kalerkantho


আওয়ামী লীগের দুই পক্ষে সংঘর্ষ

গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক শিমুলের মৃত্যু

শোকে চলে গেলেন নানিও

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক শিমুলের মৃত্যু

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল শুক্রবার মারা গেছেন। শিমুলের মৃত্যুর খবর শুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর নানি রোকেয়া বেগমও (৮৫) গতকাল সন্ধ্যায় মারা যান।

পুলিশের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে, পৌরসভার মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা হালিমুল হক মিরুর শটগানের গুলিতেই আহত হন তিনি। আর শিমুলের লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, শিমুলের চোখে গুলি লেগেছিল।

এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে দলীয় ও প্রশাসনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিহত আব্দুল হাকিম শিমুল দৈনিক সমকাল পত্রিকার শাহজাদপুর উপজেলা প্রতিনিধি ছিলেন। তাঁর বাড়ি শাহজাদপুর পৌর শহরের মাতলা গ্রামে। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

আমাদের সিরাজগঞ্জ ও শাহজাদপুর প্রতিনিধি জানান, গুলিতে সাংবাদিক শিমুল নিহত হওয়ার প্রতিবাদে গতকাল সকালে শাহজাদপুর উপজেলা প্রেস ক্লাব প্রতিবাদ মিছিল করে আজ শনিবার উপজেলায় আধাবেলা হরতালের ডাক দিয়েছে। ছাত্রলীগ নেতা বিজয় আহমেদকে মারধরের ঘটনায় দুপুরে সংগঠনটির পৌর শাখা শহরে মিছিল ও সমাবেশ করে একই কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। হরতাল কর্মসূচির প্রতি সমর্থন দিয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগ।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কালীবাড়ি এলাকায় শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র হালিমুল হক মিরুর ছোট ভাই হাসিবুল ইসলাম পিন্টু পৌরসভা শাখা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ভিপি রহিমের শ্যালক ছাত্রনেতা বিজয় মাহমুদকে বেধড়ক মারধর করে তাঁর হাত-পা ভেঙে দেয়। বিজয় শাহজাদপুর সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি। তাঁকে মারধরের খবর পেয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একটি অংশের কর্মী-সমর্থক ও তাঁর মহল্লা কান্দাপাড়ার লোকজন দিলরুবা বাস টার্মিনাল এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। অবরোধকারীদের একটি অংশ পরে মণিরামপুর এলাকায় পৌরসভার মেয়র মিরুর বাড়ি ঘিরে ফেলে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এ সময় পৌর মেয়র তাঁর নিজের শটগান দিয়ে গুলি করেন। এতে ঘটনাস্থলে কর্তব্যরত সাংবাদিক শিমুল মাথায় ও মুখে গুলি লেগে গুরুতর আহত হন। দুই পাশ থেকেই গুলি করা হয়েছে বলে মেয়র দাবি করলেও প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে ঘটনার সময় শুধু মেয়রের শটগান থেকেই গুলি ছোড়া হয়েছিল।

গুরুতর অবস্থায় শিমুলকে বৃহস্পতিবার বিকেলে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অচেতন অবস্থায় তাঁকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে রাখা হয়। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শিমুলকে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু ঢাকা আনার পথে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড়ে অবস্থিত সাকোওয়াত মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক হাফিজ রহমান মিলন পরীক্ষা করে শিমুলকে মৃত ঘোষণা করেন।

দুপুরে শিমুলের মৃত্যুর খবর জানার পর স্থানীয় ও জেলার অন্য সাংবাদিকদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। জেলা ও উপজেলার সাংবাদিকরা শাহজাদপুরে ছুটে যান। তাঁরা বিক্ষোভ মিছিল করে স্থানীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন এবং থানা চত্বরে অবস্থান নেন।

এ সময় শাহজাদপুর উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি বিমল কুমার বলেন, পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরু তাঁর বেআইনি অস্ত্র ব্যবহারকালে সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল ছবি তুলছিলেন। ওই সময় জেনে বুঝেই মেয়র তাঁকে গুলি করেন। আমরা এর বিচার চাই। পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরুকে গ্রেপ্তার না করায় এর প্রতিবাদ জানান সাংবাদিকরা।

শিমুলের লাশ বিকেল ৩টার দিকে শাহজাদপুর থানায় নিয়ে আসা হলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এদিকে গুরুতর আহত ছাত্রলীগ নেতা বিজয়কে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

শাহজাদপুর থানার ওসি রেজাউল হক জানান, শাহজাদপুর সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি বিজয় মাহমুদকে মারধরের ঘটনায় তাঁর চাচা এরশাদ আলী বাদী হয়ে গতকাল সকালে থানায় মামলা করেছেন। এতে পৌর মেয়র মিরু এবং তাঁর দুই ভাইসহ ১৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় নাম উল্লেখ করা হয়েছে ১১ জনের।

ওসি আরো জানান, ইতিমধ্যেই মেয়রের দুই ভাই হাসিবুল ইসলাম পিন্টু ও মিন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে মেয়রের ব্যবহৃত শটগানটি। তিনি আরো জানান, সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে পিন্টু ও মিন্টুকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। আদালত তাঁদের জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল বিকেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গোমতী নদীতে দ্বিতীয় গোমতী সেতুর পাইলিং কাজের উদ্বোধন শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে কেউ কেউ প্রভাব বিস্তার ও দল ভারী করার চেষ্টা করছে। দল ভারী করার জন্য অনুপ্রবেশকারী পরগাছাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিষয়টি আমরা সিরিয়াসলি দেখছি। ’ তিনি আরো বলেন, সিরাজগঞ্জে সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনায় এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা হবে।

রংপুর অফিস জানায়, শহরের মাহিগঞ্জে প্রেস ক্লাব ভবনে প্রতিবাদ সভা করেন সাংবাদিকরা। তাঁরা সাংবাদিক শিমুলের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। এ ছাড়া শিমুল হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন সাংবাদিকরা। একই দাবিতে আজ শনিবার রংপুর প্রেস ক্লাব চত্বরে মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে।


মন্তব্য