kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস

জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৬.৮ শতাংশ

মন্দ ঋণের কারণে আর্থিক খাত ঝুঁকিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৬.৮ শতাংশ

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালসহ সরকারের নীতিনির্ধাকরা চলতি অর্থবছর শেষে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের কাছাকাছি অর্জনের কথা বললেও বিশ্বব্যাংক বলছে, ৭ শতাংশের ঘরেই থাকবে এ প্রবৃদ্ধি। বহুজাতিক সংস্থাটি বলেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে ৬.৮ শতাংশ। এর পরের বছর প্রবৃদ্ধি আরো কমে দাঁড়াবে ৬.৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক তাদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ২০১৭ প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনটি গত মঙ্গলবার রাতে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সরকার এ বছরের বাজেটে প্রবৃদ্ধি ৭.২ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে।

এবছর ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি না হওয়ার পেছনে যুক্তি তুলে ধরে বিশ্বব্যাংক বলেছে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স কমে গেছে। সামনের দিনগুলোতে এই ধারা অব্যাহত থাকবে। আর প্রবাসী আয় কমে যাওয়ায় ব্যক্তিগত ভোগব্যয় কমে যাবে। সঙ্গে বিনিয়োগও। প্রবাসী আয় কমে যাওয়া নিয়ে গত সপ্তাহে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডিও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার পেছনে সিপিডি দুটি কারণ তুলে ধরেছে। প্রথমত, প্রবাসীরা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে।

বিশ্বব্যাংক মনে করে, মন্দ ঋণের কারণে বাংলাদেশের আর্থিক খাত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক খাতের কেলেঙ্কারির কথা উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, এখানে আর্থিক ও করপোরেট ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা কমে গেছে। এ অস্থিরতা কাটিয়ে দ্রুত স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। রাজস্ব আদায়ের হার বাংলাদেশে অত্যন্ত কম উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংক বলেছে, মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতে এখানে রাজস্ব আদায়ের চিত্র সুখকর নয়। এটি বাড়ানো জরুরি।

পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়েও পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি মনে করে, চলতি ও আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার কমলেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গিয়ে এখানে প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশে উন্নীত হবে। এর পেছনে অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং রপ্তানি আয় বেড়ে যাওয়া নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে। বিশ্বব্যাংক মনে করে, সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশে নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থিতিশীল হবে। এতে করে বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়বে। পাশাপাশি পদ্মা সেতুসহ সরকারের অনেক বড় বড় প্রকল্পের কাজ শেষের দিকে থাকবে। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটা উদ্দীপনা কাজ করবে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর।

বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের গুণগত মানের সমালোচনা করে বিশ্বব্যাংক তাদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ২০১৭ প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করেছে, গুণগত মানের দুর্বলতায় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পাশের দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে বিদ্যুতের অপ্রতুলতা ও সড়কের বেহাল। এসব দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত হারে বিনিয়োগ ও উৎপাদন হচ্ছে না।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান হবে তৃতীয়। প্রথম অবস্থানে থাকবে ভুটান। ২০১৭ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি হবে ৯.৯ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবে ভারত। দেশটির প্রবৃদ্ধি হবে ৭ শতাংশ।

জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বরাবরই সরকারের মতপার্থক্য দেখা দেয়। গতবারও বিশ্বব্যাংকের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী।

বিশ্বব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে রেমিট্যান্স মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। গলফ করপোরেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) ছয়টি দেশে বাংলাদেশির সংখ্যা বেশি। তেল উৎপাদন ও রপ্তানি কমে যাওয়ায় এই ছয় দেশের অর্থনীতিতে এখন মন্থর গতি। এর প্রভাব পড়েছে প্রবাসী আয়ের ওপর। এর ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আরো কমে যাবে, যার প্রভাব পড়বে ভোগব্যয়ে। এতে করে প্রবৃদ্ধি কমে যাবে।

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার স্বস্তিতে থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অন্যভাবে দেখছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি মনে করে, এখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা এখনো রয়েছে। এর পেছনে যুক্তি তুলে ধরে সংস্থাটি বলেছে, ২০১৬ সালে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি আশানুরূপ হয়নি। এটি হতে পারে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, ২০১৭ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২.৭ শতাংশ হবে। বিদায়ী বছরের চেয়ে এ বছর প্রবৃদ্ধি বেশি হবে বলে মনে করে সংস্থাটি। বিদায়ী বছরে বিশ্বে ২.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ও ব্রেক্সিটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি অনিশ্চয়তা তৈরি হবে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।


মন্তব্য