kalerkantho


চট্টগ্রাম আ. লীগ

বিরোধ,স্থবিরতা নিরসনে যাচ্ছেন কাদের-হানিফ

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বিরোধ,স্থবিরতা নিরসনে যাচ্ছেন কাদের-হানিফ

চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা শাখা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০০৩ সালের মাঝামাঝি। প্রায় সাড়ে ১৩ বছর অতিবাহিত হলেও ক্ষমতাসীন দলটির গুরুত্বপূর্ণ এই সাংগঠনিক শাখার সম্মেলন হয়নি।


ডবলমুরিং থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল ১২ বছর আগে। কিন্তু এরপর আহ্বায়ক কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি, সম্মেলনেরও কোনো উদ্যোগ নেই।
ফিরিঙ্গীবাজার সাংগঠনিক ওয়ার্ডের সম্মেলন হয়েছিল ২০০৩ সালে। ১৩ বছরের বেশি সময় পার হলেও এই ওয়ার্ডের এখনো সম্মেলন হয়নি।
শুধু তাই নয়, এই তিন সাংগঠনিক থানা ও ওয়ার্ডের মতো অবস্থা নগরের বেশির ভাগ থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিট আওয়ামী লীগের। এ ছাড়া সর্বশেষ কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি গঠনের পর এরই মধ্যে তিন বছর পেরিয়ে গেছে। এই কমিটির মেয়াদকালে এখনো পর্যন্ত নগরে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের তত্পরতা দেখা যাচ্ছে না। নেতাকর্মীদের দলাদলি ও সম্মেলন না হওয়ার কারণে তৃণমূলে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা জানান, ক্ষমতায় থাকলে দল শক্তিশালী হওয়ার কথা। কিন্তু চট্টগ্রামে এর উল্টো চিত্র। স্থানীয় শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের দলাদলির কারণেই সম্মেলন হচ্ছে না তৃণমূলে। এ ছাড়া নগর আওয়ামী লীগের নিয়মিত কার্যনির্বাহী কমিটি ও বর্ধিত সভা হচ্ছে না। দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। আবার এসব কর্মসূচিতেও নেতাকর্মীদের উপস্থিতি নগণ্য। আশানুরূপ উপস্থিতি না দেখে সম্প্রতি কয়েকটি সভা-সমাবেশে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দুই নেতা ঘোষণা দেন, পদ-পদবিতে থেকে দলের কর্মসূচিতে উপস্থিত না থাকলে তাদের পদ ছেড়ে দিতে।
প্রভাবশালী একাধিক নেতা জানান, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এখন ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। তাঁরা দলের পদ ব্যবহার করে নিজেদের আখের গোছাচ্ছেন। শুধু নেতা নয়, কর্মী-সমর্থকরাও দলকে ব্যবহার করে লাভবান হচ্ছে।
এদিকে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগকে ঢেলে সাজিয়ে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে এবং নেতাদের মধ্যে বিভেদ কমাতে কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম আসার কথা রয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য মাহবুবউল আলম হানিফের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল চট্টগ্রাম আসবে। ওই দিন দলের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও উপস্থিত থাকতে পারেন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
এ ব্যাপারে মাহবুবউল আলম হানিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগে কোনো কোন্দল নেই। দলকে আরো শক্তিশালী করতে সাংগঠনিক কাজে আমরা ১১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম যাচ্ছি। চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথেও বসার কথা রয়েছে। ’
কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের চট্টগ্রাম আসাকে কেন্দ্র করে নগরের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ওই দিন চট্টগ্রামের তিন সাংগঠনিক জেলা আওয়ামী লীগের যৌথ কর্মিসভা হতে পারে। তবে অনেকে বলছেন, মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা কমিটির নেতাদের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক না হলে বিরোধ মিটবে না।
একই বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীম গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলকে সাংগঠনিকভাবে আরো শক্তিশালী করতে ইতিমধ্যে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, থানা, জেলা পর্যায়ে কোথায় সম্মেলন হচ্ছে না সেখানে আমরা দ্রুত সম্মেলনের উদ্যোগ নিয়েছি। ২০১৯ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা দলকে গোছাচ্ছি। আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। কোনো বিরোধ থাকবে না। সব সমাধান হয়ে যাবে। ’
শামীম আরো বলেন, আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি দুপুর ২টায় চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের যৌথ প্রতিনিধি সভা হবে। এতে দলের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উপস্থিত থেকে নীতিনির্ধারণী গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেবেন।
সাংগঠনিক স্থবিরতার কথা জানিয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন, ‘দলীয় কর্মসূচিতে নেই অনেকে, অথচ তাঁরা দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবিতে বহাল আছেন। স্থানীয় শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের মধ্যে যাঁরা সরকারের বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করছেন এমন নেতৃবৃন্দ যদি দলের কর্মসূচিতে না থাকেন এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। ’
সুজন আরো বলেন, ‘দলীয় কর্মসূচিতে না থাকায় এবং ওয়ার্ড, থানা ও ইউনিটে সম্মেলন না হওয়ার কারণে তৃণমূলে সাংগঠনিক স্থবিরতা বিরাজ করছে। ’
মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘আমি সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব থাকাকালীন (সোয়া তিন বছর আগে) প্রায় অর্ধেক ওয়ার্ডের সম্মেলন হয়েছিল। আমরা বিভিন্ন কারণে অর্ধেক ওয়ার্ডের সম্মেলন করতে পারিনি। যেসব ওয়ার্ড, থানা ও ইউনিটে সম্মেলন হয়নি সেখানে সম্মেলনের জন্য গত তিন বছরেও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত বিরোধ মিটিয়ে এবং তৃণমূল পর্যায়ে সম্মেলন শেষ করে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা না গেলে আগামী নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে। ’
কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল মনছুর বলেন, ‘মহানগর আওয়ামী লীগ নির্দেশনা দিলে আমরা সম্মেলন করতে পারব। আমাদের থানাধীন কয়েকটি ওয়ার্ডের সম্মেলন হচ্ছে না অনেক দিন ধরে। শোনা যাচ্ছে, কিছুদিনের মধ্যে সম্মেলন হবে। ’
ডবলমুরিং থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও নগর শাখার শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক মাহবুবুল হক মিয়া বলেন, ‘২০০৪ সালে আমাদের আহ্বায়ক কমিটি হয়েছিল। সম্মেলন শুধু এ থানায় নয়, অধিকাংশ থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটে হয়নি। ’
ফিরিঙ্গীবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল হোসেন বাচ্চু বলেন, ‘২০০৩ সালে আমাদের কমিটি হয়েছিল। আমরাও চাই সংগঠনকে ঢেলে সাজিয়ে নতুন নেতৃত্ব আসুক। মহানগর আওয়ামী লীগের এখতিয়ার সম্মেলন করার বিষয়টি। ’
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম সফরকালে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক বর্তমান সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনকে কাদা ছোড়াছুড়ি না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের একপর্যায়ে ওবায়দুল কাদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ) মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের মোবাইল ফোনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি হানিফ ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীমকে চট্টগ্রামে এসে সাংগঠনিক বিভিন্ন সমস্য সমাধানের নির্দেশনা দেন।


মন্তব্য