kalerkantho


ক্যাম্প পরিদর্শনে বার্নিকাট

রোহিঙ্গাদের শিকড় মিয়ানমারে, সেই দেশেই সমাধান

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার ও টেকনাফ প্রতিনিধি   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গাদের শিকড় মিয়ানমারে, সেই দেশেই সমাধান

রোহিঙ্গাদের সমস্যার সমাধান মিয়ানমারের হাতে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট। তিনি বলেছেন, ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকেই এসেছে বাংলাদেশে। রোহিঙ্গাদের শিকড় মিয়ানমারে। তাই তাদের সমস্যার সমাধানও মিয়ানমারে। ’

গতকাল মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফে লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন বার্নিকাট।

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বলেন, মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে তাঁর দেশ কাজ করবে।

বার্নিকাট বলেন, রোহিঙ্গাদের দেখতে তিনি এ নিয়ে দুই বার কক্সবাজারে এসেছেন। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের খোঁজখবর নিয়েছেন তিনি।

রাষ্ট্রদূত বলেন, মিয়ানমারের চলমান ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও উদ্বিগ্ন। তাই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ শুরু থেকেই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। বাংলাদেশি জনগণও আন্তরিকভাবে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সহাবস্থান করছে, যা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।

তবে সীমান্ত অরক্ষিত থাকলে অনুপ্রবেশ ঠেকানো অসম্ভব হয়ে উঠবে। এমনকি দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক টানাপড়েনে পড়তে পারে, যা রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে বলে রাষ্ট্রদূত মনে করেন।

মার্শা বার্নিকাট আরো বলেন, কফি আনান কমিশনের সদস্যরা মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং সমস্যা সমাধানে উপায় খুঁজতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

আনান কমিশন সদস্য ও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এক দিন আগে-পরে কক্সবাজার সফরের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না জানতে চাইলে বার্নিকাট বলেন, কাকতালীয়ভাবে সফর হয়েছে। তবে সবাই বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখতে এসেছে এবং তাদের সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন।

সকালে মার্কিন রাষ্টদূত মার্শা বার্নিকাট লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যান। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) পরিচালিত হাসপাতাল, এনজিও ফোরাম পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন তিনি। এ ছাড়া লেদা বি-ব্লকের একটি মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম দেখেন এবং শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলেন রাষ্ট্রদূত।

লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ‘আম্মর বিন ইয়াসের’  মাদ্রাসার শিক্ষক মৌলভী সুলতান বলেন, এখানে রোহিঙ্গাদের জীবনমান দেখে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মর্মাহত হয়েছেন। জীবনমান উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র সরকার যথাসম্ভব কাজ করে যাবে বলে তিনি জানিয়েছেন। লেদা রোহিঙ্গা বস্তির চেয়ারম্যান ডা. দুদু মিয়া মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তায় দ্রুত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূতের কাছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের পাশাপাশি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধানের কথা জানান বস্তির চেয়ারম্যান।

এরপর দুপুরে লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিও ফোরাম কার্যালয়ে মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন বার্নিকাট। সে দেশের রাখাইন রাজ্যের রাইম্যাবিলের শাকের আহমদ, বড় গওজিবিলের মো. আয়াছের স্ত্রী চেহের বিবি, নুরুল আলম, রশিদ আহমদসহ কয়েকজনের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের কথা হয়।

এ সময় চেহের বিবি জানান, সাম্প্রতিক ঘটনায় তাঁদের সামনে ১২ বছরের ননদ মোকারমাকে মিয়ানমার সেনা সদস্যরা ধর্ষণ করে হত্যা করেছে। স্বামী মো. আয়াছ ও শ্বশুর রশিদ আহমদকে বেধড়ক পিটিয়েছে এবং ধরে নিয়ে গেছে। এরপর তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিনি চার সন্তান নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন।

মিয়ানমারে সেনা বর্বরতার প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা নুরুল আলম বলেন, তাঁর সামনে পরিবারের প্রায় ১২ জন নারীকে বিবস্ত্র করে দাঁড় করিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। বাবা হয়ে সন্তানের ওপর এ ধরনের বর্বরতার সাক্ষী হওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো ছিল।

পরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত টেকনাফ নয়াপাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং কার্যক্রম দেখেন।

ক্যাম্পটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব) মো. সাইফুল ইসলাম ক্যাম্পের সার্বিক কার্যক্রম তুলে ধরেন। এ সময় শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার এস এম রেজোয়ান হোসেন, টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সফিউল আলম, বাংলাদেশে আইওএমের লিয়াজোঁ অফিসার পেপে সিদ্দিকী, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর, এনজিও ফোরামসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বার্নিকাট নয়াপাড়া শিবির পরিদর্শনকালে মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর নির্যাতন বন্ধের দাবিসহ বিভিন্ন দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে সেখানকার রোহিঙ্গারা।

নয়াপাড়া শরণার্থী শিবির ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. জোবায়ের বলেন, নাগরিকত্ব ও শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে।

গত সোমবার কক্সবাজারে দুই দিনের সফরে আসেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট। তাঁর সঙ্গে আট সদস্য রয়েছেন। সোমবার কক্সবাজার পৌঁছে বিকেল ৫টায় তিনি জেলা প্রশাসন ও শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আলোচনা হয়।


মন্তব্য