kalerkantho


বন্দরে বন্দরে পদে পদে ব্যবসায়ীদের হয়রানি

ফারজানা লাবনী   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বন্দরে বন্দরে পদে পদে ব্যবসায়ীদের হয়রানি

নারায়ণগঞ্জের অটোমেশন নিট ওয়্যার লিমিটেড ২০১৬ সালের এপ্রিলে ফ্রান্সের এক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এক লাখ ছয় হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানির আদেশ পায়। মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ করে সব প্রস্তুতি শেষে পণ্য তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। যথাসময়ে ফ্রান্সের লি হাভরি বন্দরের উদ্দেশে কনটেইনারে করে জাহাজে পণ্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরই মধ্যে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ফ্রান্সের ওই ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের লেনদেনসহ সব কার্যক্রম জরুরিভাবে বন্ধ করে দেয় ফ্রান্স সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পণ্যবোঝাই জাহাজ লি হাভরি বন্দরে পৌঁছতে এক দিন বাকি থাকতে এ খবর জানতে পারে অটোমেশন নিট ওয়্যার লিমিটেড কর্তৃপক্ষ। রপ্তানিকৃত পণ্য নিয়ে জাহাজটি বাধ্য হয়ে ফিরিয়ে আনতে হয় বাংলাদেশে। পণ্য বিক্রি করতে না পারায় বড় ধরনের লোকসানে পড়ে রপ্তানিকারক বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে পণ্য ফেরত আনায় জাহাজ কর্তৃপক্ষকে বাড়তি বিল পরিশোধ করতে হয়।

এখানেই শেষ নয়। আরো বড় বিপত্তি অপেক্ষা করছিল প্রতিষ্ঠানটির জন্য। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে পণ্য পৌঁছার পর শুল্ক আইন ১৯৬৯-এর ২২ ধারা অনুসারে তৈরিকৃত পণ্য দেশে প্রবেশে ১৪৩ শতাংশ রাজস্ব পরিশোধ করে সেগুলো ছাড়িয়ে নেওয়ার আদেশ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে অটোমেশন নিট ওয়্যার লিমিটেড কর্তৃপক্ষের। চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় পুরো বিষয়টি। কিন্তু ‘আইনের বাইরে কিছুই করার নেই’—এমন  কথা স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়। সমস্যা সমাধানে ব্যবসায়ী নেতাদের দুই-একজনকে নিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমানের কাছে যায় অটোমেশন কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি বিবেচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান বিনাশুল্কে পণ্য ছাড়িয়ে আনার অনুমতি চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখেন। শুরু হয় চিঠি চালাচালি। পার হয়ে যায় প্রায় সাত মাস। এ সময় কনটেইনার এবং বন্দর কর্তৃপক্ষকে ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন খাতে অটোমেশন লিমিটেডকে ব্যয় করতে প্রায় ৩২ লাখ টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং এনবিআরের বিভিন্ন টেবিল ঘুরে পণ্য ছাড়িয়ে আনার অনুমোদন যখন চূড়ান্তের পথে, ঠিক সে সময় বন্দরে ফেলে রাখা অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে কাস্টমস আইনানুযায়ী নিট ওয়্যার লিমিটেডের পণ্যও অকশনের নির্দেশ দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। আবারও নিট ওয়্যার কর্তৃপক্ষের ছোটাছুটি। গতকাল সোমবার পর্যন্ত ফেরত ওই পণ্য বন্দরেই পড়ে ছিল।

বিকেএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি মো. হাতেম কালের কণ্ঠকে বলেন, নারায়ণগঞ্জের অটোমেশন নিট ওয়্যার লিমিটেড কর্তৃপক্ষ আমার কাছেও এসেছিল। ফ্রান্সের লি হাভরি পোর্ট থেকে পণ্য ফিরিয়ে এনে বাধ্য হয়েই বন্দরে পণ্য ফেলে রাখতে হয়েছে তাঁদের। এত বড় লোকসান কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানটি এখন কোনোমতে টিকে আছে। অথচ আমদানি-রপ্তানি নীতি আদেশ অনুসারে এসব পণ্য নতুন আদেশে আবারও রপ্তানির সুযোগ আছে। কিন্তু কাস্টমস আইনানুসারে ১৪৩ শতাংশ শুল্ক না দিয়ে সেগুলো বন্দর থেকে ছাড়ানোর সুযোগ নেই। এনবিআর চেয়ারম্যান পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত আইনি জটিলতা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এভাবে নানা আইনি জটিলতায় কোটি কোটি টাকার পণ্য পড়ে আছে দেশের বিভিন্ন সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দরে।

শুধু আইনি জটিলতায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তাই নয়। বন্দরে পৌঁছানোর পরও পণ্য ছাড়করণে বা পণ্য জাহাজে ওঠাতে বহির্নোঙরে দীর্ঘ লাইনে থাকতে হয় অনেক সময়। এ ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের গচ্চা দিতে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। আবার যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে অনেক সময়ই খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকে কোটি কোটি টাকার আমদানি-রপ্তানির পণ্য। অনেক সময় মূল্যবান পণ্য হারিয়ে যায়, পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হয়। আবার বর্তমানে ব্যবহৃত বহু পুরনো শুল্ক আইনে আধুনিক অনেক যন্ত্রপাতি ও পণ্যের এইচএস কোড নেই। এ ক্ষেত্রে এসব পণ্য ছাড়িয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে কর্মকর্তাদের টেবিলে টেবিলে দিনের পর দিন ঘুরে হয়রানি হতে হয়। দীর্ঘ সময় পণ্য আটকা থাকায় আর্থিক মাসুলও দিতে হয় অনেক সময়।

সব বন্দর এখনো সম্পূর্ণ অটোমেশন না হওয়ায় অনেক সময় পণ্য বন্দরে নামানোর পরও ছাড়করণে জটিলতা দেখা দেয়। অনেক সময় কায়িক পরীক্ষার নামে চলে কালক্ষেপণ। ফলে মাসের পর মাস ব্যবসায়ীদের পণ্য ছাড়করণে অপেক্ষা করতে হয়। এসব ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অর্থ গুনতে হয় আমদানি-রপ্তানিকারককে।

অর্থনীতিতে আরো গতি আনতে এনবিআরের কাছে বিভিন্ন সময় ব্যবসায়ীদের করা আবেদনে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। মোংলা ও পায়রা বন্দরকে আরো কার্যকর করা হয়েছে। নতুন নতুন স্থলবন্দর করা হলেও সেখানে অনুন্নত অবকাঠামোর বিষয়টি উঠে এসেছে। ব্যবসায়ীরা পুরনো অনেক স্থলবন্দরের করুণ দশা থেকেও বের হয়ে আসার সুপারিশ করেছেন। পণ্য ছাড়করণে দিনের পর দিন অপেক্ষা, পণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা বা কায়িক পরীক্ষার উন্নত ব্যবস্থাও নেই এসব বন্দরে। অনেক বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় বন্দরে পৌঁছানো বা বন্দর থেকে দেশের মধ্যে নির্দেষ্ট স্থানে পণ্য পরিবহনে ব্যাপক ঝক্কি পোহাতে হয়। এত এত আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানিকৃত পণ্যের গুণও নষ্ট হয়ে যায়। সময়ও লাগে কয়েক গুণ। ঢাকা-চট্টগ্রামের চার লেন সড়কের দ্রুত বাস্তবায়নও চেয়েছেন তাঁরা।

ব্যবসায়ীরা আবেদনে বিমানবন্দর থেকে অহরহ আমদানিকৃত মূল্যবান পণ্য হারিয়ে যাওয়া বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁরা বলছেন, তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিশেষভাবে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পণ্য হারিয়ে যাওয়া নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

এসব সমস্যা তো আছেই, এর সঙ্গে সৎ ব্যবসায়ীরা আরো বিপাকে পড়েন শুল্ক শাখার কিছু অসৎ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে। বিভিন্ন অজুহাতে তারা পণ্য আটকে রাখে, পণ্য ছাড়করণে বিলম্ব করে, পণ্যের গুণাগুণ নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এসব দুর্নীতিবাজরাই পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য দিতে সহায়তা করে ব্যবসায়ী নামধারী অসৎ ব্যক্তিদের অর্থপাচারে সহযোগিতা করে চলেছে দিনের পর দিন।

এসব অনিয়ম থেকে মুক্তি পেতে শুল্ক গোয়েন্দা প্রতিবেদনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এনবিআর। আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থপাচারের বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দেশ থেকে প্রতিবছর পাচারকৃত অর্থের ৮০ শতাংশই আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে হচ্ছে। মোটা অঙ্কের বিনিময়ে বা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের অর্থপাচারে সহযোগিতা করছে এনবিআরের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী। এই ব্যক্তিরাই সৎ ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছে।

শুল্ক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে পণ্য যে পরিমাণে আনার ঘোষণা দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা, আনছেন তার চেয়ে কম দামের অন্য পণ্য। আনা হচ্ছে একই জাতীয় নিম্নমানের পণ্য বা কম পরিমাণের একই পণ্য। শুল্ক শাখার কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী অনেক সময় পুরো বিষয়টি জেনেশুনে অসৎ ব্যবসায়ীদের এ অপকর্ম করতে দিচ্ছে। একইভাবে ঘোষণার চেয়ে কম পরিমাণ রপ্তানি, এক পণ্য রপ্তানির কথা বলে অন্য পণ্য রপ্তানি বা নিম্নমানের পণ্য রপ্তানি করার সুযোগ করে দিচ্ছে তারা। বিনিময়ে অসৎ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের ঘুষ বা অনৈতিক সুবিধা। অল্প বেতনের এসব ব্যক্তির অনেকেই দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। যাপন করছে বিলাসবহুল জীবন।

সম্প্রতি খুলনার একটি প্রতিষ্ঠানের আড়াই শ কোটি টাকা অর্থপাচারে মোংলা সমুদ্রবন্দরের কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর জড়িত থাকার বিষয়টি শুল্ক গোয়েন্দারা তদন্তে নিশ্চিত হয়েছেন। এ প্রতিষ্ঠানের অর্থপাচারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার জড়িত থাকার বিষয়টিও তদন্তে ধরা পড়েছে। আবার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে চোরাচালানে এবং অর্থপাচারে বিমানের কিছু কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে তদন্তে। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে মামলাও করেছে এনবিআর। এই অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই সৎ ব্যবসায়ীদের হয়রানি করে থাকে। তারা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে মোটা অঙ্কের ঘুষ আদায় করে অথবা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে থাকে।

শুল্ক গোয়েন্দার প্রতিবেদনে অর্থপাচারকারী ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানকে বন্ড সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এ সুবিধার আওতায় শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে তৈরি পোশাক শিল্পের কারখানায় ব্যবহারের জন্য শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে থাকে। এসব কাঁচামাল আমদানি করে কারখানায় ব্যবহার না করে খোলাবাজারে বিক্রি করছে অনেক অসাধু প্রতিষ্ঠান। আবার বেশি পরিমাণে আমদানির কথা বলে বিদেশে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠিয়ে কম পরিমাণ পণ্য আমদানি করে। অন্যদিকে বেশি পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করে অর্থপাচার করে কম পরিমাণ পণ্য উত্পাদন করে সেগুলো রপ্তানি করছে। বিভিন্ন বন্দরের কার্যক্রমে সম্পূর্ণ অটোমেশন থাকলে এবং বন্দরের সঙ্গে ব্যাংক, এনবিআরের মূল দপ্তরের অনলাইনে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকলে অর্থপাচারের সুযোগ কমে যাবে।

এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্দরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনার জোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে অর্থপাচারের সুযোগ কমে যাবে। একই সঙ্গে অসৎ ব্যবসায়ী এবং অসৎ শুল্ক কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতেও তদন্ত চলছে। এসব অসৎ ব্যক্তিকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।

বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি প্রশ্ন করতে চাই, মিথ্যা তথ্য ব্যবহারের বিষয়টি সবাই জানার পরও কেন বন্ধ হচ্ছে না? এর সমাধান তো একমাত্র অটোমেশন। বর্তমানে এনবিআর বেনাপোল, চট্টগ্রাম এবং অন্য দু-একটা শুল্ক স্টেশনে অটোমেশন ব্যবহার করতে পারলেও অন্য সব বন্দরে এখনো এ বিষয়ে তেমন কিছুই হয়নি। আবার এই তিন শুল্ক স্টেশনে আমদানিতে যতটা অটোমেশন ব্যবহারের সুযোগ আছে রপ্তানিতে নেই। এসব সুযোগ নিচ্ছে ব্যবসায়ী নামের অসাধু ব্যক্তিরা। আমদানিকৃত পণ্য রেজিস্ট্রারে ওঠানো হচ্ছে কিস্তু ওই প্রতিষ্ঠান ওই কাঁচামাল ব্যবহার করে কী পরিমাণ উত্পাদন করছে আর কী পরিমাণ রপ্তানি করছে তা হিসাব করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। এ হিসাব সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এনবিআরের শুল্ক শাখায়, সংশ্লিষ্ট বন্দরে এবং বন্ড কমিশনারেটে অনলাইনে পৌঁছাতে হবে। কোনো অনিয়ম হলে সঙ্গে সঙ্গে সিগন্যাল আসতে হবে। পৃথিবীর বহু দেশেই এ ব্যবস্থা আছে। ’

আবদুস সালাম মুর্শেদী আরো বলেন, অর্থপাচার কী অসৎ ব্যবসায়ীর একার পক্ষে করা সম্ভব? মোটেও না। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করছে দুর্নীতিবাজ কিছু ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী আর এনবিআরের শুল্ক শাখার কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ বিষয়ে শুধু এনবিআরকে পদক্ষেপ নিলেই চলবে না। দুর্নীতি দমন কমিশন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। ব্যবসায়ী নামধারী অসৎ ব্যক্তিকেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

বন্দরে আমদানি-রপ্তানিকৃত পণ্য যথাযথ সংরক্ষণের অভাবেও ব্যবসায়ীরা বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এ কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ওষুধ শিল্পের ব্যবসায়ীরা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা খাদ্যদ্রব্য আমদানি-রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল, হাসপাতালে ব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম বা খাদ্যদ্রব্যের গুণাগুণ বন্দরে সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একজন ব্যবসায়ীর স্পর্শকাতর পণ্য আমদানি বা রপ্তানির জন্য বিমানবন্দরে সংরক্ষণে রাখতে হয়। এ ক্ষেত্রে কে এসব মালামাল যথাযথ সংরক্ষণ করবে তা নিয়ে রয়েছে বিভিন্ন জটিলতা। শুল্ক শাখা, বিমান কর্তৃপক্ষসহ বিমানবন্দরে উপস্থিত বিভিন্ন সংস্থা একে অন্যেকে দেখিয়ে দেয়। আমরা ব্যবসায়ীরা পড়ি মহাজটিলতায়। ’

সম্প্রতি কাস্টমস দিবসের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, বিশ্বায়নের এ সময় মোট রাজস্ব আদায়ে শুল্কের পরিমাণ কমলেও শুল্কের গুরুত্ব বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে পণ্য দ্রুত ছাড়করণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পণ্য যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। শুল্ক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজস্ব আদায়ের বাইরেও পণ্যের গুণাগুণ বিষয়ে ও সংরক্ষণ করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে।

সম্প্রতি কাস্টমস দিবসকে সামনে রেখে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান ব্যবসায়ীদের দাবি বিবেচনায় এনে নিজে বিভিন্ন বন্দরের কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি করছেন। শুল্কনীতি শাখায় বিভিন্ন বন্দর থেকে সাপ্তাহিক কার্যক্রমের ওপর প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশও দেন তিনি, যা সমন্বিত করে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া হয়। এ প্রতিবেদনানুসারে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেন চেয়ারম্যান। এ নির্দেশ কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করছে এনবিআরের মূল দপ্তরের শুল্কনীতি শাখার সদস্যকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটি এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের গোয়েন্দারা।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, এনবিআর দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করার স্বার্থে সৎ ব্যবসায়ীদের পাশে থেকে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। এ জন্য পর্যায়ক্রমে সংলাপ করছে এনবিআর। কোনো সমস্যা এনবিআরকে জানানোর পর তা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। শুল্ক আইন আধুনিকায়নে এনবিআর কাজ করছে। আশা করি এতে ব্যবসায়ীদের দাবির প্রতিফলন থাকবে।


মন্তব্য