kalerkantho


বিএনপিতে নির্বাচনের পূর্ণ প্রস্তুতি শুরু

এনাম আবেদীন   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বিএনপিতে নির্বাচনের পূর্ণ প্রস্তুতি শুরু

ন্যূনতম দাবি আদায় করেই আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে চায় বিএনপি। আর এ জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন ও নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার প্রশ্নে দর-কষাকষি অব্যাহত থাকলেও ভেতরে ভেতরে দলটি নির্বাচনের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।

যদিও গত ১৮ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন নিরপেক্ষ ইসি গঠনের প্রস্তাব উপস্থাপন করলেও সহায়ক সরকারের রূপরেখা এখনো দেননি। যথাসময়ে ওই প্রস্তাব দেওয়া হবে বলে ওই দিনই সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া জানিয়েছেন। তবে বিএনপির ভেতরের আলোচনা হলো, শুধু দাবি আদায়ে অটল থাকলেই চলবে না, হঠাৎ করে নির্বাচন হলে দল যাতে বিপাকে না পড়ে, এমন ব্যবস্থাও রাখতে হবে। তা ছাড়া গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী পর পর দুবার নির্বাচনে অংশ না নিলে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হওয়ার বিষয়টিও দলীয় আলোচনায় আছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিককালে সিনিয়র নেতাদের একাধিক বৈঠকে এমন আলোচনার পরই নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন খালেদা জিয়া। সে অনুযায়ী মাঠপর্যায়ের প্রার্থী জরিপ তথা আসনভিত্তিক বিশ্লেষণ দলটির একাধিক পর্যায় থেকে করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপির থিংকট্যাংক বলে পরিচিত ‘গবেষণা সেল’ এরই মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজে হাত দিয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

গবেষণা সেলের দায়িত্বে থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী লন্ডনে থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন ও সহায়ক সরকারের ব্যবস্থা হলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে।

তিনি বলেন, এ রকম বড় একটি দলের নির্বাচনের প্রস্তুতি সব সময়ই থাকে। কারণ গত তিনটি নির্বাচনে (সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ছাড়া) বিএনপির বেশির ভাগ প্রার্থী রয়ে গেছেন; যাঁদের বেশির ভাগই চেয়ারপারসনের পরিচিত। তা ছাড়া দলের গবেষণা সেল এ বিষয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বিএনপি অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচনে যেতে পারবে। তবে তার জন্য অবশ্যই সহায়ক সরকারের প্রয়োজন হবে।

স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, নির্বাচনে যাওয়ার  জন্য বিএনপির সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। কিন্তু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, গত তিনটি নির্বাচনে কারা প্রার্থী ছিলেন, কে কত ভোট পেয়েছিলেন, এখন দলে কার কী অবস্থান, এসব বিষয় চেয়ারপারসনের অজানা নয়। ২০০-এর বেশি প্রার্থীকে চেয়ারপারসন ব্যক্তিগতভাবেই চেনেন। সুতরাং আর ১০০ প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য কয়েকটি বৈঠক হলেই হবে।

দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর মতে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো দলে প্রার্থী বাছাই করে শীর্ষ নেতৃত্ব। ফলে গত কয়েকটি নির্বাচনে কারা প্রার্থী ছিলেন এটি ওই নেতৃত্বের প্রায় মুখস্থ। অর্থাৎ ২০০ প্রার্থী চেয়ারপারসনের মাথায়ই রয়েছে। এর মধ্যে যাঁরা মারা গেছেন বা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন, তাঁদের বদলে নতুন প্রার্থী দিতে হবে। কিন্তু সেখানেও যাচাই-বাছাই চলছে। বিশেষ করে যেখানে একাধিক যোগ্য প্রার্থী, সেখানে কে বেশি যোগ্য বা দলের প্রতি কার কী অবদান তা দেখেই প্রার্থী ঠিক করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপির গবেষণা সেলের পাশাপাশি দলটির বিভিন্ন পর্যায় থেকে আলাদাভাবে প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। ফলে নির্বাচনে যেতে বিএনপির অসুবিধা নেই। অসুবিধা হলো, কারা কিভাবে সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করবে বা আদৌ সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কি না এটি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু জানান, নির্বাচনের প্রস্তুতি বিষয়ে কেন্দ্র থেকে তাঁদের কোনো বার্তা দেওয়া হয়নি। তবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও কমিটি গঠন দেখে মনে হচ্ছে, চেয়ারপারসন নির্বাচনকে মাথায় রেখেই সব কিছু করছেন।

সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলটি শতকরা ৩২.৫০ ভাগ ভোট পেয়ে ৩০টি আসন, তার আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে শতকরা ৪০.৯৭ ভাগ ভোট পেয়ে ১৯৩, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শতকরা ৩৮.৬৭ ভাগ ভোট পেয়ে ১১৬ আসনে বিজয়ী হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির গবেষণা সেল ছাড়াও দলের স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যকে খালেদা জিয়া আসনভিত্তিক বিশ্লেষণ তৈরির দায়িত্ব দিয়েছেন। এ ছাড়া লন্ডনে বসে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে তারেক রহমানের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মনে করা হয়। সূত্র মতে, আসনভিত্তিক বাছাই বা বিশ্লেষণে কয়েকটি ‘ক্রাইটিরিয়া’ বা গাইডলাইন বিবেচনায় নিতে বলা হয়েছে। এগুলো হলো প্রথমত, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনের ফল, দ্বিতীয়ত, বর্তমান নির্বাহী কমিটিতে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর অবস্থান, তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট জেলা ও থানা কমিটির নেতাদের মতামত, চতুর্থত, দলের কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট আগ্রহী প্রার্থীর তত্পরতা বা আন্দোলনে ভূমিকা, পঞ্চমত, দলের প্রতি সংশ্লিষ্ট নেতার কমিটমেন্ট বা আস্থা এবং সর্বশেষ চেয়ারপারসনের প্রতি বিশ্বস্ততা।

নির্বাচন প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছেন এমন এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট প্রার্থী চেয়ারপারসনের প্রতি বিশ্বস্ত কি না সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ অনেকে সরকারের সঙ্গে গোপনে আঁতাত করে আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে দূরে থাকছেন বলে খালেদা জিয়ার কাছে খবর আছে। তাই ওই নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না।

এদিকে বৃহত্তর রাজশাহীর এক নেতা পুরো বিভাগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে নিতে ওই অঞ্চলের বিভাগ, জেলা ও পৌর কমিটি তাঁর ইচ্ছামতো সাজাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রভাবশালী ওই নেতা কমিটির অনেককেই সুযোগ হলে খালেদা জিয়ার কাছে নিয়ে গিয়ে সুপারিশ করছেন ‘আগামী নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে’। বিষয়টি নিয়ে বিএনপিতে জোর গুঞ্জন ও আলোচনা চলছে। বলা হচ্ছে, নিজের পছন্দের লোকদের প্রার্থী করতে তত্পরতা শুরু করেছেন প্রভাবশালী ওই নেতা।   


মন্তব্য