kalerkantho


ইসি গঠন

‘আরো নাম যোগ হতে পারে’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘আরো নাম যোগ হতে পারে’

নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের লক্ষ্যে গঠিত সার্চ কমিটির চূড়ান্ত তালিকা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবিত নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এসব নামের বাইরেও কমিটি তাদের নিজস্ব অনুসন্ধান থেকে নতুন নাম যোগ করতে পারে। গতকাল বুধবার চার বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে সার্চ কমিটির বৈঠকের পর এমন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবদুল ওয়াদুদ ভুইয়া। আর বিশিষ্ট ব্যক্তিরা দলনিরপেক্ষ, বিবেকবান, দক্ষ, সাহসী, প্রজ্ঞাবান এবং কোনো চাপে মাথা নত করবেন না—এমন লোকদের নির্বাচন কমিশনার হিসেবে সুপারিশ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, যাচাই-বাছাই শেষে রাষ্ট্রপতির কাছে সার্চ কমিটির সুপারিশ করা নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। তাঁরা আশা করছেন, কমিটির সুপারিশ করা নামের বাইরে যাবেন না রাষ্ট্রপতি।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সাংবাদিকদের আরো জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার (আজ) বিকেল ৪টায় সার্চ কমিটির সদস্যরা আবার বৈঠক করবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে প্রাপ্ত নামগুলোর ব্যাপারে তাঁরা তথ্য সংগ্রহ করবেন ও পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। কমিটি যে ২০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা করেছে সেই প্রাথমিক তালিকায় আরো নাম সংযোজন বা বিয়োজন হতে পারে। কমিটি আশা করছে, ৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তারা একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

গতকাল সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে চার বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে বৈঠক করেন সার্চ কমিটির সদস্যরা। সকাল ১১টায় শুরু হয়ে বৈঠক চলে প্রায় দেড় ঘণ্টা। সার্চ কমিটির আমন্ত্রণে বৈঠকে যোগ দেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) মোহাম্মদ আবু হেনা, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সার্চ কমিটির ছয় সদস্যের সবাই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। গত ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে সার্চ কমিটি গঠনের পর গতকাল ছিল তাঁদের চতুর্থ বৈঠক। আর এ নিয়ে দ্বিতীয় দফায় তাঁরা বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে বসলেন।  

বৈঠক শেষে আবদুল ওয়াদুদ ভুইয়া আরো বলেন, বিশিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন সার্চ কমিটি যেসব নাম সুপারিশ করবে তাঁরা যেন প্রায় একই যোগ্যতা, মেধা ও দক্ষতাসম্পন্ন হন। সুপারিশ প্রণয়নকালে কমিটি তাদের পরামর্শ বিবেচনায় নেবেন বলে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আশ্বাস দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো চাপে মাথা নত করবেন না—এমন লোক নির্বাচন কমিশনে দেখতে চান বলে বিশিষ্ট চার নাগরিক সার্চ কমিটিকে জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, “প্রধান নির্বাচন কমিশনার একটি প্রতীক। তাঁকে সৎ, যোগ্য, সাহসী ও শক্ত মেরুদণ্ডের এবং দলনিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে দেখতে চাই। তিনি হবেন ‘একরোখা’ বা ‘ঘাড় ত্যাড়া’ লোক। সার্চ কমিটি যাঁদের নাম প্রস্তাব করবে তাঁদের মধ্য থেকেই যেন সিইসি ও অন্য কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়। ”

বৈঠকের পর সাবেক সিইসি আবু হেনা বলেন, ‘কেমন সিইসি ও কমিশনার নিয়োগ দেওয়া দরকার আমরা সেই পরামর্শ দিয়েছি। আমরা এ ব্যাপারে সবাই একমত যে নির্বাচন কমিশনে যাঁরা নেতৃত্ব দেবেন তাঁদের দলনিরপেক্ষ, বিবেকবান, দক্ষ, সাহসী, প্রজ্ঞাবান ও পরিশ্রমী হওয়া দরকার। দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার সাংবিধানিক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তাই নির্বাচন কমিশনে এমন লোক নিয়োগ দিতে হবে যিনি বা যাঁরা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারবেন। এ লক্ষ্যে সার্চ কমিটি সুধীসমাজের নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। এটা একটা শুভ লক্ষণ। সার্চ কমিটির এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত। ’

সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, এই সার্চ কমিটি নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে। আমরা চাই, অসামপ্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সামান্যতম ভিন্নমত থাকে এমন লোককে যেন নিয়োগের সুপারিশ করা না হয়। রাষ্ট্রপতি যে সার্চ কমিটি করেছেন, সেটা অবশ্যই যোগ্য । আমরা এও মনে করি, এ কমিটি যে ১০টি নাম পাঠাবে, তাঁরা যোগ্য হবেন এবং রাষ্ট্রপতি সেখান থেকে পাঁচজনকে নিয়োগ দেবেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো কে সিইসি হবেন। কারণ সিইসি হলেন প্রতীক। তিনি যদি একটু নরম মনের হন তাহলে কমিশন জিরো হয়ে যাবে। উদাহরণ হিসেবে ভারতের নির্বাচন কমিশনের কথা বলেছি। সেখানের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন টি এন সেশন, যিনি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ নির্বাচন করার স্বার্থে কারো কথা শোনেননি। তাঁর মতো শক্ত মেরুদণ্ডওয়ালা সিইসি হতে হবে। তিনি কোনো হুমকি ও ভয়ভীতিকে পরোয়া করবেন না। আর বয়স অবশ্যই সত্তরের ভেতরে থাকতে হবে। ’

 

ইসি গঠনে আইন প্রণয়ন সম্পর্কে গোলাম সারওয়ার বলেন, পৃথিবী এগিয়ে গেছে। কানাডাসহ পৃথিবীর ২০টি দেশে নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়টি সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত। তাই বাংলাদেশেও আলাদা আইন নয়, নির্বাচনী বিধিবিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশিষ্ট নাগরিকরা যে মতামত দিয়েছেন সেগুলো যেন সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ আকারে পাঠিয়ে দেয়।

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব অনেক বড়। একটি দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সে দেশের নির্বাচন কমিশনের ওপর। এ কারণে আমরা সৎ, যোগ্য, নিষ্ঠাবান, সাহসী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিকে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের সুপারিশ করার জন্য মতামত দিয়েছি। এমন লোক চাই যিনি কোনো চাপে মাথা নত করবেন না। ’

গতবারও তো সার্চ কমিটির দেওয়া নামের ভেতর থেকেই ইসি গঠন করা হয়েছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে মাহফুজ আনাম বলেন, এটা সার্চ কমিটির বিষয় নয়। সার্চ কমিটি যোগ্যদের দিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর যদি তিনি নিরাশ করেন বা প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারেন, তবে সেটা তো সার্চ কমিটির দোষ নয়। মূলত নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির কর্মদক্ষতার ওপর সব কিছু নির্ভর করে। আলটিমেটলি পারফরম্যান্সটা তো একটা ব্যক্তির ব্যাপার। এখন উনি নির্বাচিত হওয়ার পর না পারলে তো সার্চ কমিটির কিছু করার নেই।

সার্চ কমিটি যাঁদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে তাঁদের নাম প্রকাশ করা উচিত কি না—এ  প্রশ্নের জবাবে ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, ‘গতবারও প্রকাশ করা হয়েছে। আলোচনায় এ বিষয়টি এসেছে। আমরা বলেছি, এবারও নাম প্রকাশ করা উচিত। আশা করব, গতবারের মতো এবারও তা প্রকাশ করা হবে। ’

ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘১৯৯৬ সালে আবু হেনা সাহেব, ২০০১ সালে আবু সাঈদ সাহেব ও ২০০৮ সালে এ টি এম শামসুল হুদা সাহেব সিইসি হিসেবে যে নির্বাচন করেছেন সেগুলো দৃষ্টান্তমূলক নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু আগামীতে যে সিইসি হবেন তাঁর সঙ্গে উনাদের একটা তফাত আছে। উনারা করেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। তাঁদের সাফল্যের এটি একটি কারণ। কিন্তু এবার করতে হবে একটি রাজনৈতিক সরকারের অধীনে। রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন করাটাই নতুন ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকতে পারে। তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া বা গুরুত্ব না দেওয়া একটা বিরাট জিনিস। এ চ্যালেঞ্জের মধ্যেই তাঁদের নির্বাচন করতে হবে। তবে আশা করি, বর্তমান সরকার সে রকম কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। একটি ভালো নির্বাচনের জন্য মূল দায়িত্ব একজন সিইসির ওপর নির্ভর করে। আমরা বলেছি যে সার্চ কমিটি যে নাম সুপারিশ করবে তার ভেতর থেকেই সিইসি বা অপরাপর নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। এর বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না। সেটা হলে সার্চ কমিটির আর প্রয়োজনীয়তা থাকবে না। আমি বিশ্বাস করি, সার্চ কমিটির বাইরে প্রধানমন্ত্রী কোনো নাম দেবেন না। এ ব্যাপারে আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে। ’


মন্তব্য