kalerkantho


ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স রিটের পূর্ণ রায়

সচিবের সমমর্যাদায় জেলা জজ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সচিবের সমমর্যাদায় জেলা জজ

রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা তালিকার (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) বিষয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, তালিকার ৩ নম্বরে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সমমর্যাদায় প্রধান বিচারপতি থাকবেন। জেলা জজদের ২৪ নম্বরের বদলে ১৬ নম্বরে সচিবদের সমমর্যাদায় রাখতে বলা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের ১২ নম্বরে মন্ত্রিপরিষদসচিবের সমমর্যাদায় রাখতে হয়েছে।

এ রায় কার্যকর করতে সরকারকে আইন প্রণয়ন করতেও বলেছেন সর্বোচ্চ আদালত। জেলা জজদের পদমর্যাদাক্রম নিয়ে করা এক রিট মামলায় এ রায় দেন আপিল বিভাগ।

রায়ে তিন দফা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সাংবিধানিক পদধারীদের নাম থাকবে তালিকার ওপরের দিকে। জেলা জজরা ১৬ নম্বরে ও অতিরিক্ত জেলা জজরা ১৭ নম্বরে থাকবেন। রায়ে মোট ১০টি পদের অবস্থানে রদবদল করতে বলা হয়েছে। এসবের মধ্যে জেলা জজ ও অতিরিক্ত জেলা জজের বিষয়টি নির্দেশনামূলক। প্রধান বিচারপতিসহ অন্য আটটি পদের বিষয়ে আপিল বিভাগ অভিমত দিয়েছেন।

রায়ে বলা হয়, নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ (জাতীয় সংসদ) ও বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ। এ তিন অঙ্গের প্রধানরা হলেন যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতি। তাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাই ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মর্যাদার প্রতিফলন ঘটে। রায়ে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা তালিকা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধান বিচারপতি : রায়ে প্রধান বিচারপতিকে পদমর্যাদা তালিকায় জাতীয় সংসদের স্পিকারের সমমর্যাদায় রাখতে বলা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে এ দুটি পদ একসঙ্গে ৪ নম্বরে ছিল। সে সময় ২ নম্বরে ভাইস প্রেসিডেন্টের ও ৩ নম্বরে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছিল। পরে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ উঠে যাওয়ায় ২ নম্বরে প্রধানমন্ত্রীকে নেওয়া হয়েছে, ৩ নম্বরে স্পিকারকে নেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতিকে ৪ নম্বরে রেখে তাঁর মর্যাদার অবনমন করা হয়েছে। তাই প্রধান বিচারপতির পদকে স্পিকারের পদের সঙ্গে রাখতে বলা

 হয়েছে।

আপিল বিভাগের বিচারপতিকে তালিকার ৭ নম্বরে এবং হাইকোর্টের বিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে ৮ নম্বরে রাখতে বলা হয়েছে। ১২ নম্বরে সংসদ সদস্য, কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেল ও ন্যায়পাল এবং ১৫ নম্বরে পিএসসি চেয়ারম্যানকে রাখতে বলা হয়েছে। এ ক্রমেই সরকার আইন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে রায়ের অভিমতে। বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি ও প্রতিমন্ত্রী ৮ নম্বরে, সংসদ সদস্য ১৩ নম্বরে, অ্যাটর্নি জেনারেল, কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেল এবং ন্যায়পালকে ১৫ নম্বরে রাখা হয়েছে।

জেলা জজ

জেলা জজদের ১৬ নম্বরে রাখার যুক্তি হিসেবে আদালত বলেছেন, ‘হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, বর্তমান ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী হাইকোর্টের বিচারপতিদের অবস্থান ৯ নম্বরে। আর জেলা জজদের রাখা হয়েছে ২৪ নম্বরে। কিন্তু একজন জেলা জজকে যখন সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ করা হয় তখন তাঁর পদক্রম হচ্ছে ৯ নম্বরে। এভাবে সংবিধানে উল্লিখিত জেলা জজদের রাখাটা অবমাননামূলক।’ হাইকোর্ট বিভাগ যথাযথভাবে বিষয়টি চিহ্নিত করেছেন।

রায়ে বলা হয়, জেলা জজ পদটি জুডিশিয়াল সার্ভিসের সর্বোচ্চ পদ। একজন বিচারক ২০ বছরের আগে এ পদে আসীন হতে পারেন না। তবে তাঁদের পদক্রম প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধানদের ওপরে হতে পারে না। তাঁদের সচিবদের সমমর্যাদায় রাখতে হবে। বিচার বিভাগের এ পদ সাংবিধানিক পদ নয়। তবে এ পদ প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী বিভাগের পদের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির।

রায়ে বলা হয়, সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের সুবিধা দিতে ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম এবং গাড়িসেবা নগদায়ন নীতিমালা ২০১৪ (সংশোধিত)’ জারি করা হয়। এর ফলে গাড়ি কেনার জন্য উল্লিখিত মর্যাদার একজন কর্মকর্তা ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জ্বালানি খরচ পাবেন। কিন্তু জুডিশিয়াল সার্ভিসের সর্বোচ্চ পদে থাকা জেলা জজরা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা তালিকার কারণেই এটা হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তন আবশ্যক।

অ্যাটর্নি জেনারেল

রায়ে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশ ভারতের পদক্রম তালিকায় অ্যাটর্নি জেনারেলকে তিন বাহিনীপ্রধানের (জেনারেল র্যাংকধারী) ওপরে মন্ত্রিপরিষদসচিবের সঙ্গে রাখা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় এ পদকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদের ওপরে রাখা হয়েছে। তাই হাইকোর্ট অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ ওপরে রাখতে যে রায় দিয়েছেন তা যুক্তিযুক্ত।

রায়ে তিন দফা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, (১) সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। সেহেতু রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমের শুরুতেই সাংবিধানিক পদাধিকারীদের গুরুত্ব অনুসারে রাখতে হবে। (২) জেলা জজ ও সমমর্যাদার বিচার বিভাগীয় সদস্যরা রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমের ২৪ নম্বর থেকে ১৬ নম্বরে সরকারের সচিবদের সমমর্যাদায় উন্নীত হবেন। জুডিশিয়াল সার্ভিসের সর্বোচ্চ পদ জেলা জজ। অন্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে সচিবরা রয়েছেন। (৩) অতিরিক্ত জেলা জজ ও সমমর্যাদার বিচার বিভাগীয় সদস্যদের অবস্থান হবে জেলা জজদের পরেই, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা তালিকার ১৭ নম্বরে।

বেসামরিক পদকধারী

রায়ে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশের পদমর্যাদা তালিকায় বেসামরিক পদকধারীদের রাখা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সে ব্যবস্থা করা হয়নি। তাই আশা করা যায়, বেসামরিক পদকধারী (যেমন একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক; মুক্তিযোদ্ধা যাঁরা বীর-উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত) ব্যক্তিদের পদমর্যাদা তালিকায় রাখা হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে করা ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে নিম্ন আদালতের বিচারকদের রাখা হয় সচিবদের নিচে। ২০০৬ সালে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে নিম্ন আদালতের বিচারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে তৎকালীন মহাসচিব মো. আতাউর রহমান (বর্তমানে জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ, শরীয়তপুর) হাইকোর্টে রিট করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০০৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট জেলা জজদের মর্যাদা সচিবদের নিচে দেখানো কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। এ রুলের ওপর শুনানি শেষে ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট ১৯৮৬ সালের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন। পাশাপাশি নিম্ন আদালতের বিচারকদের পদমর্যাদাক্রম ঠিক করে নতুন ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স তৈরিসহ আট দফা নির্দেশনা দেন।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে আপিল করে সরকার। এর ওপর শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ৬ জানুয়ারি সংক্ষিপ্ত রায় দেন আপিল বিভাগ। রায় নিয়ে কথা ওঠায় ওই দিনই প্রত্যাহার করা হয় এবং পরদিন আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় অধিকতর শুনানির জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শুনানি শেষে ১১ জানুয়ারি রায় দেন আপিল বিভাগ।

আপিল বিভাগের শুনানিতে রিটকারীর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও মো. আসাদুজ্জামান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন বিশেষ আইনজীবী আব্দুর রব চৌধুরী।

রায়ের পর মো. আসাদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, এর মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন সরকারকে আপিল বিভাগের নির্দেশনার আলোকে আইন করতে হবে। নতুন ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, ‘নতুন তালিকায় জেলা জজরা সচিবদের সমমর্যাদায় থাকবেন। তবে তাঁদের নাম আগে থাকবে বলে মনে করি।’

রিট আবেদনকারী মো. আতাউর রহমান বলেছিলেন, এ রায় ঐতিহাসিক। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা তাঁদের মর্যাদা ফিরে পেয়েছেন।



মন্তব্য