kalerkantho


প্রধান বিচারপতি বললেন

ত্রুটিপূর্ণ তদন্তে অনেক আসামি খালাস পেয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ত্রুটিপূর্ণ তদন্তে অনেক আসামি খালাস পেয়েছে

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, ‘তদন্ত সংস্থায় যাঁরা আছেন তাঁরা ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত করেন। পাশাপাশি প্রসিকিউশনেরও মারাত্মক ত্রুটি থাকে।

ইতিমধ্যেই বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর মামলায় আমরা বাধ্য হয়ে খালাস দিয়েছি। এটা আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। ’ সরস্বতী পূজা উপলক্ষে গতকাল বুধবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।  

প্রধান বিচারপতি বলেন, বাদীপক্ষের ১০-১৫ জন সাক্ষীর সংখ্যা উল্লেখ করে মামলা প্রমাণ করেছে বললেই একটা রায় হয় না। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সাক্ষ্য পর্যালোচনা করতে হয়, ব্যাখ্যা দিতে হয়। সাক্ষ্যের সঙ্গে আইনের সম্পৃক্ততার প্রয়োজন হয়। আসামি অপরাধ করেছে কি না সেটা দেখতে হয়।

গতকাল আইনজীবী সমিতি ভবন মিলনায়তনে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া প্রধান বিচারপতির সহধর্মিণী, নাতনিসহ কয়েকজন স্বজন উপস্থিত ছিলেন। প্রধান বিচারপতির জন্মদিনও ছিল গতকাল। ৬৭ বছরে পা রাখলেন তিনি।  

বিচারকদের এখনই প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার : প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘কত ধারায় সাজা দিতে হয়, কত ধারায় অপরাধ করলে কী ধরনের সাক্ষ্য দরকার, এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। আইনের ব্যাখ্যাগুলোও অনেক ত্রুটিপূর্ণ। এটা আমাকে যথেষ্ট ভাবিয়ে তুলেছে। আপিল বিভাগে আমাদের সিনিয়র কয়েকজন বিচারক আছেন, আমরা প্রায়ই আলোচনা করি। বিচারকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। এ জন্য এটাই সঠিক সময়। আমি বলি, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (প্রসিকিউশন) ও তদন্ত সংস্থার সদস্যদের প্রশিক্ষণ দরকার। এটা না হলে ত্রুটিগুলো থেকে যাবে। আমরা আপিল বিভাগে যেহেতু চূড়ান্ত রায় দিই, ল সেটল করে দিই, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দুর্বলতার বিষয়ে আমরা যদি সামান্যতম একটা শব্দও ব্যবহার করি, সে শব্দের জন্য তাদের পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। ’

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ অনেক মামলায় পর্যাপ্ত সাক্ষী পাওয়া যায় না। বিশেষ করে গুপ্তহত্যা সংক্রান্ত মামলায়। এসব মামলায় পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের প্রয়োজন হয়, এটা সংশ্লিষ্টরা সঠিকভাবে জানে না। এই পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য একটার সঙ্গে আরেকটা জোড়া লাগানো, মালার মতো থাকতে হবে। এটা তারা বোঝে না। আশা রাখব, যাঁরা সংশ্লিষ্ট আছেন তাঁরা আমার এ বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখবেন। ’

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মুফতি হান্নানের মামলার রায় পুলিশ প্রশাসনের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। এ মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে ত্রুটি ছিল, হাইকোর্টের রায়ে ত্রুটি ছিল। সংশোধিত করে আমরা  রায় দিয়েছি। এমনকি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়েও ত্রুটি ছিল। হাইকোর্টেও ত্রুটি ছিল, আমরা এটা সংশোধন করে দিয়েছি। বিশেষ করে ষড়যন্ত্রমূলক মামলায়, কী ধরনের সাক্ষ্য দিতে হয় পুলিশ তা একেবারে জানে না, প্রসিকিউশনে যারা পরিচালনা করে তারাও জানে না। এ জন্য হাইকোর্টের বিচারকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। না হলে আমাদের জেনারেশনে সাংঘাতিক গ্যাপ হয়ে যাবে। ’

বাংলায় রায় : হাইকোর্টে বেশ কিছু বিচারক বাংলায় রায় দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, ‘আমেরিকায় সুপ্রিম কোর্ট সারা বছরে ১১০টা মামলা পরিচালনা করে। আমাদের এখানে দিনে ৮০-৯০টা মামলা পেশ করা হয়। আমেরিকার সঙ্গে আমাদের বিবেচনা করলে চলবে না। আমাদের খুব তাড়াতাড়ি মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা একটা ব্যবস্থা বের করার চিন্তা করছি। বাংলায় আমরা ডিক্টেশন দেব ওপেন কোর্টে, সেটা রেকর্ডিং হয়ে অটোমেটিকলি প্রিন্ট হয়ে বের হয়ে আসবে। আইটি সেক্টরে বলে দিয়েছি, এই ডিভাইসটা যদি বের করতে পারি তাহলে আমরা বাংলায় রায় দিতে পারব। ’

প্রধান বচািরপতি বলেন, ‘আমাদের আইনের উন্নয়ন করতে হবে। এ জন্য আইনজীবীদের এগিয়ে আসতে হবে। আইনের ব্যাখ্যা সঠিকভাবে দিতে জানতে হবে। আমাদের আইনজীবীদের, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এ জন্য এগিয়ে আসতে হবে। ’

রায় পর্যালোচনা করা উচিত পুলিশ প্রশাসনের : প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আছি। আমাদের অনেক কিছু বিবেচনা করতে হয়। আমি পুলিশ প্রশাসনকে বলেছি, আপনাদের অনেক ত্রুটি আছে। আমরা সর্বশেষ যে সিদ্ধান্তগুলো দিচ্ছি সেগুলো বিবেচনা করা উচিত। আইনের যে ব্যাখ্যা আমরা দিচ্ছি এগুলো পর্যালোচনা করা উচিত। ’

মিডিয়াকে আরো অবদান রাখতে হবে : কিছু মিডিয়া খুব ভালো কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধান বচািরপতি বলেন, দেশের উন্নয়নের সঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে যথেষ্ট সহযোগিতা করছে মিডিয়া। মূল্যবান অবদান রাখছে তারা। তবে এটা পর্যাপ্ত নয়। আরো অবদান রাখতে হবে।

পরীক্ষা দিচ্ছে সেই কিশোররা : প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে গিয়ে দেখলাম, সেখানে আটক ২৭টি ছেলে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। তারা যাতে পরীক্ষা দিতে পারে সে জন্য সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থা নিতে বলি। সকালে খবর পেলাম ওরা সবাই পরীক্ষা দিচ্ছে। এদের মধ্যে একটা ছেলের বিরুদ্ধে একটু গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ছিল, তাকেও আমরা জামিনে দিয়ে দিয়েছি। এরা তো কিশোর। কোনটি অপরাধ আর কোনটি অপরাধ না, সেটা ভালো করে কিছুই জানে না। এদের বাধ্য করা হয়েছে মাত্র। ’

জন্মদিন পালিত : প্রধান বিচারপতি ১৯৫১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার তিলকপুরে জন্মগ্রহণ করেন। গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্টে নিজ দপ্তরে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে জন্মদিনের কেক কাটেন। এ সময় তাঁর সহধর্মিণী, মেয়ে, নাতনিসহ কয়েকজন আত্মীয় উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার আবু সৈয়দ দিলজার হোসেন, হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (প্রশাসন ও বিচার) মো. সাব্বির ফয়েজসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


মন্তব্য