kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সু চির দূতের সাক্ষাৎ

রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১২ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমারের সব রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে দেশটির ওপর চাপ বাড়িয়েছে ঢাকা। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে এবং তাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করার আহ্বানও জানানো হয়েছে। সফররত মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির বিশেষ দূত কিয়াউ তিনের সঙ্গে গতকাল বুধবার আলাদা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এ আহ্বান জানান। তবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে মিয়ানমার পক্ষ কী বলেছে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রোহিঙ্গারা অনেক দশক ধরে মিয়ানমারে বসবাস করে এলেও দেশটি তাদের নিজের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। উপরন্তু বঞ্চনা-নির্যাতন-নিপীড়নের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

এর আগে গত দুই মাসে বাংলাদেশ ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে দুই দফা তলব করে রোহিঙ্গা ইস্যুতে উদ্বেগ জানায় এবং সব রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানায়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সু চি তাঁর বিশেষ দূতকে ঢাকা পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। তবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার কতটা আন্তরিক তা নিয়ে বৈশ্বিক অঙ্গনে প্রশ্ন আছে।

বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সন্ধ্যায় গণভবনে সু চির বিশেষ দূতের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া তাদের সব নাগরিককে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে শরণার্থী সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করতে পারে।

বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাসের ব্যাপারে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার নীতি তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বলেছেন, বাংলাদেশ তার ভূখণ্ড প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে ব্যবহূত হতে দেবে না।

প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ সম্পর্ক আরো জোরদারে তিনি প্রয়োজনীয় সব কিছুই করবেন।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ উন্নয়ন অভিজ্ঞতা থেকে মিয়ানমার শিখতে পারে। তিনি মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।

বৈঠকে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলরের বিশেষ দূত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সু চির লেখা একটি চিঠি হস্তান্তর করেন। তিনি বলেন, মিয়ানমারও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার করতে চায়। সীমান্তে লিয়াজোঁ অফিস খোলার ওপর জোর দিয়ে বলেন, এটি উভয় দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের বিশেষ দূত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে তথ্য বিনিময়ের ওপরও জোর দেন।

এর আগে গতকাল দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল পৌনে ৫টা পর্যন্ত ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও পররাষ্ট্রসচিব মো. শহিদুল হকের সঙ্গে মিয়ানমারের বিশেষ দূত বৈঠক করেন। এরপর কোনো পক্ষই সাংবাদিকদের কাছে বৈঠক প্রসঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি।

তবে বৈঠক সূত্রের বরাত দিয়ে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে জানায়, পররাষ্ট্রসচিব বৈঠকে বলেছেন যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং এই সমস্যা মিয়ানমারকে সমাধান করতে হবে। তবে সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ মিয়ানমারকে সহযোগিতা করবে। বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয়ভাবেই এই সমস্যার সমাধান চায়।

বাংলাদেশ জানায়,  ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। তখন দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে মিয়ানমার স্বীকার করে নিয়েছিল, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের আইনগত নাগরিক।

বাংলাদেশ আরো জানায়, গত তিন দশকে কয়েক লাখ মিয়ানমার নাগরিক বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে এবং তিন থেকে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বসবাস করে আসছে। গত অক্টোবর মাস থেকে নতুন করে প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

আগামী ১৯ জানুয়ারি শুধু রোহিঙ্গা বিষয়ে মালয়েশিয়ায় ইসলামী দেশগুলোর সংস্থা ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আছে এবং সেখানে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি জোরালো ও সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ সেখানে তার একই অবস্থান তুলে ধরবে বলে জানা গেছে।

এদিকে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক সমন্বয়কারী সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে নতুন করে ২২ হাজার মানুষ রাখাইন রাজ্য থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে বলে খবর পাওয়া  গেছে। ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত করা হিসাব অনুযায়ী, গত ৯ অক্টোবরের পর থেকে হত্যা ও নির্যাতনের মুখে ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত ডিসেম্বর মাসে অবিলম্বে রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধের জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। মিয়ানমারের প্রতিবেশী এবং আসিয়ানের সদস্য মালয়েশিয়া প্রকাশ্যে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা নির্যাতনের জন্য দায়ী করেছে। সিঙ্গাপুরও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান প্রত্যাশা করেছে। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত মাসে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফর করেছেন।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান প্রসঙ্গে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিচার্স ইউনিটের (রামরু) সমন্বয়কারী অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, ‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যে শক্ত অবস্থান এবার নিয়েছে, তা আরো অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাই সম্মানজনকভাবে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়াই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান। মিয়ানমারকে তার নাগরিকদের স্বীকৃতি দিয়ে সম্মানজনকভাবে ফেরত নিতে হবে। ’

সি আর আবরার বলেন, ‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক আচরণ করছে। তাই আমার ধারণা, বাংলাদেশ যে অবস্থান নিয়েছে তার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সমর্থন দেবে। তারাও চাইবে, রোহিঙ্গারা তাদের নিজেদের দেশে যাতে সম্মানজনকভাবে ফিরে যেতে পারে। ’

তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশে অবস্থানরত কয়েক লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে দুই হাজার ৪১৫ জনকে মিয়ানমার ২০১১ সালেই নিজের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করেছে। কিন্তু তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করতে মিয়ানমার গড়িমসি করে আসছিল। এবার বিশেষ দূতের সফরের আগেই মিয়ানমার ওই দুই হাজার ৪১৫ জন ছাড়া বাকিদের দায়দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে।

মিয়ানমার সরকার একদিকে রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করছে। আবার অন্যদিকে যারা অন্য দেশে আশ্রয় নিয়েছে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার শর্ত হিসেবে নাগরিকত্ব থাকার শর্ত দিচ্ছে। এর ফলে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।


মন্তব্য