kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের ডিজি

আশুলিয়ায় নিহত আব্দুর রহমানই নব্য জেএমবির আমির

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আশুলিয়ায় নিহত আব্দুর রহমানই নব্য জেএমবির আমির

আশুলিয়ায় র‌্যাবের অভিযানের সময় পাঁচতলা থেকে পড়ে নিহত আব্দুর রহমানের প্রকৃত নাম সারোয়ার জাহান। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে।

তাঁর সাংগঠনিক নাম ছিল শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। নব্য জেএমবি গঠন করে এ নামে তিনি আমিরের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তিনিই ছিলেন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কথিত বাংলাদেশ প্রধান। তাঁর নির্দেশেই নব্য জেএমবির সদস্যরা সাম্প্রতি বিভিন্ন হামলা ও গুপ্ত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। গতকাল শুক্রবার র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ এ দাবি করেছেন।

সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিএসইসি ভবনে র‌্যাবের নতুন মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে র‌্যাব মহাপরিচালক আরো বলেন, নব্য জেএমবির শুরা কমিটির তিন সদস্য ও মধ্যম পর্যায়ের ২১ সদস্য এখনো অধরা রয়েছে। তবে এই মুহূর্তে তাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই। সর্বশেষ তাদের হাতে থাকা একে-২২ রাইফেলটিও গাজীপুরের হাড়িনাল থেকে জব্দ করা হয়েছে। তবে শায়খ আবু ইব্রাহিমের মৃত্যুর এ মুহূর্তে নব্য জেএমবির প্রধান কে, তা জানা যায়নি। গত বৃহস্পতিবারই নব্য জেএমবির দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা আব্দুর রহমানের ঘনিষ্ঠ ছিল।

র‌্যাবের মহাপরিচালক বলেন, আশুলিয়ায় আব্দুর রহমানের আস্তানা থেকে একাধিক চিঠি জব্দ করা হয়েছে; ই-মেইল ও খুদে বার্তাও আছে। কয়েকটি চিঠিতে আব্দুর রহমান নিজেকে শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ পরিচয় দিয়ে সই করেছেন। এ ছাড়া নব্য জেএমবির আমির হিসেবে তাঁর কাছ থেকে জঙ্গিবাদে ব্যবহৃত অর্থ লেনদেনের কিছু হিসাবও পাওয়া গেছে। এসব নথিপত্র পর্যালোচনা করেই র‌্যাব নিশ্চিত হয়েছে, আব্দুর রহমানই আসলে আবু ইব্রাহিম ।

ব্রিফিংয়ে বেনজীর আহমেদ বলেন, আশুলিয়ার আস্তানা থেকে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও চাকরিতে ব্যবহৃত পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন কাগজপত্র জব্দ করা হয়। প্রকৃত নাম সারোয়ার হলেও আব্দুর রহমানের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাম ব্যবহার করতেন। তার মধ্যে রয়েছে মোক্তার, নাজমুল ইসলাম, আব্দুর রহমান, শায়খ আসিম আজওয়াদ, শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ।

র‌্যাব মহাপরিচালক জানান, গত এপ্রিলে আইএসের মুখপত্র ‘দাবিক’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে আবু ইব্রাহিমকে আইএসের বাংলাদেশ প্রধান বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। আশুলিয়ার আস্তানা থেকে নব্য জেএমবির সাংগঠনিক ঘোষণাপত্রও জব্দ করেছে র‌্যাব। তা দেখিয়ে ব্রিফিংয়ে বেনজীর আহমেদ দাবি করেন, ঘোষণাপত্রে নব্য জেএমবির আবু ইব্রাহিম আল হানিফের সঙ্গে শেখ আবু দোজানা নামে আরেকজনের সই আছে। আবু দোজানা ওরফে আবু মুজুনাই হলো নারায়ণগঞ্জের অভিযানে নিহত তামিম চৌধুরী, যাকে এত দিন নব্য জেএমবির সমন্বয়ক বলা হচ্ছিল। নারায়ণগঞ্জে অভিযানে নিহত হওয়ার আগে আবু ইউসুফের সঙ্গে তামিম চৌধুরীর মোবাইল অ্যাপসে কথা হয়েছিল।

গতকাল সেসব কথোপকথনের নমুনাও সাংবাদিকের সামনে তুলে ধরা হয়।

৩৩ জন সদস্য নিয়ে নব্য জেএমবির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল দাবি করে র‌্যাবের মহাপরিচালক বলেন, আবু ইব্রাহিমের নেতৃত্বেই নব্য জেএমবি গঠিত হয়। এর মধ্যে পাঁচজন শুরা কমিটির সদস্য ছিল। র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানে দুই শুরা সদস্যসহ ১২ জন নিহত হয়েছে। বর্তমানে তিনজন শুরা সদস্যসহ ২১ জন অধরা রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।

আবু হানিফের নির্দেশেই নব্য জেএমবির সব হামলা হত্যা : গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো র‌্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত বছরের ৩০ আগস্ট চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে আওয়ামী লীগ নেতা ইমরানকে গুলি করে ৬০ লাখ টাকা ছিনতাই করে নেয় নব্য জেএমবির সদস্যরা। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের বাংলাবাজারে তারা ন্যাংটা বাবা ও তাঁর এক সহযোগীকে হত্যা করে। এ দুটি অপারেশনের পর আবদুর রহমানকে নব্য জেএমবির শুরা সদস্যরা বাংলাদেশের নব্য জেএমবিতে বায়াত দেওয়ার জন্য অনুমতি দেয়। পরে আবদুর রহমানের নির্দেশে নব্য জেএমবির সদস্যরা বিদেশি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলার পরিকল্পনা করে। বিশেষ করে রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারায় বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ব্লগারদের ওপরও হামলার পরিকল্পনা করে তারা।

গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো র‌্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আবদুর রহমানের নির্দেশে নব্য জেএমবির সদস্যরা গুলশানে ইতালির নাগরিক সিজারে তাভেল্লা, রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি ও রাজধানীর গাবতলীতে দারুস সালাম থানার এএসআই ইব্রাহিম মোল্লাকে হত্যা করে। দিনাজপুরে খ্রিস্টান ধর্মযাজক ইতালির নাগরিক পিয়েরো পারোলারিকেও হত্যার চেষ্টা করে তারা। এ ছাড়া গত বছর পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে বোমা হামলা, নন্দনপার্কে শিল্প পুলিশ সদস্য মুকুল হোসেন হত্যা, বগুড়ার শিবগঞ্জে শিয়া মসজিদে হামলা, চলতি বছর পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে পুরোহিত যজ্ঞেশ্বরকে হত্যা, ২৫ মে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে ব্যবসায়ী দেবেশ চন্দ্র প্রামাণিককে হত্যা, ৫ জুন নাটোরের বনপাড়ায় খ্রিস্টানপল্লীতে সুনীল গোমেজকে হত্যা, ৭ জুন ঝিনাইদহের মহিষডাঙ্গা গ্রামে পুরোহিত আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলীকে হত্যা, পাবনার হেমায়েতপুরে খ্রিস্টান ধর্মযাজক নিত্যরঞ্জন পাণ্ডেকে হত্যা, ১৫ জুন মাদারীপুরে কলেজ শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীর ওপর হামলা, ১ জুলাই ঝিনাইদহে সেবায়েত শ্যামানন্দ দাসকে হত্যা, গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা ও হত্যা এবং ৭ জুলাই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদগাহ মাঠে হামলার ঘটনাও আবদুর রহমানের নির্দেশনা ও পরিকল্পনাতে ঘটেছে।

পরিচয় : গত ৮ অক্টোবর বিকেলে আশুলিয়ায় একটি বাড়িতে অভিযান চালানোর সময় পাঁচ তলার গ্রিল কেটে লাফিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে আবদুর রহমান। ওই সময় সে গুরুতর আহত হয়। তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব সদস্যরা সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর তার পরিচয় নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। ওই সময় র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, নিহত ব্যক্তির নাম আবদুর রহমান আয়নাল। সে নব্য জেএমবির প্রধান অর্থ জোগানদাতা। এরপর ওই আস্তানা থেকে ন্যাশনাল আইডি কার্ড ও তার পাসপোর্ট পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়।

গতকাল ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, আবদুর রহমানের বাবার নাম আবদুল মান্নান। মায়ের নাম সালেহা খাতুন। প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল আবদুর রহমান। তাকে আশুলিয়া থেকে গ্রেপ্তারের দিন তার দ্বিতীয় স্ত্রী শাহনাজ আক্তার রুমিকে (২৮) গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়।  

র‌্যাবের মহাপরিচালক বলেন, “আবদুর রহমান ১৯৯৮ সালে বাড়ি ছেড়ে নাচোলে একটি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। সেখান  থেকেই ‘দাওরা’ পাস করে। এরপর সে জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে। ২০০৩ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে একদল জঙ্গি পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তিনটি অস্ত্র লুট করে। পরে এ ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করে। সেই সময় তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। ৯ মাস চার দিন কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পায় সে। এরপর দেড় মাস বাড়িতে থেকে ফের আত্মগোপনে চলে যায়। আমরা জানতে পেরেছি, ২০০৩ থেকে ২০১৬—এ ১৩ বছর সে জঙ্গি জীবন যাপন করে। ” 

একাধিক চিঠি, ই-মেইল ও এসএমএস পরীক্ষা করা হয়েছে জানিয়ে বেনজীর আহমেদ বলেন, নব্য জেএমবির দায়িত্ব নেওয়ার পর আবদুর রহমান ৯টি চিঠি গ্রহণ ও ১০টি চিঠি বিতরণ করেছে। সেগুলোতে আবু ইব্রাহিম আল হানিফ নামে সই করেছে সে। নব্য জেএমবির নিহত সদস্যদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার কাজও করত সে।  

নব্য জেএমবির আরো দুজন গ্রেপ্তার : গত বৃহস্পতিবার আবদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নাফিস আহমেদ নয়ন (২৮) ও হাসিবুল হাসানকে (৪৮) রাজধানীর মতিঝিল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে ২৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে। এর আগে গত ৮ অক্টোবর আবদুর রহমানের আশুলিয়ার আস্তানা থেকে ৩০ লাখ টাকা, গুলিভর্তি একটি বিদেশি পিস্তল, মোবাইল জ্যামার, ধারালো ছুরি, চাপাতি, জিহাদি বই ও কম্পিউটার জব্দ করা হয়। হাসিবুল রাজশাহী গণপূর্ত অধিদপ্তরের  একজন প্রকৌশলী। তার বাড়ি গোপালগঞ্জের সদর উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামে। নয়নের বাড়ি রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায়। র‌্যাবের দাবি, এ দুজন নব্য জেএমবির অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ছিল।

 


মন্তব্য