kalerkantho


সে আন্দোলন সবার মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম

মো. আবদুল জলিল

আবদুর রহমান, কুমিল্লা দক্ষিণ   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সে আন্দোলন সবার মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম

১৯৪৮ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে বেশির ভাগ জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানান গণপরিষদ সদস্য কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। সরকারি কাগজে বাংলা ভাষার ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তেরও প্রতিবাদ জানান তিনি।

কিন্তু সে দাবি তত্কালীন পাকিস্তান সরকার মেনে নেয়নি। বিষয়টি বিশেষ করে ছাত্রসমাজে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। কারণ শুরুতে ভাষা আন্দোলনের মূল ভিত্তি বা শক্তি ছিল ছাত্রসমাজ। তারাই এ আন্দোলনকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেয়। ধীরে ধীরে সে আন্দোলন ঢাকা থেকে জেলায়, জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। দেশের মানুষও যখন বুঝতে পারল বাংলা ভাষা ছাড়া এ দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়, তখন তারাও সজাগ হয়ে ওঠে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে।

ভাষা আন্দোলন ঘিরে উত্তাল সেসব দিনের প্রসঙ্গ উঠতেই এভাবে স্মৃতির ডালা মেলে ধরলেন সেই আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক মো. আবদুল জলিল। গত ২৭ জানুয়ারি সকালে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। ভাষা আন্দোলনে তত্কালীন ত্রিপুরা (বর্তমান কুমিল্লা) ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

মো. আবদুল জলিলের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১ জানুয়ারি কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার উত্তরদা ইউনিয়নের চন্দনা গ্রামে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি লাকসাম নওয়াব ফয়জুন্নেছা কলেজে একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল তাঁর। বর্তমানে লাকসামের প্রাচীন সংবাদপত্র ‘সাপ্তাহিক লাকসাম’ এর প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আবদুল জলিল বলেন, ভাষা আন্দোলনের সময় কলেজে পড়তাম। মেধাবী ছাত্র হিসেবে আমার ওপরই বেশি কাজের ভার পড়ে। আন্দোলনের শুরুতে যথেষ্ট কাজ করতে হয়েছে। বাংলা ভাষাকে সবার কাছে পৌঁছে দিতে আমরা প্রথমে অনুবাদ বোর্ড করেছি। ইংরেজি লেখাগুলোকে বাংলায় অনুবাদ করে মানুষের কাছে বোধগম্য করে ছড়িয়ে দিয়েছি। তাতে কাজও হয়েছে। কারণ ইংরেজি মাধ্যমে লেখাগুলো বুঝতে কষ্ট হতো, আমারা বাংলায় অনুবাদ করার ফলে তা বুঝতে সুবিধে হয়েছে। আমরা সংকলন প্রকাশ করতাম। হাতে লেখা পোস্টার ও ব্যাচ তৈরি করেছি। সেগুলো একুশের ভোরে বিলি করেছি।  

এই ভাষাসৈনিক বলেন, ভাষা আন্দোলনের জন্য ঢাকার পরে কুমিল্লা ও লাকসাম ছিল একটি বিশেষ স্থান। যে কারণে ঢাকার পাশাপাশি কুমিল্লা, লাকসাম, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে এ আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কুমিল্লার অ্যাডভোকেট আহমেদ আলী, আলী তাহেরসহ অনেকে ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। একুশে ফেব্রুয়ারির সেই ঘটনা না ঘটলে আজকে আমরা মায়ের ভাষা নিয়ে হয়তো এভাবে গর্ববোধ করতে পারতাম না।  

স্মৃতি হাতড়ে আবদুল জলিল বলেন, কুমিল্লা অঞ্চলে আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার জন্য লাকসামের মো. আবদুল আউয়াল, গুণবতীর আবদুল মতিন, নাঙ্গলকোটের হাসানুজ্জামান খান, বরুডার আবদুল হাকিম ভূঁইয়াসহ অন্য নেতাদের সঙ্গে আমাদের তত্কালীন ছাত্র নেতাদের বেশ কয়েকবার গোপন বৈঠক হয়। কুমিল্লার সিংহ প্রেস ও নাজিরিয়া প্রেসে আমাদের গোপন লিফলেট ও পোস্টার ছাপা হতো। একবার লাকসামের গাজিমুড়া মাদ্রাসা মাঠে পূর্ব পাকিস্তানের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের সভায় আমরা প্রায় ৫০০ ছাত্র বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যাই। অবশ্য পুলিশের লাঠিপেটায় টিকতে পারিনি। পিটুনি খেয়ে ওই রাতে লাকসামের জগন্নাথ বাড়িতে শপথ নিয়েছিলাম; উর্দু ও ইংরেজি কোনোটাই শিখব না—মাতৃভাষা বাংলাই হবে রাষ্ট্রভাষা।

এখনো ভাষার জন্য আন্দোলন করছি—উল্লেখ করে আবদুল জলিল বলেন, কুমিল্লার প্রকৌশলী কানাডায় বসবাসরত রফিকুল ইসলামের তত্পরতায় আর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার উদ্যোগে একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অথচ এখনো অনেক মিডিয়ায় অপ্রয়োজনে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার হয়, আদালতে রায় লেখা হয় ইংরেজিতে, চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র লেখেন ইংরেজিতে। আমি মনে করি এটা আমাদের জন্য লজ্জা। তাই আমি যত দিন বাঁচব তত দিন সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য আন্দোলন করে যাব। একুশের এই প্রেরণায় জাতি এগিয়ে যাবে, এটাই আমার প্রত্যাশা।

জানা যায়, ভাষাসৈনিক আবদুল জলিলকে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ টেলিভিশন রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ট্র্যাব), বাসস, বাংলাদেশ বেতার কুমিল্লা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময় সম্মাননা দিয়েছে। তাঁর লেখা নাটক খুনে লাল বাংলা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বৃহত্তর লাকসাম ও কুমিল্লা সংক্ষিপ্ত অধ্যায়সহ জনপদ কথামালা প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার সাংবাদিকতার উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস, ওগো বঙ্গবন্ধু, সাগর তীরে কেওড়াবনে, পীর মুর্শিদের বাংলাদেশসহ বেশ কিছু বই লিখেছেন। ১৯৬৫ সালে তিনি লাকসামের উত্তরদা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক কাজ শুরু করেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি শিশু সংগঠন কচিকাঁচার মেলা, খেলাঘর ও সুজন মজলিশের আঞ্চলিক সংগঠক হিসেব ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৫৮ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত লাকসাম লেখক সংঘর মাধ্যমে একটি লেখক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক গোষ্ঠী তৈরির স্বপ্ন সফল হয়েছে। সেবামূলক প্রতিষ্ঠান চন্দনা প্রকাশনী, নুরজাহান স্মৃতি পাঠাগার, ভাষাসৈনিক মো. জলিল-নুরজাহান ফাউন্ডেশন গড়ে তুলেছেন।  

বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য আবদুল জলিল দুঃখ করে বলেন, ভাষাসৈনিকদের কোনো গেজেট বিজ্ঞপ্তি আজ পর্যন্ত  হয়নি। আমরা ভাষার জন্য আন্দোলন করেছি। টাকা-পয়সার জন্য লালায়িত ছিলাম না কোনো কালেই। কিন্তু তাই বলে আমরা কোনো মূল্যায়ন পাব না? সেই সময়ের সঙ্গীরা ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। আশা করি, প্রধানমন্ত্রী ভাষাসৈনিকদের মূল্যায়নের এই দাবির প্রতি নজর দেবেন।


মন্তব্য