kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


১০০% পেনশন তোলা বন্ধে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

যাঁরা শতভাগ উঠিয়েছেন তাঁরা ডুবেছেন : অর্থমন্ত্রী

মোশতাক আহমদ   

১২ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



১০০% পেনশন তোলা বন্ধে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ফাইল ছবি

‘সরকারি চাকরিজীবীরা একসঙ্গে পুরো পেনশন তুলতে পারবেন না’—গত মঙ্গলবার অর্থ বিভাগ থেকে এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারির পর মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অবসরে যাওয়া ব্যক্তিরা একসঙ্গে পেনশনের পুরো টাকা তুলে খরচ করার পর শেষ বয়সে সংকটে পড়েন, এমন ভাবনা থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে পেনশনের এই নতুন প্রজ্ঞাপনে নাখোশ হয়েছেন অনেকেই।

অর্থ বিভাগ বলেছে, আগামী ১ জুলাই থেকে যাঁদের অবসরোত্তর ছুটি শেষ হবে, তাঁরা গ্রস পেনশনের ১০০ শতাংশ সমর্পণ করতে বা পেনশনের শতভাগ অর্থ তুলে নিতে পারবেন না। তাঁরা একসঙ্গে পেনশনের ৫০ শতাংশ অর্থ তুলে নিতে পারবেন। বাকি ৫০ শতাংশের জন্য মাসিক পেনশন পাবেন। আর মাসিক পেনশনের ওপর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পাবেন।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘পেনশনের পুরো টাকা একসঙ্গে তোলা যাবে না। এর আগে যাঁরা শতভাগ পেনশন উঠিয়েছেন, তাঁরা ডুবেছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, পেনশন অবসরকালীন সময়ের সিকিউরিটি। এখন নতুন নতুন পরিবর্তন আনা হচ্ছে। যাঁরা পেনশনের শতভাগ অর্থ তুলেছেন, তাঁরা কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না। ’

গত মঙ্গলবার এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তাতে বলা হয়,পেনশনধারীদের আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার স্বার্থে বিধানটি চালু করা হয়েছে।

জানতে চাইলে অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দেখেছি, পুরো টাকা একসঙ্গে তুলে নিয়ে অনেক পেনশনার বিপদে পড়েছেন। কেউ ব্যবসা করতে গিয়ে মার খেয়েছেন, কেউ বা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। তাঁদের অনেকে এখন সাহায্যের জন্য আবেদন করছেন মন্ত্রণালয়ে। পুরো টাকা তুলে না নিলে এ শোচনীয় পরিস্থিতি তৈরি হতো না। ’

তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আগামী বছরের ২৮ নভেম্বর অবসরে যাব। এরপর মেয়ের কাছে বিদেশে চলে যাব। সেখান থেকে হয়তো আর দেশে খবু একটা আসা হবে না। এখন আমি পেনশনের টাকা পুরোটা তুলতে পারব না। আর প্রতিবছর মাসের মধ্যে এসে টাকা উত্তোলন করা প্রায় অসম্ভব। পেনশনের এই নতুন প্রজ্ঞাপনে আমি নাখোশ। ফলে নতুন প্রজ্ঞাপনে যেন টাকা উত্তোলনের বিষয়টি ঐচ্ছিক করে দেওয়া হয়। ’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন আদেশ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ার আগেই তাঁর প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ আনুতোষিক সেবার অর্থের চেক পাবেন। এ ছাড়া পেনশনারদের যেসব নথিপত্র সংগ্রহ করতে হয়, সেসব আর তাঁদের সংগ্রহ করতে হবে না। ফলে পেনশন পেতে তাঁদের ভোগান্তি কমবে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন বিধানের মাধ্যমে পেনশনের ৫০ শতাংশ মাসিক ভিত্তিতে নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের শতভাগ পেনশনের টাকা তুলে নেওয়ার পরিবর্তে ৫০ শতাংশেরই সুপারিশ করা হয়েছিল।

অর্থ বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পেনশনভোগীদের পরিবারে অর্থের সংস্থান বজায় রাখা, সরকারের ওপর এককালীন আর্থিক চাপ কমানো এবং পেনশনের অর্থ বিনিয়োগ করা—এ তিনটি দিক বিবেচনায় রেখে নতুন বিধানটি করা হয়েছে।

অর্থ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘পেনশনের পুরো টাকা একসঙ্গে তুলে নেওয়ার রেওয়াজ বিশ্বের কোথাও নেই, এমনকি প্রতিবেশী ভারত-পাকিস্তানেও নেই। সব টাকা একসঙ্গে তুলে নিয়ে যাওয়াটা পেনশন-ধারণার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। ’

নতুন বিধানটি স্বাগত জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক একজন সচিব বলেছেন, ‘পেনশনের অন্তত অর্ধেক সরকারের ঘরে রাখার যে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে, তা খুবই ভালো উদ্যোগ। আমি নিজে পুরো টাকা তুলে নিয়ে বোকামি করেছি। যদি না তুলতাম এখন মাসে মাসে ৫০ হাজার টাকা করে পেতাম, যা হতো একটি চাকরির বেতনের সমান। ’

সরকারের একজন সিনিয়র সচিব যিনি চলতি ২০১৭ সালের শেষের দিকে অবসরে যাবেন, তিনি বলেন, ‘পেনশনের আগের নিয়ম ভালো ছিল। কারণ মাসে মাসে পেনশন উত্তোলন একটি হেরাজমেন্ট। অনেক ক্ষেত্রে অযথা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেকে নিঃসন্তান, তাঁরা জীবিত অবস্থায় পুরো টাকা দেখে যেতে পারবেন না। ’ তাঁর মতে, নতুন প্রজ্ঞাপনে ঐচ্ছিক শব্দটাও যুক্ত করা দরকার ছিল।  

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পেনশনের বিষয়ে নতুন যে প্রজ্ঞাপন হয়েছে তা সরকার অনেক চিন্তাভাবনা করেই করেছে। একদিকে চাকরিজীবীরা একসঙ্গে সব টাকা নিয়ে নষ্ট করে ফেলে, আবার একসঙ্গে টাকা দিতে গিয়ে সরকারের ওপরও অনেক চাপ পড়ে, তাই যতই দাবি আসুক না কেন আপাতত এটি সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই। ’


মন্তব্য