kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


সাধারণ বীমা করপোরেশন

অনিয়মে বিফল ২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা

আবুল কাশেম ও শেখ শাফায়াত হোসেন   

১২ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অনিয়মে বিফল ২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা

পুনর্বীমা-সংক্রান্ত বড় অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে সাধারণ বীমা করপোরেশনে। নন-লাইফ কম্পানিগুলো পুনর্বীমার চুক্তির শর্ত ঠিকমতো মানেনি। কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে কিছু বলেনি। ফলে করপোরেশনের দুই হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়নি।

অর্থের হিসাব ঠিকভাবে না করা, দাবি পরিশোধে দেরি করা প্রভৃতি অনিয়মের ঘটনাও ঘটেছে। এতে করপোরেশনের আয় কমেছে, আর সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

জানা গেছে, চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট প্রতিষ্ঠান মেসার্স নুরুল ফারুক হাসান অ্যান্ড কম্পানির বিশেষ নিরীক্ষায় সাধারণ বীমা করপোরেশনের সঙ্গে নন-লাইফ (সাধারণ) বীমা কম্পানিগুলোর পুনর্বীমা চুক্তিপত্রে পার্থক্য দেখা গেছে। এ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ৩৫ শতাংশ পোর্টফোলিও প্রিমিয়াম ও ১০ শতাংশ অনাদায়ী লোকসান-পরবর্তী বছরে স্থানান্তর করার কথা। কিন্তু সাধারণ বীমা করপোরেশন সব ক্ষেত্রে একভাবে এ নিয়ম পালন করেনি।

প্রসঙ্গত, নন-লাইফ বীমা কম্পানির সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বীমা পলিসি করলে এর একটি অংশ সাধারণ বীমা করপোরেশনে পুনর্বীমা করতে হয়। এটা বাধ্যতামূলক।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুনর্বীমা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোনো নন-লাইফ কম্পানি যথাসময়ে ত্রৈমাসিক পুনর্বীমার হালনাগাদ তালিকা (বোর্ডিয়াক্স) দাখিল করতে ব্যর্থ হলে ২.৫ শতাংশ জরিমানা করার নিয়ম। কিন্তু তা করা হয়নি। ফলে নিরীক্ষাধীন সময়ে করপোরেশন এক কোটি ২৯ লাখ টাকার রাজস্ব খুইয়েছে।

বীমা আইনের ৭২(১) ধারা অনুযায়ী বীমাকারীর ইস্যু করা পলিসির দাবি প্রদানের সব দলিল দাখিলের ৯০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়। এ সময়ের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি না করলে ব্যর্থতার দায়ে ৭২(২) ধারা অনুযায়ী প্রচলিত ব্যাংক রেটের অতিরিক্ত ৫ শতাংশ সুদ মাসিক ভিত্তিতে হিসাব করতে হয়। নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নিরীক্ষাধীন সময়ে ৬৪টি দাবির বিপরীতে মোট ৩০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা কম পরিশোধ করা হয়েছে।

আইনের ২৩ক(২) ধারা অনুযায়ী সব নন-লাইফ বীমা কম্পানির করপোরেশনে পুনর্বীমা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু কিছু কম্পানি তা মানেনি। এ বিষয়ে করপোরেশন কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে তারা শুধু ১১টি কম্পানির সঙ্গে দুই হাজার ২৫৪ কোটি টাকার ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হয় এবং চার কোটি ৫৫ লাখ টাকার নিট প্রিমিয়াম থেকে বঞ্চিত হয়। এসবের মধ্যে গ্রীন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স থেকে চার কোটি ২৩ লাখ টাকা ও রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্স থেকে ৩১ লাখ টাকার নিট প্রিমিয়াম পায়নি করপোরেশন।

নন-লাইফ বীমা কম্পানিগুলো করপোরেশনে ত্রৈমাসিক প্রিমিয়াম তালিকা জমা দিলেও নির্ধারিত সময়ে প্রিমিয়াম জমা দেয় না। অথচ তারা এর বিপরীতে কমিশন, মুনাফা কমিশন, স্লাইডিং কমিশন, এলপিসি, ক্ষতিপূরণ প্রভৃতি সমন্বয়ের সুবিধা ভোগ করে। এর ফলে করপোরেশনের অনাদায়ী প্রিমিয়াম বাড়ছে। এ প্রিমিয়াম আদায়ে করপোরেশনের কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রমাণ পাননি নিরীক্ষকরা।

সাধারণ বীমা করপোরেশন নন-লাইফ ইনস্যুরেন্স কম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিবছর পুনর্বীমা চুক্তি করে এবং ত্রৈমাসিক প্রিমিয়ামের টাকা আদায় করে থাকে। কিন্তু নিরীক্ষাধীন সময়ে ১২৯টি কার্যকরী পলিসি থেকে প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেনি তারা। এর পরিমাণ ১০৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। ফলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪৮টি নন-লাইফ ইনস্যুরেন্স কম্পানির পুনর্বীমা চুক্তিনামা করপোরেশনের কাছে একাধিকবার চেয়েও পায়নি নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান। ফলে এ ব্যাপারে তারা নিরীক্ষা করতে পারেনি। বাংলাদেশ জেনারেল ইনস্যুরেন্সের ইস্যু করা মেরিন হলের একটি পলিসির ইস্যুর তারিখ ও ক্ষতিপূরণ দাবির তারিখ একই। এ বিষয়ে নিরীক্ষকরা জানতে চাইলে করপোরেশন কর্তৃপক্ষ সদুত্তর দিতে পারেনি।

নন-লাইফ ইনস্যুরেন্স কম্পানিগুলো অনেক ক্ষেত্রে পিরিয়ড, পলিসি নম্বর উল্লেখ না করে থোক অর্থ কমিশন হিসেবে সাধারণ বীমা করপোরেশনকে দেয়। এটা হিসাবের জটিলতা তৈরি করে বলে মনে করেন নিরীক্ষকরা। করপোরেশন এ ব্যাপারে ব্যবস্থা না নেওয়ায় বলা যায়, করপোরেশন আদায়যোগ্য প্রিমিয়ামের স্বচ্ছ হিসাব রাখে না। কার্যত নন-লাইফ কম্পানিগুলোকে আউটস্ট্যান্ডিং প্রিমিয়াম অপরিশোধিত রাখতে সহযোগিতা করা হচ্ছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বীমা আইনের বিধান অনুযায়ী সাধারণ বীমা করপোরেশন সব কাগজপত্র পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি করতে পারেনি। দাবির নথিতে প্রাক-জরিপ প্রতিবেদন, বীমাগ্রাহকের প্রাপ্তিস্বীকারের মূল কপি সংরক্ষণ করা হয় না। জরিপ প্রতিবেদন ৬০ দিনের মধ্যে জমা দেওয়ার নিয়ম মানা হয় না। ফলে বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে দেরি হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নন-লাইফ ইনস্যুরেন্স কম্পানিগুলোর দুই কোটি ৭৩ লাখ টাকার মুনাফা কমিশন করপোরেশনের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তারা এ হিসাব মেলানোর জন্য পরে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এক কোটি ৪৫ লাখ টাকার স্লাইডিং কমিশনের কম হিসাব করা হয়েছে। হাইলাইন লিমিটের কারণেও করপোরেশনের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

নিরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রোডাক্ট লেজারের ব্যালান্সের সঙ্গে পার্টি লেজারের ব্যালান্সের পার্থক্য রয়েছে। ত্রৈমাসিক ফ্যাকালটেটিভ হিসাব ও পার্টি লেজারের মধ্যে অনাদায়ী বা আদায়যোগ্য প্রিমিয়ামের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লিখিত অনিয়মের বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সাধারণ বীমা করপোরেশনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা করপোরেশনের কাছে লিখিত জবাব চেয়েছে। ব্যক্তিগত শুনানির সুযোগ নিতে আগ্রহী হলে তাও জানাতে বলা হয়েছে। গত ৩০ নভেম্বর চিঠিত পাঠিয়ে জবাব দেওয়ার জন্য ১৫ কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়। চিঠির অনুলিপি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছেও পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত সাধারণ বীমা করপোরেশন জবাব দেয়নি বলে জানিয়েছেন আইডিআরএর সদস্য সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লা।


মন্তব্য