ডে একটা বোগিও খেলেননি ২১ বছর বয়সী এই গলফার! বরাবর ৪ বার্ডিতে দিন শেষ করেছেন। সিদ্দিক যেখানে টানা তৃতীয় দিনের মতো ৬ বার্ডি খেলেছেন, বিপরীতে বোগি একটি।

লড়াইটা চার দিনের হলেও সিদ্দিক নিজে সেই লড়াইয়ে আসলে দ্বিতীয় দিন থেকে। প্রথম দিন ৩ বার্ডির বিপরীতে তাঁর ১ ওভার বাউন্ডারিই স্কোর শূন্য করে দিয়েছে। জ্যাজ দ্বিতীয় দিন যেখানে শুরু করেছেন ৭ আন্ডার থেকে, সেখানে সিদ্দিকের শুরু শূন্য। টানা তিন দিনের লড়াইয়ে সেই ব্যবধান ৪ শটে নামিয়ে আনতে পেরেছেন তিনি। এর বেশি নয়। খেলা শেষে সিদ্দিক নিজেও বলেছেন জ্যাজই ট্রফিটার বেশি দাবিদার ছিলেন, ‘জ্যাজ খুবই ভালো খেলেছে। সে-ই আসলে শিরোপার যোগ্য। আমি তাকে অভিনন্দন জানাই। ’ দ্বিতীয় সেরা এবং বাংলাদেশের সেরা পারফরমার হিসেবে সিদ্দিকের হাতেও ক্রেস্ট উঠেছে, পেয়েছেন ৩৩ হাজার ডলার প্রাইজমানি। সব মিলিয়ে সিদ্দিকও সন্তুষ্ট তাঁর এবারের আসরের পারফরম্যান্স নিয়ে, ‘অনেক উত্থান-পতন ছিল। তার পরও দেশের মাটিতে দেশের সবচেয়ে বড় আসরে দ্বিতীয় হতে পেরেছি, এটাও কম অর্জন নয়। ’

পেশাদার গলফটা সেই অর্থে দেশের হয়ে খেলা না, জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করেন না এখানে কেউ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশটাই চলে আসে এবং সেটি সবার আগেই। কালও যেমন সিদ্দিকের সম্ভাবনার বার্তায় কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে হাজির হাজারখানেক দর্শক। একদল কিশোর জাতীয় পতাকা হাতে পুরো কোর্স ঘুরল তাঁর পিছু পিছু। সিদ্দিক সারা বছরই এশিয়ান ট্যুর নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশে এশিয়ান ট্যুরের এই একটি আসর তাঁর কাছে অনেক আবেগের, অনেক প্রত্যাশার। যা ছড়িয়েছে গলফ অঙ্গনেও। শেষ পর্যন্ত তিনি শিরোপা জিততে না পারলেও বসুন্ধরা বাংলাদেশ ওপেনের তৃতীয় আসরটি ঠিকই রাঙিয়ে দিয়েছেন।

সিদ্দিক নিজে আপ্লুত দেশের মাটিতে গত তিন বছর এমন একটি আসরের অংশ হতে পেরে। পৃষ্ঠপোষক বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতি সে জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি আগেও। কাল প্রধান অতিথি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনও তুলে ধরেছেন এই আসর আয়োজনের সার্থকতা, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ অত্যন্ত সফলভাবে এ টুর্নামেন্টটি আয়োজন করেছে। দেশের গলফ, ট্যুরিজমকে যা আরো প্রসারিত করেছে। ’ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ গলফ ফেডারেশনের সিনিয়র সহসভাপতি মেজর জেনারেল  এ কে এম আব্দুল্লাহিল বাকী, এশিয়ান ট্যুরের টুর্নামেন্ট ডিরেক্টর জিটিসাক ট্যাম্পসার্টসহ উপস্থিত ছিলেন বসন্ধুরা গ্রুপের উপদেষ্টা লে. কর্নেল খন্দকার আব্দুল ওয়াহেদ (অব.)।


মন্তব্য