kalerkantho


২ চীনা নাগরিককে সন্ত্রাসীদের বাধা

রেল ভবনে হঠাৎ দরপত্র সন্ত্রাস

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ঠিকাদার সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে রাজধানীর রেল ভবন। সিন্ডিকেটের বাইরের কোনো ঠিকাদার দরপত্রে অংশ নিতে চাইলে নানামুখী চাপ ও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটছে।

গত বৃহস্পতিবার সকালে রেল ভবনে একটি চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুই চীনা প্রতিনিধিকে সন্ত্রাসী চক্র লিফটে আটকে রেখে দরপত্রে অংশ নিতে বাধা দেয়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর রেল ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চীনা প্রতিনিধিদের রক্ষায় এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা কৌশলে পালিয়ে যায়। একই দিন দরপত্র জমা দেওয়ার পর জানা গেছে, ওই চীনা কম্পানিই সর্বনিম্ন দরদাতা। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পাওয়া নিয়ে এ ঘটনা ঘটেছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বিদ্যমান মিটার গেজ রেললাইনের সমান্তরালে একটি ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এর জন্য ২০১৪ সালের ১ জুলাই প্রকল্প অনুমোদন  হয়। এ প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী জুনের মধ্যে। তবে এই সময়ের মধ্যে তা শেষ করা সম্ভব হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছে।  

বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ হয়েছে।

এ অবস্থায় প্রকল্পের দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করা হয় গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর। দরপত্র কেনার সর্বশেষ সময় ছিল গত ১ ফেব্রুয়ারি। আর তা জমা দেওয়ার সময় ছিল গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত।

প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে জানান, প্রাকযোগ্য বিবেচিত হয়েছিল তিনটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার পাঁচটি প্রতিষ্ঠান তাদের দরপত্র জমা দিয়েছে। চীনের প্রতিষ্ঠান ছাড়াও দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মিলে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে। এখন মূল্যায়ন শেষ করে কার্যাদেশ দেওয়া হবে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে পাওয়ার চায়না লিমিটেডের দুজন চীনা প্রতিনিধি রেল ভবনে আসেন। তাঁরা রেল ভবনের চতুর্থ তলায় প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের কক্ষে গিয়ে দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য প্রথমে লিফটের সামনে অপেক্ষা করছিলেন। তখন সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষারত পাঁচজনের একটি দল তাঁদের সঙ্গে লিফটে ওঠে। এর পরই যুবকরা অস্ত্রের মুখে চীনা নাগরিকদের জোর করে অষ্টম তলায় নির্জন কক্ষে নিয়ে যায়। চীনা দুই প্রতিনিধি তখন ভীত-সন্ত্রস্ত্র হয়ে চিত্কার করতে থাকেন। চিত্কার শুনে বিভিন্ন কক্ষ থেকে রেলওয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাদের কাছে ছুটে আসেন। এ সময় সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। তখন চীনা প্রতিনিধিদের জন্য রেলভবনে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। পরে চীনা প্রতিনিধিরা দরপত্র জমা দেন। পরে দরপত্র বাক্স খোলা হলে দেখা যায়, পাওয়ার চায়না লিমিটেড সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের কাজটি তারা করতে পারবে বলে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ।

রেল ভবন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের দরপত্রের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া ৯টির মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে কম দর প্রস্তাব করে পাওয়ার চায়না লিমিটেড। তারা ২৫৫ দশমিক ১২ কোটি টাকার দর প্রস্তাব করে। মীর আখতার-রেস্কিন জেভি দর প্রস্তাব করেছে ৩১৪ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা। ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার দর প্রস্তাব করেছে ৩১৮ দশমিক ৮১ কোটি টাকা, সিআরএফজি-ইনফ্রাটেক ৩৫৭ দশমিক ৪৪ কোটি টাকার দর প্রস্তাব করেছে। তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কম্পানি লিমিটেড দর প্রস্তাব করেছে ২৯০ দশমিক ৩ কোটি টাকা।      

ঘটনার দিন রেলের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন রেল ভবনে। সন্ত্রাসী ঘটনার পর এলাকায় টহলরত পুলিশও সেখানে যায়। তার আগে থেকেই দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য বিশেষ নিরাপত্তার জন্য শাহবাগ থানার পাঁচ পুলিশ সদস্য রেল ভবনে ছিলেন। বৃহস্পতিবার দরপত্রে অংশ নেওয়ার পর পুলিশ চীনা ওই দুই প্রতিনিধিকে মত্স্য ভবন পর্যন্ত নিরাপত্তা দেয়।

রেল ভবনের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, হঠাৎ করেই এ ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনা নিকট অতীতে ঘটেনি। প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন, রেলের বিভিন্ন প্রকল্পের দরপত্র গ্রহণ করা হয় পূর্ব ও পশ্চিম রেলের বিভিন্ন অফিসে। কিন্তু এখন প্রকল্প পরিচালকদের অনেকে রেল ভবনে বসেন। এ কারণে দরপত্র এ ভবনে নেওয়া শুরু হয়েছে। রেল ভবনে এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম।

তবে রেল ভবন সূত্রে জানা গেছে, সীমিতসংখ্যক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রেলের কাজ পেতে আগ্রহী থাকে। তারা বিদেশিদেরও কাজ পেতে পদে পদে বাধা দেয়। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার লিফটের মধ্যে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। বিষয়টি আমরা তদন্ত করব। কিন্তু দরপত্র প্রক্রিয়ায় কেউ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। সবচেয়ে কম দর প্রস্তাব করায় চীনা ওই প্রতিষ্ঠানটি যোগ্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হতে যাচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে মূল্যায়ন কমিটি। ’ তিনি আরো বলেন, দরপত্র জমা ও খোলার সময় রেল ভবনে আগেই বাড়তি নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছিল।

শাহবাগ থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি। ’  


মন্তব্য