kalerkantho


জঙ্গিবাদে জড়ালেই চাকরি নেই

আশরাফুল হক রাজীব   

১১ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



জঙ্গিবাদে জড়ালেই চাকরি নেই

কোনো ঘটনা তদন্তের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলে বা তদন্ত বোর্ড গঠিত হলে সেই কর্মকর্তা বা বোর্ডের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলা যাবে না—এমন বিধান সংযোজন করে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৭’-র খসড়া প্রণয়ন করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ বিধিমালা জারি হলে জঙ্গিবাদে জড়ালেই চাকরিচ্যুত করা হবে সরকারি কর্মচারীদের। চাকরিতে পুনর্বহালের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আপিলের যে সুযোগ তাও রহিত করা হচ্ছে জঙ্গিবাদে জড়ানো কর্মচারীদের ক্ষেত্রে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত পাওয়ার পর খসড়াটি অনুমোদনের জন্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনে (পিএসসি) পাঠানো হয়েছে। সাংবিধানিক এ সংস্থার অনুমোদন পাওয়া গেলেই বিধিটির অফিস আদেশ জারি করা হবে।

শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালার খসড়ায় কোথাও ‘জঙ্গিবাদ’ শব্দটি নেই। তার পরও সরকারি কর্মচারীরা জঙ্গিবাদে জড়ালে চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর শাস্তির বিধান কিভাবে সংযোজন করা হচ্ছে, জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব কালের কণ্ঠকে জানান, জঙ্গিবাদ শব্দটি কোথাও নেই, এটা সত্য। কিন্তু জঙ্গিরা কী করে তার উল্লেখ রয়েছে। তারা নাশকতা করে, নিরুদ্দেশ হয়। এসব কাজে জড়ালে চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। নিজে নাশকতা করছেন বা নাশকতামূলক কাজের সঙ্গে লিপ্ত অন্য ব্যক্তির সঙ্গে জড়িত, এমন ব্যক্তিকে চাকরিতে রাখা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীর জন্য চাকরিচ্যুতির বিধান রাখা হয়েছে। নাশকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাঁর বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত শাস্তির বিপক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য অভিযুক্ত কর্মচারীকে এ সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না তাহলে ওই কর্মচারী আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন না।

খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, নাশকতার অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে ছুটি দিয়ে কর্মস্থল ত্যাগের সুযোগ দিতে হবে। তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তা তাকে লিখিতভাবে জানানো হবে। অভিযোগ তদন্তের জন্য তদন্ত বোর্ড গঠন করা হবে। এ কমিটি যে দণ্ডের সুপারিশ করবে তা-ই বাস্তবায়িত হবে। যদি কোনো কারণে এই বিধিমালার মাধ্যমে জঙ্গিবাদে যুক্ত কর্মচারীকে শাস্তি দেওয়া না যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব বলেন, ‘গত বছর রাজধানীর শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক খন্দকার রোকনুদ্দিনের নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনাটি বেশ আলোচিত ছিল। আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি তিনি স্ত্রী-কন্যাসহ সিরিয়া পাড়ি জমিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী নাঈমা আক্তার ঢাকার বাইরের একটি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। স্বাভাবিক নিয়মে কেউ যদি চাকরিতে অনুপস্থিত থাকেন তাহলে তাঁকে শাস্তি দেওয়া বা চাকরিচ্যুত করা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। খসড়া বিধিমালা কার্যকর হলে এ ধরনের বিষয় মীমাংসা করার জন্য বেশি সময় লাগবে না। ’

নতুন বিধিমালাটি আদেশ জারির দিন থেকেই কার্যকর হবে। ভূতাপেক্ষিকভাবে (পেছনের তারিখ থেকে) কার্যকর দেখিয়ে কোনো আদেশ জারির সুযোগ রাখা হয়নি। তবে সরকারি কর্মচারীদের নিরুদ্দেশের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিধিমালার ৪ ও ৮ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘ভূতাপেক্ষিকভাবে কার্যকারিতা দেখাইয়া কোন আদেশ জারি করা যাইবে না; তবে চাকরি হইতে নিরুদ্দেশের ক্ষেত্রে আরোপিত দণ্ড নিরুদ্দেশের তারিখ হইতে কার্যকর হইবে। ’

প্রচলিত বিধিমালার মতো খসড়া বিধিমালায়ও সরকারি কর্মচারীদের জন্য লঘু ও গুরুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। লঘুদণ্ডের মধ্যে তিরস্কার, পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, ক্ষতিপূরণ আদায় এবং বেতন নিচের ধাপে নামিয়ে দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু গুরুদণ্ডের অপরাধে অনেক ক্ষেত্রে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। এসব বিষয় তুলে এনে জাতীয় সংসদ সচিবালয় লঘুদণ্ড আরোপের বিষয়টি স্পষ্ট করার অনুরোধ করেছে। তাদের মতে, কোনো কর্মকর্তা যে পদে বা স্কেলে যোগদান করেছেন সে পদের নিম্ন কোনো পদে বা স্কেলে তাকে নামিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ জানিয়েছে, দুর্নীতির অভিযোগে একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আবার দুর্নীতি দমন কমিশনও ব্যবস্থা নেয়। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীরা দ্বিমুখী হয়রানির শিকার হন। এ দ্বিমুখী হয়রানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা চেয়েছে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ।

সরকারি কর্মচারীদের সাধারণ দক্ষতা বজায় রাখা বা বৃদ্ধির জন্য বিভাগীয় পরীক্ষার বিধান রয়েছে। এ পরীক্ষায় দুই বা ততোধিক বার ফেল করলে বিভাগীয় মামলা বা দণ্ডের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু জাতীয় সংসদ সচিবালয় মনে করে বিভাগীয় পরীক্ষায় অকৃতকার্যের অসংখ্য ঘটনা আছে। কিন্তু এ কারণে কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভাগীয় মামলা বা দণ্ড আরোপের নজির নেই। অথবা নজির থাকলেও তা উল্লেখ করার মতো নয়। প্রয়োজন না হলে বিধিমালার এ অংশটি বাতিল করার সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়।

গুরুদণ্ডের মধ্যে বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অপসারণ ও বরখাস্তকরণের বিধান রয়েছে। তবে নতুন বিধিমালায় গুরুদণ্ড আরোপের ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা বা তদন্ত বোর্ড নিয়োগের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তা বা তদন্ত বোর্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী দ্বিমত পোষণ করলেও নতুন তদন্ত কর্মকর্তা বা তদন্ত বোর্ড নিয়োগ করা হবে না। কেবল তদন্ত কর্মকর্তা বা বোর্ডের কোনো সদস্যের মৃত্যু হলে, কেউ পদত্যাগ করলে, অবসর নিলে বা তদন্ত কর্মকর্তা অসমর্থ হলে তদন্তকারী বা বোর্ড পুনর্গঠন করা যাবে। তবে কর্তৃপক্ষ মনে করলে কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে একই বোর্ডকে পুনঃ তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবে।

তবে এই তদন্ত কর্মকর্তা বা তদন্ত বোর্ড পুনর্গঠনের বিষয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। তাঁরা মনে করেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করার বিধান থাকা উচিত। আদালতের বিচারকাজে বিচারক পরিবর্তনের বিধান থাকলে তদন্ত কর্মকর্তা কেন পরিবর্তনযোগ্য নয়—এ প্রশ্ন তাঁরা তুলেছেন। এ ব্যাপারে লিখিত আপত্তি দিয়েছে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ। তারা বলেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তির লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ যুক্তিযুক্ত মনে করলে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের বিধান থাকা উচিত।

অভিযুক্ত ব্যক্তির ঠিকানায় নোটিশ পৌঁছানোর বিষয়েও নতুন সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বিধিমালায়। বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার পাশাপাশি ই-মেইলেও নোটিশ পাঠানো যাবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানায় না পাওয়া গেলে ই-মেইলে পাঠানো নোটিশও যথাযথভাবে জারি করা হয়েছে বলে গণ্য করা হবে।

নতুন বিধিমালায় অসদাচরণ অংশে পারিবারিক নির্যাতন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা যাবে না—বিষয়টি উল্লেখ করে প্রস্তাব পাঠিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেই প্রস্তাব আমলে নেওয়া হয়নি।

খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে সরকারি কর্মচারীকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া যাবে। সিভিল সার্জনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে মেডিক্যাল বোর্ডের কাছে পরীক্ষার জন্য উপস্থিত হতে অস্বীকার করলে তা অপরাধ হিসেবে নেওয়া হবে। এ ধরনের ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মামলা করা হবে।


মন্তব্য