kalerkantho


রোহিঙ্গাদের ঠেঙ্গার চরে পাঠানোর পরিকল্পনা

এত কিছুর পরও সমালোচনা সইতে হচ্ছে বাংলাদেশকে

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



এত কিছুর পরও সমালোচনা সইতে হচ্ছে বাংলাদেশকে

মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের কয়েক দশক ধরে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যথাযথ দায়িত্ব পালন না করলেও বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছে।

তবে রোহিঙ্গাদের কারণে সৃষ্ট নানা সমস্যার জন্য বাংলাদেশ যখন তাদের অন্যত্র স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে তখন এ নিয়ে আবার সমালোচনা শুরু হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহিরয়ার আলম গত বুধবার সাংবাদিকদের বলেছেন, মানবিক দিক বিবেচনা করেই বাংলাদেশ পর্যায়ক্রমে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত সব রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ঠেঙ্গারচরে স্থানান্তর করতে চায়। এটি সাময়িক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ চায়, মিয়ানমার খুব দ্রুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাক।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ২০১৫ সালেই বাংলাদেশ সরকারের এ ধরনের পরিকল্পনাকে ‘জটিল ও বিতর্কিত’ বলে অভিহিত করেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ায় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোও বিস্ময় প্রকাশ করেছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতেও গুরুত্ব পাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার প্রতিনিধি শিনজি কুবোর এক ই-মেইল বার্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা রোহিঙ্গাদের অন্যত্র স্থানান্তরের পরিকল্পনার খবরে উদ্বিগ্ন। সংস্থাটি বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে।

শিনজি কুবোর মতে, স্থানান্তরের যেকোনো প্রক্রিয়া অবশ্যই আলোচনা ও স্বেচ্ছায় হতে হবে, যেখানে সরিয়ে নেওয়া হবে তার যথার্থতা অবশ্যই যাচাই করতে হবে।

ইউরোপভিত্তিক রোহিঙ্গাদের সংগঠন ইউরোপিয়ান রোহিঙ্গা কাউন্সিল গত মঙ্গলবার আমস্টারডাম থেকে বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ঠেঙ্গারচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনাকে ‘অমানবিক’ ও ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ হিসেবে অভিহিত করে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। গত সোমবার বিবিসির এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ইউরোপিয়ান রোহিঙ্গা কাউন্সিল দাবি করেছে, নোয়াখালীর নির্জন ওই দ্বীপটি বন্যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং মানুষের বসবাস অনুপযোগী। সেখানে সড়কপথে সরাসরি যাওয়া যায় না। সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের এ পরিকল্পনা বাতিল করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে সংগঠনটি বাংলাদেশের ওই পরিকল্পনার বিরোধিতা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানায়।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, দুই বছর আগে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের হাতিয়ার একটি দ্বীপে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়ার পরই অনেকে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে পশ্চিমা উন্নয়ন সহযোগী ও সাহায্য সংস্থা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের অধিকারের বিষয়ে বেশ সরব। তারা তাদের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের পক্ষে। আবার কোনো রাষ্ট্রদূত নিজ দেশে আশ্রয়প্রার্থী শরণার্থীদের নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশে শরণার্থীদের নিয়ে তত্পরতা দেখাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা শুমারির পর ধারণা পাওয়া গেছে, সেখানে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে প্রায় ৩৩ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। এখন নতুন করে মিয়ানমার থেকে আসা আর কাউকে শরণার্থী মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশ তাদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবেই চিহ্নিত করছে।

গত ৯ অক্টোবর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে নতুন করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পর ৬৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। কবে নাগাদ তাদের ফেরত পাঠানো যাবে সে বিষয়ে কারো কোনো ধারণা নেই। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব মিয়ানমারের—এমনটি পশ্চিমা অনেক দেশ স্বীকার করলেও সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর তেমন কোনো চাপ দিচ্ছে না। বরং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও সুযোগ-সুবিধা দিতে তারা বাংলাদেশকেই যেন বেশি চাপে রেখেছে।

রোহিঙ্গারা বছরের পর বছর ধরে অবস্থান করায় বাংলাদেশে নানা সমস্য সৃষ্টি হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সফররত আনান কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকের পর রোহিঙ্গা সমস্যা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা কয়েক যুগ ধরে এ সমস্যায় আছি। রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের মাইলের পর মাইল বন শেষ হয়ে গেছে। আমাদের সামাজিক জীবন নষ্ট হচ্ছে। তাদের নিয়ে আমাদের সব সময় উদ্বিগ্ন থাকতে হয়। ’

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পর একটি নির্দিষ্ট এলাকায় স্থির নেই। তারা দ্রুত অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার বা বাংলাদেশিদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার, স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্টির আশঙ্কা করছে সরকার। এ কারণেই মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করতে সরকার পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে হাতিয়ায় স্থানান্তরের চেষ্টা এ পরিকল্পনারই অংশ।


মন্তব্য