kalerkantho


যাত্রাবাড়ীতে জঙ্গি আস্তানায় র‌্যাবের অভিযান

জেএমবির আইটি শাখার প্রধানসহ গ্রেপ্তার ৪

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



জেএমবির আইটি শাখার প্রধানসহ গ্রেপ্তার ৪

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে একটি বাসায় অভিযান চালিয়েছেন র‌্যাব সদস্যরা। র‌্যাব দাবি করেছে, অভিযানে জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের আইটি শাখার প্রধান মোহাম্মদ আশফাক-ই আজম ওরফে আপেলসহ চার জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে তারা। গ্রেপ্তারকৃত অন্যরা হলো—মাহবুবুর রহমান ওরফে রমি, শাহিনুজ্জামান ওরফে শাওন ও আশরাফ আলী। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, চারটি ম্যাগাজিন, ২১ রাউন্ড গুলি, সাতটি ছুরি, আড়াই কেজি বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক, পাঁচটি পাওয়ার জেল, সাতটি মোবাইল ফোনসেট, তিনটি ইলেকট্রিক ডেটোনেটর, দুটি সার্কিট ব্রেকার, ছয় প্যাকেট বিয়ারিং বল এবং বোমা তৈরির অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। গতকাল বুধবার ভোরে তাদের গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১০-এর একটি টিম। র‌্যাব সদস্যরা জানিয়েছেন, আটক জঙ্গিরা গত ২৩ জানুয়ারি নির্মাণ শ্রমিক পরিচয় দিয়ে সাত হাজার টাকায় বাসাটি ভাড়া নিয়েছিল।

গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে জানান, সারোয়ার-তামিম গ্রুপের কয়েক সদস্য এর আগে গ্রেপ্তার হয়েছিল। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকেই তাদের নাম বেরিয়ে আসে। তা ছাড়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এদের ওপর নজরদারি চলছিল। দনিয়ার কবিরাজবাগ এলাকার ২৫১ নম্বর বাসায় এরা অবস্থান করছে—এমন তথ্য নিশ্চিত হয়ে বুধবার ভোরে ওই বাড়ির মালিককে সঙ্গে নিয়ে অভিযান চালানো হয়। এ সময় তাদের দরজা খুলতে বললেও তারা দরজা খোলেনি। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পিস্তল-গুলিসহ নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পঞ্চম তলার বাড়িটির দ্বিতীয় তলার দুটি রুম এদের দুইজন ভাড়া নিয়েছিল। কিন্তু সেখানে তারা চারজন অবস্থান করত, যা বাড়ির মালিকও জানতেন না।

বাড়ির ভাড়াটিয়া ফারুকের স্ত্রী কমলা বেগম কালের কণ্ঠকে জানান, ভোররাতে কয়েকজন লোক গেট খুলতে বলে। এ সময় তিনি উঁকি দিয়ে দেখেন, সেখানে অনেক র‌্যাব সদস্য। র‌্যাব সদস্যরা তাঁকে গেট খুলতে বললে তিনি তাঁর কাছে চাবি নেই বলে জানান। তিনি তিন তলায় বাড়ির মালিকের বাসা থেকে চাবি আনতে যান। কিন্তু তাঁর আসতে দেরি দেখে র‌্যাব গেট কেটে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা প্রথমে মালিকের বাসায় গিয়ে মালিকের স্ত্রী শাহীনুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দরজা খুলতে বলে। কিন্তু ভেতর থেকে দরজা না খোলায় র‌্যাব দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে এবং আগ্নেয়াস্ত্রসহ জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করে। তিনি আরো জানান, গত মাসের ২৩ তারিখ দুই যুবক নিজেদের নির্মাণ শ্রমিক পরিচয় দিয়ে সাত হাজার টাকায় দ্বিতীয় তলার দুই রুম ভাড়া নেয়। তারা সকালে ব্যাগ নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যেত। আর রাত ৮-৯টার দিকে বাসায় ফিরত। বাড়ির কোনো ভাড়াটিয়ার সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।

গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে র‌্যাব নিশ্চিত হয়, সারোয়ার-তামিম গ্রুপের আইটি শাখার প্রধান হিসেবে গ্রেপ্তারকৃত আশফাক দায়িত্ব পালন করে আসছিল। সে ধানমণ্ডির ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক থেকে ২০১২ সালে বিএসসি ইন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে। পরে গুলশান, উত্তরা ও মোহাম্মদপুরে বিভিন্ন আইটি ফার্মে প্রোগ্রামার হিসেবে কাজ করেছে। ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় তার ধর্মীয় বিষয়ের ওপর আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ২০১১ সালে রংপুরের হাড়াগাছায় একটি মাহফিলে কামাল ও সাকিব মাস্টারের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং তাদের মাধ্যমে সে জেএমবিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। আশফাক চট্টগ্রামে অস্ত্র চালানোর ওপর প্রশিক্ষণ শেষে আইটি সেক্টরে কাজ শুরু করে। তখন থেকেই তার সঙ্গে মানিক নামে অন্য এক জেএমবি সদস্যের সখ্য গড়ে ওঠে। সেই মানিকই হচ্ছে সারোয়ার জাহান। সারোয়ার-তামিম গ্রুপের আত্মপ্রকাশের পর সারোয়ার তাকে মোস্তাফিজুর রহমান সিফাত গ্রুপের সঙ্গে আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করতে বলে। পরে সিফাত গ্রেপ্তার হলে আশফাককে আইটি শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে সে জেএমবির ওপরের সারির নেতাদের সিওর স্পট, থ্রিমা ও টেলিগ্রাম অ্যাপসের মাধ্যমে মেসেজ আদান-প্রদানে প্রশিক্ষণ দিত। পাশাপাশি সে জেএমবির জন্য ফান্ড সংগ্রহ করত। এর আগে সে তিন লাখ টাকা সংগ্রহ করে জমা দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১৫ সালে বগুড়ায় কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরি করাকালে আশফাকের সঙ্গে পরিচয় হয় মাহবুবুর রহমানের। মাহবুব বগুড়া অঞ্চলে জেএমবির গোপন পার্সেলগুলো পৌঁছে দিত। আশফাকের হাত ধরেই মাহবুব অন্তর্ভুক্ত হয় সারোয়ার-তামিম গ্রুপে। গত বছর চাকরি ছেড়ে চট্টগ্রামে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেয় সে। ধৃত শাহিনুজ্জামান ২০১৪ সালে মাহমুদুল ইসলামের মাধ্যমে জেএমবিতে যোগদান করে। মাহমুদুল ইসলাম জেএমবির দক্ষিণ অঞ্চলের আমির ছিল। তার তত্ত্বাবধানে পাঁচ-ছয়জন মিরপুরে প্রশিক্ষণ নেয়। সেখানে তারা আকিদাগত শিক্ষার পাশাপাশি জিহাদ, ইমান, শারীরিক ব্যায়াম শিখত। সেও চট্টগ্রামে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেয়। আরেক সদস্য আশরাফ আলীও স্থানীয় এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে জেএমবিতে যুক্ত হয়।

র‌্যাব সূত্র জানায়, অভিযানের সময় বাড়ির মালিকের স্ত্রী শাহীনুর রহমান ও নিচতলার ভাড়াটিয়া ফারুককে আটক করা হয়। তবে পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানা যায়।


মন্তব্য