kalerkantho


মজিবর রহমান মাষ্টার

’৫২র বজ্রকণ্ঠ গর্জে ওঠে এখনো

ছাইদুল হক সাথী, রংপুর   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



’৫২র বজ্রকণ্ঠ গর্জে ওঠে এখনো

‘তখন আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রংপুরের বদরগঞ্জেও আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করেছি। আমরা বেশ কজন এ আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। তার মধ্যে আবু বক্কর প্রামাণিক, আব্দুল জব্বার সরকার, ইদ্রিস লোহানী ও ইউনুস লোহানী অন্যতম। সেই সময় রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে বন্দি ছিলেন কমরেড জীতেন দত্ত ও কমরেড ছয়ের উদ্দিন। জেল থেকে তাঁরা চিরকুট পাঠিয়ে আমাদের দিকনির্দেশনা দেন। কারমাইকেল কলেজের ছাত্র আব্দুল বারী শাহ্ও ছিলেন। ’ ভাষা আন্দোলনে যোগ দেওয়া নিয়ে গর্বের এ কথাগুলো মজিবর রহমান মাস্টারের। রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলায় বেঁচে থাকা একমাত্র ভাষাসৈনিক তিনি।

আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার মজিবর রহমান  মাস্টারকে নির্যাতন করে। তা সত্ত্বেও তিনি রংপুর অঞ্চলে ছাত্র-জনতাকে একত্র করে ‘বদরগঞ্জ ভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানেও ছিলেন সামনের সারিতে, মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ছিলেন অন্যতম সংগঠক। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী তিনি। তিন বছর আগে দুই দফায় তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়, গুরুতর আহত হন তিনি।

এখন বয়স ৮৬, শারীরিকভাবে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তবে মনের দিক থেকে যেন টগবগে তরুণ। বদরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে খানাখন্দে ভরা প্রায় ১০ কিলোমিটার ধুলোমাখা পথ পেরিয়ে গেলে পাওয়া যাবে কুতুবপুর ইউনিয়নের খিয়ারপাড়া গ্রাম। সেখানে আমবাগানের ভেতরে এক নিভৃত পল্লীর বাসিন্দা মজিবর রহমান মাস্টার। গত ২৬ জানুয়ারি বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল আঙিনায় হুইলচেয়ারে বসে রোদ পোহাচ্ছেন। কুশল বিনিময়ের পর এ কথা সে কথার ডালপালা ছাড়িয়ে ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ উঠল। বললেন, আমি তখন বদরগঞ্জ হাই স্কুলের ছাত্র, ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী। থাকতাম ভাড়া করা বোর্ডিংয়ে। বায়ান্ন সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আমরা ছাত্র-জনতা একটা মিটিং করছিলাম বদরগঞ্জের ডাকবাংলো মাঠে। মিটিংয়ে অনেকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ইদ্রিস লোহানী, আব্দুল বারী শাহ, ইউনুস লোহানী আর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একজন ছাত্র। আজ আর তাঁর নাম মনে নেই। তিনি ঢাকা থেকে এসেছিলেন আমাদের সংগঠিত করতে। মিটিং চলা অবস্থায়ই কে যেন খবর ফাঁস করে দেয়। থানার বড় দারোগা ওয়্যারলেসে রংপুরে খবর পাঠায়। রংপুর থেকে দুই ভ্যান পুলিশ এসে আমাদের ঘিরে ফেলে। পণ্ড করে দেয় মিটিং। অন্যরা পালাতে পারলেও আব্দুল বারী শাহেক পুলিশ অ্যারেস্ট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর আমাদের মধ্যে জেদ ছড়িয়ে পড়ে। আমার সহপাঠীসহ অন্য ছাত্রদের নিয়ে তখন থানা ঘেরাও করি। একপর্যায়ে বড় দারোগা অফিস থেকে বের হয়ে আমাদের দ্রুত সেখান থেকে চলে যাওয়ার কথা বলেন। না গেলে মারাত্মক ক্ষতি হবে বলে আমাদের হুঁশিয়ার করে দেন। দারোগার উপস্থিতিতে আব্দুল বারীও হাজত থেকে বের হয়ে আমাদের চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তাঁকে হাজতে রেখে আমরা চলে আসি। পরে জানতে পারি, আমাদের ১১ জনের নামে ওয়ারেন্ট জারি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আমি, আব্দুল বারী, আব্দুল জব্বার সরকার, আবু বক্কর প্রামাণিক, ইউনুস লোহানী, ইদ্রিস লোহানী, মোখলেছার রহমান ওরফে মজনু লোহানী ছিলেন। আরো কয়েকজন ছিলেন। তাঁদের নাম আমার মনে নেই। ওই সময় ভাষার জন্য আন্দোলন এবং রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় কমরেড ছয়ের উদ্দিন ও কমরেড জীতেন দত্তকে রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে রাখা হয়। কিন্তু সেখান থেকে তাঁরা গোপনে চিরকুট পাঠিয়ে আমাদের আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিতেন। তাঁদের পরামর্শেই আমরা রংপুর অঞ্চলে আন্দোলন জোরদার করি। ওই সময় বদরগঞ্জ হাই স্কুলের হেডমাস্টার শংকর রায়ও আন্দোলনের কৌশল বলে দিতেন।

মজিবর রহমান মাস্টার স্মৃতি হাতড়ে বলেন, বায়ান্নতে ঢাকাসহ সারা দেশে ভাষার দাবিতে আন্দোলনে নামার ডাক পড়ে। ঢাকায় তখন গোলাগুলি চলছে। আমরা ছাত্র-জনতাকে জোটবদ্ধ করার চেষ্টা করছি। মনে আছে, রংপুর, মিঠাপুকুর, তারাগঞ্জসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গিয়ে লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতাম। স্কুল-কলেজে গিয়ে ছাত্রদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি। মাঠে কৃৃষি শ্রমিকদের কাছে গিয়ে বলেছি, আমাদের মাতৃভাষা কেড়ে নিচ্ছে পাকিস্তানিরা। এটা করতে দেওয়া যায় না। এ কারণে আমাদের আন্দোলনে ছাত্র-জনতা কিষান-শ্রমিক সবাই যুক্ত ছিল।   ভাষা আন্দোলনের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস এ প্রজন্মের সন্তানদের জানা দরকার।

মজিবর রহমান মাস্টারের জন্ম ১৯৩১ সালের ১ মার্চ। দুই ছেলে ও এক মেয়ের বাবা তিনি। স্বাধীনতার পর উপজেলার শ্যামপুর হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন স্কুল-কলেজ, মাদরাসাসহ অনেক প্রতিষ্ঠান। তাঁর নামে বদরগঞ্জে রয়েছে ‘মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান কল্যাণ ট্রাস্ট’। ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বদরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন থেকে তাঁকে ভাষাসৈনিকের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তাঁর আরেক সঙ্গী আব্দুল জব্বারও স্বীকৃতি পান। একই বছর মজিবর রহমান মাস্টারকে বাংলাদেশ স্কাউটের সর্বোচ্চ সম্মান রৌপ্য ব্যাঘ্র পদক দেওয়া হয়। ২০০৩ সালে স্কাউট থেকে তিনি পান রৌপ্য ইলিশ পদক।

এখন চলাফেরা করতে হয় হুইলচেয়ারে বসে। তবে মনের জোর কমেনি। কণ্ঠে তাঁর এখনো ভাষা আর স্বাধীনতার গান। ভাষার মাস এলে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জড়ো করে শোনান বায়ান্ন ও একাত্তরের কথা। জীবদ্দশায় দেখে যেতে চান একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধী সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

আলাপের শেষ পর্যায়ে বললেন, বঙ্গবন্ধুকন্যার একক প্রচেষ্টায় দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক নেতা তাঁর অর্জন নষ্ট করছেন। চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো পাঁচ লাখ টাকার অনুদানের চিঠিও দেখালেন। একদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে একুশে ও স্বাধীনতা পদক নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি।


মন্তব্য