kalerkantho


রেলপথ নির্মাণ ব্যয়ও বাংলাদেশে সর্বোচ্চ

পার্থ সারথি দাস   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রেলপথ নির্মাণ ব্যয়ও বাংলাদেশে সর্বোচ্চ

মহাসড়ক নির্মাণে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে। এশিয়ায় অন্য দেশগুলোর তুলনায় ফ্লাইওভার নির্মাণের খরচও বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। এখন দেখা যাচ্ছে, রেলপথ নির্মাণেও বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে বাংলাদেশেই।

বিভিন্ন দেশের রেলপথ নির্মাণ ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, উন্নত দেশগুলোতে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে গড় ব্যয় হচ্ছে ৩১ কোটি টাকা। বাংলাদেশে সর্বশেষ ঢাকা-পায়রা বন্দর রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পেই প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫০ কোটি টাকা। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার রেলপথের প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ২০৩ কোটি টাকা। চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে বান্দরবানের ঘুনধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়ছে ১৩৯ কোটি টাকারও বেশি। অথচ ভারতে সাধারণ সিঙ্গেল লাইনের রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারে গড়ে ব্যয় হয় ১২ কোটি টাকা। পাকিস্তানে এই ব্যয় কিলোমিটারে ১৫ কোটি টাকা। চীনে ট্রেন চলাচলের জন্য ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার গতিবেগের রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারে খরচ হচ্ছে সর্বোচ্চ ৭৫ কোটি  টাকা। আর সাধারণ সিঙ্গেল রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারে খরচ হচ্ছে ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। 

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, দেশে রেল সরঞ্জাম নির্মাণ ও উৎপাদনের নিজস্ব কারখানা না থাকায় এসব সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রে বেশি হারে আমদানি শুল্ক দিতে হচ্ছে। তার ওপর ভূমি অধিগ্রহণেও ব্যয় অত্যধিক। সেই সঙ্গে ঠিকাদারদের গাফিলতির ফলে সময়ক্ষেপণে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় বারবার ব্যয় বাড়ানোর সংস্কৃতিও আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ছাড়াই বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার দুরভিসন্ধি, সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই ধারণার ওপর ব্যয় প্রাক্কলন, তৃতীয় পক্ষের তদারকি ছাড়াই রেলপথ নির্মাণের কারণে ব্যয় বেড়েই চলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ আগ্রহে রেল নিয়ে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করার পর বিগত মহাজোট সরকারের সময় থেকেই রেলে বিনিয়োগ বাড়ছে। বিনিয়োগ বাড়ার পর উল্লিখিত কারণগুলো দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রকল্পে ব্যয়ের পরিমাণও বাড়িয়ে দিচ্ছেন। 

 

বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্প আছে ৪৮টি। এসব উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে কারখানা না থাকায় পাথর, রেলসহ বিভিন্ন উপাদান ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আনতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমদানি করা মালামালের মূল্যের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ অর্থ ভ্যাট ও শুল্ক হিসেবে দিতে হয়। ভারতের চেয়ে চীন থেকে মালামাল বেশি আনা হচ্ছে, দাম একটু কম বলে। সিলেট অঞ্চলে স্লিপার তৈরির কারখানা থাকলেও তা থেকে সব চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। উপাদানের সংকট তৈরি করে এ কারখানাও মাঝেমধ্যে বন্ধ করে রাখা হয়।

জানা গেছে, সৈয়দপুর ও পাবর্তীপুরে কোচ মেরামত কারখানা থাকলেও সেগুলো অকার্যকর করে রাখার চেষ্টা করা হয়। রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সৈয়দপুর ও পাহাড়তলীর কারখানাও বিভিন্ন সময় অকার্যকর করে রাখে রেলওয়েরই একটি সিন্ডিকেট। কারণ কারখানা চালু থাকলে বাইরে থেকে সরঞ্জাম আমদানি কমে যাবে। তাতে কমিশনের বিষয়টি জড়িত বলে একটি চক্র নিজস্ব কারখানার বিকাশে বিরোধিতা করছে। এক দশক আগে নতুন কোচ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তাই তাঁর বিরোধিতা করেন।

ঢাকা-পায়রা বন্দর পথে কিমিতে ব্যয় ২৫০ কোটি টাকা : বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্ত ২৪০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। হিসাব করে দেখা গেছে, এ পথে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হবে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পের নকশা ও সমীক্ষা করবে যুক্তরাজ্যের ডিপি রেল নামের একটি প্রতিষ্ঠান। গত ২০ ডিসেম্বর এ জন্য সংস্থাটির সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক এ চুক্তির পর ডিপি রেলের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের চূড়ান্ত চুক্তি হবে। এ রেলপথ নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও যাচাই করবে ডিপি রেল। তারপর রেলপথের নকশা তৈরি করা হবে। ডিপি রেল জানিয়েছে, ২০২৪ সালের মধ্যে তারা রেলপথটি নির্মাণ করতে পারবে। নির্মাণের পর নতুন এ রেলপথে বছরে ২০ লাখ ইউনিট কনটেইনার পরিবহন করা যাবে। পায়রা বন্দরের নির্মাণকাজ শেষে কনটেইনার পরিবহনের চাহিদা বাড়লে ভবিষ্যতে রেলপথটি ডাবল লাইনে রূপান্তর করা যাবে। প্রথম দফায় এ প্রকল্পের অধীনে সিঙ্গেল লাইন নির্মাণ করা হবে। রেলপথ নির্মাণে ডিপি রেলকে সহযোগিতা করবে চীনের চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিআরসি) নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

প্রকল্পে ব্যয় কেন এত বেশি ধরা হয়েছে—জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাহউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটি সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প। প্রকৃত ব্যয় নির্ধারিত হবে সমীক্ষার পর। এ ছাড়া এখনো ডিপি রেলের সঙ্গে আমাদের চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। সব বিষয় যাচাই-বাছাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে এটা বড় একটি প্রকল্প, তাও বিবেচনায় রাখতে হবে।’

ঢাকা-যশোর রেল সংযোগে কিমিতে ব্যয় ২০৩ কোটি টাকা : ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের প্রকল্প নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ২০৩ কোটি টাকা। মূল পদ্মা সেতুর চেয়েও এ প্রকল্পে ব্যয় বেশি ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ সেতু বিভাগের অধীন মূল পদ্মা সেতুর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

চীন সরকার এ প্রকল্পে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার জোগান দেবে। বাকি অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পের ব্যয় বেশি ধরা ও যুক্তিযুক্ত না হওয়ায় পরিকল্পনা কমিশন এ নিয়ে গত বছরের এপ্রিলে প্রশ্নও তুলেছিল। পরে ব্যয় প্রাক্কলনসহ প্রকল্প নেওয়ার সব প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল যুক্তরাজ্যের পরামর্শক অ্যান্থনি সালিভ্যানকে। গত বছরের ১৯ এপ্রিল প্রকল্পটি একনেকের বৈঠকে উত্থাপনের কথা ছিল। তার আগের দিন প্রকল্পের ব্যয় দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব, রেলওয়ের মহাপরিচালক ও রেলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ডেকে কেন বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে এটি অনুমোদন করা হয়। 

জানা গেছে, এ প্রকল্পে ব্যক্তিগত পর্যায়ের জমি অধিগ্রহণ করতে হবে এক হাজার ৬৬৬ একর। ৬৬টি বড় ও ২৪৪টি ছোট সেতু নির্মাণ করা হবে, আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে ৪০টি এবং লেভেলক্রসিং নির্মাণ করা হবে ২৯টি।

দোহাজারী-ঘুনধুমে কিমিতে ব্যয় ১৩৯ কোটি টাকা : বাংলাদেশ রেলওয়ের আরেকটি আলোচিত প্রকল্প দোহাজারী-ঘুনধুম রেলপথ। ১২৯ কিলোমিটার রেলপথের এ প্রকল্পে ব্যয় হবে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। সেখানে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে খরচ পড়ছে ১৩৯ কোটি টাকারও বেশি। প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ছয় হাজার ৩৪ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার। বাকি ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পের অধীনে ১১টি রেলস্টেশন নির্মাণ করা হবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া, কক্সবাজারের চকরিয়া, কক্সবাজার সদর ও উখিয়া এবং বান্দরবানের রুমা ও ঘুনধুমেও রেলস্টেশন থাকবে। নির্মাণ করা হবে ৫২টি বড় ও ১৯২টি ছোট রেল সেতু। দোহাজারী থেকে রুমা পর্যন্ত ৮৮ কিলোমিটার, রুমা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার, রুমা থেকে ঘুনধুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে প্রকল্পের আওতায়। ইতিমধ্যে ভূমি অধিগ্রহণেই খরচ হয়েছে ৯০০ কোটি টাকার বেশি। হাতি চলাচলের জন্য পাঁচটি উড়াল সেতু নির্মাণের সুযোগ অন্তর্ভুক্ত করায় প্রকল্পের ব্যয় গত বছর প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, এডিবির চাপে পড়ে তাদের পরামর্শে ব্যয় বাড়াতে হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কথায় তাদের মনোনীত পরামর্শক ও ঠিকাদার নিতে হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের দ্রুত চাপের কারণে সরকারকে এসব চাপ মেনে নিতে হচ্ছে। 

আখাউড়া-লাকসাম পথে কিমিতে ব্যয় ৪৫ কোটি টাকা : বর্তমান অর্থবছরে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বাংলাদেশের রেলওয়ের প্রকল্প আছে ৪৮টি। তার মধ্যে অন্যতম হলো আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প। ২০১৪ সালের ১ জুলাই প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছিল। ১৪৪ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ছয় হাজার ৫০৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে সেখানে ব্যয় হবে ৪৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৯ শতাংশ।

ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মতো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে রেলপথ নির্মাণের খরচ বেশি কেন— জানতে চাইলে এ প্রকল্পের পরিচালক মো. মোজাম্মেল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি, রেললাইন, স্লিপার, পাথর—এগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আমদানি শুল্ক ছাড়াও ভূমি অধিগ্রহণের কারণে বেশি ব্যয় হচ্ছে। এ প্রকল্পেই ১০০ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে।

খুলনা-মোংলা পথে কিমিতে ব্যয় ৫৮ কোটি টাকা : খুলনা থেকে মোংলা পর্যন্ত ৬৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৮০১ কোটি টাকা। কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ৫৮ কোটি টাকারও বেশি।

প্রকল্পটি অনুমোদন হয়েছিল ২০১০ সালের ১ ডিসেম্বর। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৩০.৮ শতাংশ। ছয় বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। এ ব্যাপারে প্রকল্পের জিএম মো. মজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে ৬৭৬ একর। সেখানেই চলে যাবে এক হাজার কোটি টাকা। মালামাল আমদানি শুল্ক খাতেই যাবে কমপক্ষে ১৫০ কোটি টাকা। ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে শিগগির। সরকারের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়ই সময় বেশি চলে গেছে।

বিশ্বমানের রেলপথে প্রতি কিমিতে ব্যয় ৩১ কোটি  টাকা : জানা গেছে, দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে বৈদ্যুতিক সিঙ্গেল ট্র্যাকের লাইন, সিগন্যালিং ও অন্যান্য অবকাঠামোসহ কিলোমিটারপ্রতি রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয় সর্বনিম্ন ২৩ থেকে সর্বোচ্চ ৩১ কোটি টাকা। ডিজেল ইঞ্জিনের ২৫ টন এক্সেল লোডের সিঙ্গেল ট্র্যাকের ক্ষেত্রে কিলোমিটারে ব্যয় হয়ে থাকে ছয় কোটি টাকা। বিশ্বের বৃহত্তম ও ব্যস্ততম রেল ব্যবস্থা আছে ভারতে। ভারতের রেল মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দিনে এক কোটি ৯০ লাখের বেশি যাত্রী চলাচল করে সে দেশের বিভিন্ন রেল রুটে। ভারতে রেলপথ আছে ৬৩ হাজার ৩২৭ কিলোমিটার, কর্মচারীর সংখ্যা ১৪ লাখ। আর রেলস্টেশন আছে ছয় হাজার ৯০৯টি।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ১৫৪টি নতুন রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পথের মোট দৈর্ঘ্য হবে ১৭ হাজার ১০৫ কিলোমিটার। প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়বে ১২ কোটি টাকা। ভারতের রেল মন্ত্রণালয়, সরকারি বিভিন্ন সূত্র ও গবেষকদের কাছ থেকে জানা গেছে, ভারতে সাধারণ বা সিঙ্গেল লাইনের রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারে সর্বোচ্চ ব্যয় হয় ১৭ কোটি টাকা। ভারতে রেল সরঞ্জাম নির্মাণ ও উৎপাদনের বেশ কয়েকটি কারখানাও রয়েছে। নতুন রেলপথ নির্মাণের যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে তাতে ব্যয় যাতে বেশি না হয় সে জন্য সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে যাচাই-বাছাই চলছে। 

চীনের বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যানুসারে, সেখানে সিঙ্গেল লাইনের সাধারণ রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারে ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা। ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার গতির হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণের ক্ষেত্রে কিলোমিটারে ব্যয় হয় সর্বোচ্চ ৭৫ কোটি টাকা।

পাকিস্তানে রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি সর্বোচ্চ গড় ব্যয় হয় ১৫ কোটি টাকা। দেশটির পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যানুসারে, সেখানে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে খানেওয়াল থেকে রায়উইন্ড পর্যন্ত ২৪৬ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে চার হাজার কোটি পাকিস্তানি রুপি (তিন হাজার কোটি টাকা)। সে অনুযায়ী প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ টাকা।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাহউদ্দিন গত বৃহস্পতিবার বিকেলে তাঁর দপ্তরে আলাপকালে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারত ও মালয়েশিয়ায় আমি নিজে রেল সরঞ্জাম তৈরির কারখানা পরিদর্শন করেছি। আমাদের দেশে কোচ মেরামতের জন্য সৈয়দপুর ও পাহাড়তলীতে কারখানা আছে। এর মধ্যে একটি কারখানার আধুনিকায়নের জন্য ভারত সরকারের ঋণের আওতায় প্রকল্প নেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমাদের দেশে কোচ উৎপাদন কারখানা নির্মাণের জন্য আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল। সে সময় বলা হয়েছিল, মাত্র দুই হাজার কিলোমিটার রেলপথের জন্য এ কারখানা করা লাভজনক হবে না। আমি মনে করি রেলপথ আগের চেয়ে বেড়েছে, দুই হাজার থেকে এখন লুপ লাইনসহ সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার হয়েছে। এখন রেল সরঞ্জাম তৈরির কারখানা করা যায়। তার জন্য আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।’

কলকাতা থেকে হুগলির মধ্যে সংযোগের জন্য মেট্রো রেল প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে ৫৬ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে উল্লেখ করে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে অবকাঠামো নির্মাণে প্রতিযোগিতাকারী প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে কারো মনোনীত ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার চাপও থাকে। এ কারণে উন্নত বিশ্বের মতো প্রতিযোগিতা ছাড়াই ঠিকাদার নিয়োগ করা হচ্ছে। ফলে ঠিকাদারের প্রাক্কলন অনুসারেই ব্যয় নির্বাহ করা হয়ে থাকে।’



মন্তব্য