kalerkantho


মাহমুদ আব্বাস-শেখ হাসিনা বৈঠক

ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে ফিলিস্তিনকে সমর্থন

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে ফিলিস্তিনকে সমর্থন

সফররত ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে বিদায় নেন। ছবি : বাসস

ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি বাংলাদেশ তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত ও আগ্রাসী তৎপরতার জন্য ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে নতুন করে ইহুদি বসতি নির্মাণের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে ঢাকা। ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল—দুটি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন জানানো হয়েছে। সফররত ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে বৈঠকে ঢাকার এ অবস্থান তুলে ধরা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদও ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশের একই অবস্থান তুলে ধরেন।

বার্তা সংস্থা বাসস জানায়, বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শেখ হাসিনা-মাহমুদ আব্বাস বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিমকে সঙ্গে নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ফিলিস্তিনিদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তাকে সমর্থন করে বলেও প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে উল্লেখ করেছেন।

পশ্চিম তীর ও গাজায় সংকটময় পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ইস্যু সমাধানে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ‘দুই জাতির জন্য দুই রাষ্ট্র’ নীতিটিও বর্তমানে ইসরায়েলের আগ্রাসনের কারণে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

শহীদুল হক বলেন, বাংলাদেশ ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তার অকুণ্ঠ সমর্থন অব্যাহত রাখবে।

পররাষ্ট্রসচিব জানান, প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সফরের মধ্য দিয়ে দেশটির সঙ্গে ঢাকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন দ্বার খুলেছে।

এর আগে বিকেল ৩টা ২২ মিনিটে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এসে পৌঁছলে শেখ হাসিনা তাঁকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান। দুই নেতা প্রায় ১৫ মিনিট একান্তে কথা বলার পর দুই দেশের মধ্যে আধা ঘণ্টাব্যাপী আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ আল মালিকী তাতে স্বাক্ষর করেন।

ফিলিস্তিনের প্রধান বিচারপতি মাহমুদ আলহাব্বাশ, প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র নাবিল আবুরুদাইনাহ, কূটনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাজদি খালদিসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে ঢাকা সফরে এসেছেন।

পররাষ্ট্রসচিব জানান, এর আগে গত ডিসেম্বর মাসে দুই পক্ষ জ্বালানি সহযোগিতা বিষয়ে একটি এমওইউ স্বাক্ষর করেছে। তিনি বলেন, চলতি সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে দুইবার তিনি ঢাকায় যাত্রাবিরতি করলেও এটিই তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছিলেন।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইয়াসির আরাফাতের সমর্থনের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট অব্যাহত সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান।

এর আগে গতকাল দুপুরে মাহমুদ আব্বাস সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানান। পরে তিনি ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

আব্বাসের জন্য ইলিশ আর কাচ্চি ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট গত সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে দরবার হলে রাষ্ট্রপতি আয়োজিত ভোজসভায় যোগ দেন।

বিডিনিউজ জানায়, মাহমুদ আব্বাসের জন্য বঙ্গভবনের নৈশভোজে ফরাসি কায়দায় রান্না করা লবস্টার যেমন ছিল, তেমনি ছিল ঢাকাই কাচ্চি বিরিয়ানি, ইলিশ, রেশমি কাবাব ও আলু বোখারার চাটনি। ডেজার্টে ছিল পাটিসাপটা পিঠা। এ নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সোনারগাঁও হোটেলের রান্না করা খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হয় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টকে।

পাঁচ কোর্সের ওই ভোজ শুরু হয় ‘স্মোকড হিলসা অন টোস্ট’ দিয়ে। এরপর টেবিলে আসে ক্রিম অব মাশরুম স্যুপ। সঙ্গে ছিল ব্রেড অ্যান্ড বাটার। মেইন কোর্সে প্রথমে টেবিলে আসে ফরাসি ডিশ ‘লবস্টার থারমিডরি’; যা পরিবেশন করা হয় মিক্সড ভেজিটেবল ও বয়েলড পটেটোসহ।

এরপর আসে মাটন কাচ্চি বিরিয়ানি ও রেশমি কাবাব; যা আলু বোখারার চাটনি ও মিক্সড সালাদসহ পরিবেশন করা হয়। ডেজার্টে ছিল বেকড চিজ কেক, পাটিসাপটা, ফ্রুট ককটেল, চা, কফি।

জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এইচ এম এরশাদ, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খোন্দকার মোশাররফ হোসেন, সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী ও এইচ টি ইমামও নৈশভোজে অংশ নেন।

ঢাকায় কূটনৈতিক কোরের ডিন ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত ওয়ানজা ক্যাম্পোস দ্য নবরেগা, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটও বঙ্গভবনের ওই নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন।

সফরের শেষ দিন আজ শুক্রবার সকালে মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। সফরসূচি অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট আগামীকাল দুপুর ২টায় ঢাকা ছাড়বেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী বিমানবন্দরে তাঁকে বিদায় জানাবেন।


মন্তব্য