kalerkantho


ঢাকায় আনান কমিশনের উপলব্ধি

মিয়ানমারে নাগরিকত্বেই সমস্যার সমাধান

কূটনৈতিক ও নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মিয়ানমারে নাগরিকত্বেই সমস্যার সমাধান

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সেখানে তাদের নাগরিকত্ব ও সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন সফররত আনান কমিশনের সদস্য ড. গাসান সালামে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা জানান।

ড. গাসান সালামের কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল—রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিকত্ব দিলে সেখানে সমস্যা দূর হবে বলে কমিশন বিশ্বাস করে কি? এর জবাবে ড. গাসান সালামে বলেন, ‘হ্যাঁ। পরিস্থিতি উন্নতির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ’

তাঁর মতে, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে রাখাইন মিয়ানমারের মধ্যে স্বল্পোন্নত অঞ্চল। ড. গাসান সালামে বলেন, ‘আমার মনে হয়, মিয়ানমারে সবার জন্য মৌলিক মানবাধিকার ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপক  সুযোগ আছে। ’

গাসান সালামে বলেন, কেবল ধর্মীয় কারণে রোহিঙ্গারা তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে এমনটি তিনি মনে করেন না। তিনি বলেন, ‘এটি ধর্মযুদ্ধ নয়। এখানে আরো বিষয়ও আছে। ’ তাঁর মতে, সেখানে জনগণ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত। নৃগোষ্ঠী, চলাফেরার স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের মতো বিষয়ও সেখানে আছে।

বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক, বিআইআইএসএস চেয়ারম্যান মুনশি ফয়েজ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, রিজিওনাল সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আরসিএসএস) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদউজজামান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের (বিলিয়া) পরিচালক ড. শাহদীন মালিক, ব্রতীর নির্বাহী পরিচালক শারমিন মুরশিদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত আশফাকুর রহমান, মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা, মেজর জেনারেল (অব.) শাহেদুল হক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী খালেকুজ্জামান, ডেইলি স্টারের সহযোগী সম্পাদক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহেদুল আনাম খান, ডেইলি অবজারভারের সহযোগী সম্পাদক সৈয়দ বদরুল আহসান, স্বতন্ত্র পরামর্শক আসিফ মুনির উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকের পর অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, কমিশনের প্রতিবেদন মিয়ানমারে কী এবং কত দ্রুত প্রভাব ফেলে তা দেখা প্রয়োজন। মিয়ানমার সরকার এ পর্যন্ত কমিশনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে আসছে।

উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি উন্নয়নে দেশটির স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চির গড়া ৯ সদস্যের ওই পরামর্শক কমিশনের নেতৃত্বে আছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। এ কারণে কমিশনটি ‘আনান কমিশন’ নামেও পরিচিত। ওই কমিশনের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল তাদের চার দিনের সফর শেষে আজ বুধবার বাংলাদেশ ছাড়বে। বাংলাদেশ সফরে ওই কমিশনের নেতৃত্ব দেওয়া ড. গাসান সালামে লেবাননের নাগরিক। তিনি ছাড়াও বাংলাদেশ সফররত আনান কমিশনের অন্য দুই সদস্য হলেন মিয়ানমারের উইন ম্রা ও আই লুইন। কমিশনের চেয়ারম্যান কফি আনানের দপ্তরের পরিচালক আন্দ্রে ইন্দ্রেগার্দও তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন। এর আগে গত রবি ও সোমবার তাঁরা কক্সবাজারে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।

এর আগে গতকাল সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করেন আনান কমিশনের সদস্যরা। বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে বৈঠক করেন তাঁরা। বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা কয়েক যুগ ধরে এ সমস্যায় আছি। রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের মাইলের পর মাইল বন শেষ হয়ে গেছে। আমাদের সামাজিক জীবন নষ্ট হচ্ছে। তাদের নিয়ে সব সময় উদ্বিগ্ন থাকতে হয় আমাদের। ’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা এ দেশে ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সাল এবং সাম্প্রতিক সময়ে বড় পরিসরে অবৈধ অনুপ্রবেশ করেছে। অনুপ্রবেশ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরার পাশাপাশি তাদের কারণে এ দেশে সৃষ্ট সমস্যাও কমিশনকে জানানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাঁরা (কমিশনের সদস্যরা) বলেছেন, রোহিঙ্গারা বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ করেছে। আমরা বলেছি, “আমরা সন্ত্রাসীদের এক ইঞ্চি জায়গাও দিই না। প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’। সেটাও আমরা জানিয়ে দিয়েছি। যারা (রোহিঙ্গারা) এখানে এসেছে তারা জীবনটা নিয়ে কোনো মতে এসেছে। তাদের অধিকাংশ আহত অবস্থায় এ দেশে এসেছে। এখানে আসা ৮০ শতাংশ নারী তাদের দেশে ধর্ষিত হয়েছে। আমরা বলেছি, তোমরা একটা প্রচেষ্টা নাও যাতে এরা ফেরত যেতে পারে। এতে আমরাও পরিত্রাণ পেতে পারি। ”

পরে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমার সরকার এখানে আসেনি। কমিশন এসেছে। তারা বলেছে চেষ্টা করবে। তারা প্রতিবেদন দেবে। তারা আন্তর্জাতিক ও স্থানীয়ভাবে কাজ করবে। ’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ‘মিয়ানমারের সঙ্গে যে সম্পর্ক আছে তা কাজে লাগিয়ে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। ’

আরেক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যেটা বলেছি তাঁরা এর বাইরে অন্য কিছু বলেননি। তাঁর মানে আমরা যেটা বলেছি সেটা তারা স্বীকার করে নিয়েছেন। ’

কত দিনের মধ্যে সমস্যার সমাধান হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা বলা যচ্ছে না। ’

রোহিঙ্গাদের ঠ্যাঙ্গার চরে পাঠানো হচ্ছে : মিয়ানমারের নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পর্যায়ক্রমে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ঠ্যাঙ্গার চরে স্থানান্তরে সহায়তা করার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ২৬ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ম্যাজিস্ট্রেসি পরিবীক্ষণ অধিশাখা থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের মংডু এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে সৃষ্ট অস্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে ৬৫ হাজার রাখাইন মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত নাগরিক বিধিবহির্ভূতভাবে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ-উখিয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। মিয়ানমারের ওই নাগরিকরা কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষত টেকনাফ ও উখিয়ার নয়াপাড়া, লেদা ও কুতুপালংয়ের নিবন্ধিত ক্যাম্পে শরণার্থী হিসেবে অবস্থান করছে। এদের মধ্য থেকে কিছুসংখ্যক শরণার্থী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশের মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এ ছাড়া ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময় মিয়ানমারের অগণিত নাগরিক অবৈধভাবে প্রবেশ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে মর্মে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।


মন্তব্য