kalerkantho


রাগীব আলী ও ছেলের ১৪ বছর করে জেল

সিলেট অফিস   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রাগীব আলী ও ছেলের ১৪ বছর করে জেল

সিলেটের বহুল আলোচিত শিল্পপতি রাগীব আলী ও তাঁর ছেলে আবদুল হাইকে ১৪ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরো তিন মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সিলেটের তারাপুর চা-বাগানের দেবোত্তর সম্পত্তি আত্মসাৎ করতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্মারক জালিয়াতির অপরাধে রাগীব আলী ও তাঁর ছেলেকে এই দণ্ড দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এ রায় দেন সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম মো. সাইফুজ্জামান হিরো।

পৃথক চারটি ধারায় মোট ১৪ বছর সাজা দেওয়া হলেও আইনজীবীরা জানিয়েছেন, একসঙ্গে সাজাভোগের কারণে সর্বোচ্চ ছয় বছর তাঁদের কারাভোগ করতে হবে।

এই রায়ের মধ্য দিয়ে সিলেটের তারাপুর চা-বাগান আত্মসাতের ঘটনায় দায়েরকৃত দুটি মামলার মধ্যে একটি মামলার বিচার সম্পন্ন হলো। চা-বাগানের হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাতের ঘটনায় দায়েরকৃত অন্য মামলায় এখন সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। গতকালও এই মামলায় ১৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।

সিলেটের তারাপুর চা-বাগান একটি দেবোত্তর সম্পত্তি। ১৯৯০ সালে রাগীব আলী ও তাঁর স্বজনরা প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে বাগানটি দখল করেন। এ ঘটনা তদন্তে তখন সংসদীয় কমিটিও হয়।

পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালের ২৭  সেপ্টেম্বর তৎকালীন সিলেট সদর ভূমি কমিশনার এস এম আবদুল কাদের রাগীব আলীর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেন। মন্ত্রণালয়ের স্মারক জালিয়াতির মামলায় আসামি করা হয় রাগীব আলী ও তাঁর ছেলে আবদুল হাইকে। আর চা-বাগানের সম্পত্তি আত্মসাৎ-সংক্রান্ত অন্য মামলায় আসামি করা হয় রাগীব আলী ও তাঁর ছেলেসহ ছয়জনকে। অন্য আসামিরা হলেন রাগীব আলীর মেয়ে রোজিনা কাদির, জামাতা আবদুল কাদির, রাগীব আলীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় দেওয়ান মোস্তাক মজিদ ও বাগানের সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্ত।

দীর্ঘদিন মামলা দুটোর কার্যক্রম স্থগিত থাকার পর গত বছরের ১৯ জানুয়ারি ওই মামলা দুটি পুনরুজ্জীবিত করার নির্দেশ দেন সুপ্রিম কোর্ট। পরে ১০ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল এবং ১২ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির দিনই রাগীব আলী তাঁর ছেলে আবদুল হাইকে নিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। পরে ১২ নভেম্বর জকিগঞ্জ সীমান্তে গ্রেপ্তার হন আবদুল হাই। আর রাগীব আলী ২৩ নভেম্বর ভারতের করিমগঞ্জে গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে তাঁরা কারাগারে রয়েছেন।

গতকাল জালিয়াতি মামলাটির বিচার সম্পন্ন হয়। এই মামলায় আগের দিন বুধবার যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের তারিখ ঘোষণা করেছিলেন আদালত। গতকাল সকাল ১১টার দিকে রাগীব আলী ও তাঁর ছেলে আবদুল হাইকে প্রিজন ভ্যানে করে আদালতে নিয়ে আসা হয়। বিচারক প্রথমে তারাপুর চা-বাগানের সম্পত্তি আত্মসাৎ-সংক্রান্ত মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেন। গতকাল এ মামলায় মোট ১৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর আগে আরো তিনজন সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। মামলাটির ৩৩ জন সাক্ষীর মধ্যে এ নিয়ে মোট ১৬ জন সাক্ষ্য দিলেন। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।

এরপর বিকেল ৩টায় শুরু হয় জালিয়াতি মামলার কার্যক্রম। বিচারক রায়ের সারাংশ পড়ে শোনান। রায়ে আইনের চারটি ধারায় রাগীব আলী ও তাঁর ছেলেকে অভিযুক্ত করা হয়। এর মধ্যে দণ্ডবিধির ৪৬৬ ধারায় ছয় বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা, ৪৬৮ ধারায় ছয় বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা, ৪২০ ধারায় এক বছর এবং ৪৭১ ধারায় এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরো তিন মাস করে কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

রায় ঘোষণাকালে রাগীব আলী ও তাঁর ছেলে আবদুল হাই কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।

বিচার বিভাগের ইতিহাসে এই রায় একটি জনগুরুত্বপূর্ণ রায় উল্লেখ করে আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘রাগীব আলী ও তাঁর ছেলে আবদুল হাই শুধু সিলেটের নয়, তাঁরা অর্থবিত্তে বলিয়ান দেশের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। এ ধরনের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বর্তমানে বাংলাদেশে তাঁদের অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক ডকুমেন্ট (সরকারি) জালিয়াতিমূলে সৃষ্টি করে সৃষ্ট জালিয়াতি কাগজপত্র প্রতারণামূলকভাবে খাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে, মানবিক মুখোশ পরে অবৈধ প্রক্রিয়ায় জনসম্পদ আত্মসাৎ তথা লুটপাট করছে তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই রায়। ’

রাগীব আলীর পক্ষের আইনজীবী আবদুল মুকিত অপি বলেন, ‘আগের দিন (বুধবার) যুক্তিতর্কের আগে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে যুক্তিতর্কে অংশ নেননি। এর ফলে বলা যায়, মামলাটি একতরফা হয়ে যায়। এই রায়ে আমরা হতাশ। আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব। ’

আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) মাহফুজুর রহমান রায়ে সন্তুোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাগীব আলী যে জালিয়াতির মাধ্যমে তারাপুর চা-বাগান দখল করেছেন তা প্রমাণ করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। ’ এটিকে ঐতিহাসিক রায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কারাদণ্ডের ব্যাপারে জানতে চাইলে অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি বলেন, চারটি ধারায় মোট ১৪ বছর সাজা দেওয়া হয়েছে। যেহেতু একসঙ্গেই সাজাভোগ শুরু হবে সেহেতু সর্বোচ্চ সাজা ছয় বছরই তাঁদের ভোগ করতে হবে।

উল্লেখ্য, তারাপুর চা-বাগান পুরোটাই দেবোত্তর সম্পত্তি। বাগানের সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্ত ১৯৮৮ সালে রাগীব আলীকে বাগানটি দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে ইংল্যান্ড চলে যান। এরপর রাগীব আলী নিজেই এই বাগান কৌশলে প্রতারণার মাধ্যমে দখল করে নেন।

পঙ্কজ কুমার গুপ্তের অবর্তমানে একটি কথিত আমমোক্তারনামা মূলে দেবোত্তর সম্পত্তিটির সেবায়েত বনে যান দেওয়ান মোস্তাক মজিদ, যিনি রাগীব আলীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। একজন অহিন্দু ব্যক্তিকে দেবোত্তর সম্পত্তির সেবায়েত করা হয় ওই আমমোক্তারনামার মাধ্যমে। যার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সময়। পরে এই মোস্তাক মজিদই রাগীব আলীর ছেলে আবদুল হাইকে ৯৯ বছরের ইজারা দেন চা-বাগানটি।

চা-বাগান দখল করে রাগীব আলী নিজের নামে এবং তাঁর স্ত্রী ও মায়ের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এ ছাড়া চা-বাগানের জায়গা ৩৩৭টি প্লট তৈরি করে বিভিন্নজনের কাছে বিক্রি করে দেন। এসব প্লটে গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসন ও বিপণি বিতান। বর্তমানে চা-বাগানের জায়গায় রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, রাবেয়া খাতুন নার্সিং ইনস্টিটিউট, মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রাবাস, সিলেট মদন মোহন কলেজের বাণিজ্য বিভাগের ক্যাম্পাস, একটি কমিউনিটি সেন্টারসহ অসংখ্য বাসা-বাড়ি ও স্থাপনা রয়েছে।

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী গত বছর ১৫ মে সিলেটের জেলা প্রশাসন তারাপুর চা-বাগানের ৪২২ দশমিক ৯৬ একর ভূমির মধ্যে ৩২৩ একর ভূমি রাগীব আলীর দখল থেকে উদ্ধার করে সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে বুঝিয়ে দেয়। অন্যান্য স্থাপনা ছয় মাসের মধ্যে অপসারণের নির্দেশনা থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।


মন্তব্য