kalerkantho


মোবাইল ফোনের সিম নকল

নতুন কৌশলে প্রতারণা

কাজী হাফিজ, এস এম আজাদ ও রেজোয়ান বিশ্বাস   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নতুন কৌশলে প্রতারণা

প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে যে কারো মোবাইল ফোন নম্বর নকল করে প্রতারণার কৌশল কয়েক বছর আগেই রপ্ত করেছে অপরাধীচক্র। বিশেষ সফটওয়্যার ও অ্যাপসের মাধ্যমে মোবাইল ফোন নম্বর নকল করার এ পদ্ধতিকে বলা হয় ক্লোনিং।

মন্ত্রী, এমপিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন নম্বর নকল করে প্রতারণার বেশ কিছু ঘটনা ধরাও পড়েছে। তবে এরই মধ্যে অপরাধীরা পাল্টে ফেলেছে প্রতারণার কৌশল। এবার তারা নিয়ে এসেছে স্পুফিং নামের আরেক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে প্রতারকচক্রের কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন আইডি (পরিচয়) হাইড (গোপন) রাখা যায়। তবে স্পুফিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনাও নজরে এসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করা গেছে একটি বড় চক্রকে। গত বুধবার রাতে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে সংঘবদ্ধ এ প্রতারকচক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

তদন্তসংশ্লিষ্ট র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, সারা দেশে প্রতারকচক্রের অন্তত অর্ধশত সদস্য রয়েছে। তারা নতুন কৌশলে মানুষকে ফাঁদে ফেলে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। তারা মত্স্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ নম্বরের ‘ইয়েস কার্ড’ অ্যাপের মাধ্যমে কল স্পুফিং করে।

এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তির মোবাইল ফোন নম্বর হুবহু নকল করে কাউকে ফোন করা যায়। এ কৌশল ব্যবহার করে ৪০ সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে অন্তত ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পেয়েছে র‌্যাব।

দেশের আরো অনেকের মতো টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিও এ ধরনের প্রতারণার শিকার বলে জানা গেছে। গত বছরের ১৭ অক্টোবর বিটিআরসি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়, তাদের কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে ফোন বা এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রতারকচক্র। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের নম্বর এবং অবৈধ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিটিআরসির নিজস্ব ল্যান্ডলাইন অথবা মোবাইল ফোন নম্বর নকল করে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতারকচক্র জেনে নিচ্ছে সিম নিবন্ধনের তথ্য, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের পিন নম্বর এবং ব্যক্তিগত তথ্য। ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিটিআরসি আরো জানিয়েছিল, বিটিআরসি থেকে কখনো এভাবে ফোন বা এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য অথবা গোপন পিন নম্বর বা পাসওয়ার্ড চাওয়া হয় না।

কয়েক বছর ধরে মোবাইল ফোনের সিম ক্লোনিং বা স্পুফিং করে প্রতারকচক্র অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও এর প্রতিরোধমূলক সফল কোনো ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম গতকাল বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, মোবাইল ফোন অপারেটররা এ বিষয়ে নিজ উদ্যোগে কাজ করছে। দুটি অপারেটর তাদের নিজস্ব নম্বরের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে সফল হয়েছে বলে জানিয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে শতভাগ কার্যকর কোনো পন্থা না পাওয়া পর্যন্ত তা গ্রহণ করা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মোবাইল ফোন নম্বর নকল করার এসব তত্পরতা রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। তবে মোবাইল ফোনের মালিক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সচেতন হলে এ প্রতারকচক্রকে ধরা সম্ভব।  

র‌্যাব ও পুলিশের একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, গত দুই বছরে মন্ত্রী, এমপি, সচিব, আইজিপি, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোনের সিম ক্লোন করে অর্থাত্ হুবহু একই নম্বর থেকে কল করে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি, বদলি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ব্যক্তির মোবাইল ফোন নম্বরের নকল নম্বর থেকে কল করে তদবিরের ঘটনা ঘটেছে। অনুসন্ধানে এমন তথ্য পেয়ে মাঠে নামে পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দারা। এর আগেও বেশ কয়েকটি প্রতারকচক্র ধরা পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার স্পুফিং চক্র ধরা পড়েছে। গোয়েন্দা জালের ফাঁক গলে বেরিয়ে অপরাধ চালানোর লক্ষ্যেই স্পুফিং কৌশল বের করে প্রতারকরা।

গতকাল সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত বুধবার রাতে রাজধানীর উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রতারকচক্রের মূল হোতা আশরাফুল ইসলাম ওরফে আপেলসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৪-এর একটি দল। গ্রেপ্তার করা অন্যরা হলো আপেলের সহযোগী মাহমুদুল হাসান ওরফে হাসান ওরফে হূদয় চৌধুরী ওরফে রবিন (১৯), রাকিবুল ইসলাম (২৩), মহিদুল ইসলাম ওরফে মিলন (২০), আবু কাউছার সাবু (১৯), নাজমুল হাসান (১৯), আমানউল্লাহ আমান (২৮), সাগর হোসাইন ওরফে সাগর (২৬) ও বিল্লাল হোসেন ওরফে বিল্লালকে (২১)। তাদের কাছ থেকে ২২টি মোবাইল ফোনসেট, ৫৩টি সিম, আটটি বিকাশ সিম, দুটি ল্যাপটপ, চারটি সিপিইউ, পাঁচটি মনিটর, একটি মডেম এবং নগদ ১৭ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সার্ভারে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের হটলাইন নম্বর ১৬২১৬ এবং মোবাইল ফোন কম্পানির কাস্টমার সার্ভিস নম্বর ১২১ ও ১২৩ স্পুফিং করার তথ্য পাওয়া গেছে।

সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক লুত্ফুল কবীর বলেন, গত ১২ ডিসেম্বর ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেনকে একই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার মোবাইল ফোন নম্বর থেকে কল দিয়ে সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দের কথা বলে বিকাশের মাধ্যমে ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় একটি চক্র। গত ৬ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানের মোবাইল ফোনে ওই জেলার ডিসির মোবাইল ফোন নম্বর থেকে একটি কল যায় এবং ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলে ৫০ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে চাওয়া হয়। টাকা পাঠানোর পর আবারও টাকা চাওয়া হলে মোবাইল ফোন নম্বরটি যাচাই করে উপজেলা চেয়ারম্যান বুঝতে পারেন তিনি প্রতারিত হয়েছেন। এ ছাড়া মত্স্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বর স্পুফিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহার করে অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনৈতিক দাবি এবং নির্দেশনা দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আইনানুগ ব্যবস্থা চেয়ে র‌্যাব সদর দপ্তরে একটি আবেদন করেন অধিদপ্তরের উপপরিচালক। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার জন্য র‌্যাব কার্যক্রম শুরু করে এবং এরই ধারাবাহিকতায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে লুত্ফুল কবীর বলেন, চক্রটি সংঘবদ্ধভাবে কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, দিনাজপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডিসিসহ আরো অনেক ডিসির নম্বর স্পুফিং করে প্রতারণা করেছিল। ভোলা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, ঠাকুরগাঁও, চাঁদপুর, মেহেরপুর, বাগেরহাটসহ ৪০টির বেশি উপজেলার ইউএনও পরিচয় দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৫০ লাখ টাকার বেশি অর্থ তারা আত্মসাত্ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা র‌্যাবকে আরো জানায়, তারা ইয়েস কার্ড অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল ফোন নম্বর স্পুফিং করে নিজেরা ইউএনও বা ডিসি পরিচয় দিয়ে চাল-গম বরাদ্দের কথা বলে সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়া তারা দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া নামে রেজিস্ট্রি করা মোবাইল ফোনের সিম বিভিন্ন অপরাধীর কাছে বিক্রি করে আসছিল।  

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, চক্রটি বিটিআরসির অনুমোদন ছাড়া অবৈধভাবে তাদের ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনে ওই ইয়েস কার্ড অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে কল করার জন্য প্রতি মিনিট এক টাকা ৭০ পয়সা মূল্যে অন্য সদস্যের কাছে বিক্রি করত। পাশাপাশি প্রতারকচক্রটি তাদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড শেখানোর বিজ্ঞাপন আপলোড করত এবং যোগাযোগের জন্য ০১৭৬০৪৪০২৪৮ নম্বরটি ব্যবহার করত। ‘ইয়েস কার্ড অ্যাপ’ মূলত বহির্বিশ্বে প্রচলিত ‘ITEL MOBILE DIALER’ সফটওয়্যারটির রূপান্তরিত সংস্করণ। এ ধরনের সফটওয়্যারের সার্ভার বিদেশে নানা প্রতিষ্ঠানের হয়ে থাকে। কল করলে কলটি সেই সার্ভার হয়ে বাংলাদেশের গেটওয়ে দিয়ে টার্গেট ব্যক্তির মোবাইল ফোনে আসে। ফলে যে নম্বরে কলটি আসে, সেটিতে রেকর্ড থাকলেও যার নম্বর ব্যবহার করা হয় সেটিতে কোনো রেকর্ড থাকে না। কারণ এই স্পুফিং কলে কোনো অপারেটরের টাওয়ার ব্যবহূত হয় না। প্রতারিত ব্যক্তি যদি সেই নম্বরে কলব্যাক (ফিরতি কল) করে তাহলে কলটি প্রকৃত ব্যবহারকারীর কাছেই যাবে এবং তখনই কেবল প্রতারণার বিষয়টি বোঝা যাবে। এ ছাড়া প্রতারণার কাজে ব্যবহূত ওই সফটওয়্যারগুলোর একটি অংশ প্রতারকদের মোবাইল ফোনে ইনস্টল করা থাকে। আরেক অংশ যেটি বিলিং ম্যানেজার নামে পরিচিত, সেটি ইনস্টল করা থাকে কম্পিউটারে। যে নম্বর ব্যবহার করে প্রতারণা করা হবে তার জন্য ডলারের বিনিময়ে এ বিলিং ম্যানেজারের মাধ্যমে একটি ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড নিতে হয় এবং মিনিট কিনতে হয়। কেনা মিনিটগুলো দিয়ে মোবাইল ফোনের সফটওয়্যারটির মাধ্যমে টার্গেট ব্যক্তির মোবাইলে কল করা হয়। প্রতারণায় ব্যবহূত এসব অ্যাপের নিয়ন্ত্রণকারী সার্ভার বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হওয়ায় এবং প্রতারকদের চিহ্নিত করার জন্য সরাসরি কোনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি না থাকায় এ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা কিছুটা কষ্টকর ও সময়সাপেক্ষ।

তবে র‌্যাবের অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অচিরেই এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। স্পুফিং কল বন্ধ করার জন্য প্রযুক্তিগত কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত আছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, ‘বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম রেজিস্ট্রেশনের ফলে চাঁদাবাজি, অপহরণসহ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ কমেছে। এ পদ্ধতিতে এখন আর কোনো অপরাধ সংঘটিত হয় না। এর পরও আমরা কিছু অভিযোগ পাচ্ছি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নানাজনকে নানা ধরনের হুমকি দেওয়া এবং চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। মূলত এ ধরনের অপরাধ করা হচ্ছে কম্পিউটারাইজড প্রযুক্তি স্পুফিংয়ের মাধ্যমে। এটি বায়োমেট্রিক পদ্ধতির কোনো ত্রুটি নয়। ’ স্পুফিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণার বিষয়ে জনসাধারণকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, যখনই এ ধরনের কোনো কল গ্রাহকরা পাবেন তখন কথা বলা শেষে সঙ্গে সঙ্গে সেই নম্বরে কল ব্যাক করবেন। তাহলে ওই প্রান্ত থেকে যিনি ফোন ধরবেন তাঁর সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যাবে তিনি আসল অপরাধী কি না।

প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তন হয়। সেই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের ধরনও পাল্টে যায়। স্পুফিং প্রতিরোধে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্য প্রস্তাব এসেছে তারও নেতিবাচক কিছু দিক রয়েছে। রোমিংয়ের ক্ষেত্রে এটা জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। সে কারণে কার্যকারিতা সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে কিছু করা ঠিক হবে না। তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ’

ক্লোনিং থেকে স্পুফিং :  গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে মোবাইল ফোন ক্লোনিং করে প্রতারণার বিষয়টি দেশে আলোচনায় আসে। ওই বছর বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের নাম ব্যবহার করে তাঁর গ্রামীণফোন নম্বর থেকে একটি তদবির করা হয়। বিষয়টি জেনে তিনি গ্রামীণফোনের কাছে অভিযোগ করেন। শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু ও তাঁর এপিএসের মোবাইল ফোন নম্বর নকল করেও করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে কল করে বিভিন্ন তদবির করে একটি চক্র। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তাও এ রকম প্রতারণার শিকার হন। তিনি শেরেবাংলানগর থানায় জিডি করলে পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করে। ওই বছরের আগস্ট মাসে পুলিশের আইজির মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার করে ডিএমপির এক ওসিকে ফোন করে এক আসামিকে ছাড়িয়ে নেয় চক্রটি। এ রকম অসংখ্য ঘটনার পর তদন্তে নামে পুলিশ ও র‌্যাব। তদন্তে তারা জানতে পারে, মাসকিং সফটওয়্যারসহ বিভিন্ন নামে সফটওয়্যার আছে, যা দিয়ে যেকোনো নম্বর থেকে কল করা যায়। এ প্রতারণাকেই বলে ক্লোনিং।

গোয়েন্দাদের মতে, কারো মোবাইল ফোনে যদি একজনের নম্বর সেভ করা থাকে, পরবর্তী সময়ে প্রতারক অন্য অপারেটরের একই ডিজিটের নম্বর দিয়ে তাকে কল করলে সেভ করা নম্বরটি স্ক্রিনে দেখাবে। পরিচিত কোনো নম্বর থেকে মিসড কল পাওয়ার পর সেই নম্বরে কলব্যাক করলে সিম ক্লোনিংয়ের শিকার হতে হয়। এ ক্ষেত্রেও বিশেষ একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। সিম ক্লোনিং হলে মোবাইল ফোনের সিম ও মেমোরি কার্ডে থাকা তথ্য-উপাত্তও চুরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ‘ক্লোনিং’ করতে হলে সিমের পুরো তথ্যই চুরি করতে হয়।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, ক্লোনিং ও স্পুফিং অপরাধীদের দ্রুত খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে প্রতিটি ব্যাটালিয়নকে ট্র্যাকার মেশিন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের শক্তিশালী ট্র্যাকারের মাধ্যমেই ধরা পড়েছে প্রতারকচক্র।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, স্পুফ (Spoof) অর্থ প্রতারণা করা বা ধোঁকা দেওয়া। আইটিজগতেও স্পুফিং অর্থ কোনো সিস্টেম বা ইউজারকে ধোঁকা দেওয়া। সাধারণত কোনো ইউজারের আইডি গোপন করে অথবা নকল করে স্পুফিং করা হয়। বিভিন্ন পদ্ধতিতে স্পুফিং করা যায়। আরেকটি স্পুফিং পদ্ধতি হচ্ছে আইপি স্পুফিং। এ পদ্ধতিতে কোনো কম্পিউটার সিস্টেমের আইপি অ্যাড্রেস গোপন বা নকল করা হয়। ইন্টারনেটে যখন কেউ তথ্য পাঠায় তখন আইপি অ্যাড্রেসের মাধ্যমে ওই তথ্যের উত্স শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু যখন আইপি স্পুফিং করা হয় অর্থাত্ ভুয়া আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহার করা হয় তখন সহজে ওই তথ্যের সঠিক উত্স শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। কিছু সিকিউরিটি সফটওয়্যার রয়েছে, যেগুলো এ ধরনের আক্রমণ শনাক্ত করে তা প্রতিহত করতে পারে। তবে বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের কল স্পুফিংয়ের নজির পাওয়া গেলেও অন্য কোনো স্পুফিংয়ের কথা তেমন জানা যায়নি।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মিনহাজুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের অস্বাভাবিক ফোনকল এলে বিচলিত না হয়ে স্বাভাবিক থাকতে হবে। কথা শেষ হওয়ার পর ওই নম্বরে কল করলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। কারণ স্পুফিংয়ের মাধ্যমে কল করা যাবে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই নম্বরে কলব্যাক করলে সেটি আসল ইউজারের কাছেই যাবে। তখন আসল ইউজারের কাছে ব্যাপারটি জানতে চাইলে সন্দেহ দূর হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও অবহিত করা প্রয়োজন। সিম ক্লোনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।


মন্তব্য