kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মুশফিকের আউটেই যত আফসোস

►সংক্ষিপ্ত স্কোর (দ্বিতীয় দিন শেষে)
► ইংল্যান্ড : ১০৫.৫ ওভারে ২৯৩
► বাংলাদেশ : ৭৪ ওভারে ২২১/৫

নোমান মোহাম্মদ, চট্টগ্রাম থেকে   

২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মুশফিকের আউটেই যত আফসোস

দিনভর উত্তাপ ছড়িয়ে সূর্য ততক্ষণে ক্লান্ত। কিন্তু বেন স্টোকস যেন ক্লান্তিহীন যোদ্ধা।

প্রচণ্ড গরমে ৭১ ওভার ফিল্ডিং করেও শেষ বিকেলে আরেক উইকেটের নেশায় বল হাতে ঝরান আগুন। কাঠঠোকরার মতো উইকেটে বল ঠুকে যান ক্রমাগত। ওভারের প্রথম বল বাউন্সার। বল বেরিয়ে যায় মুশফিকুর রহিমের মুখ বরাবর। পরের বল ব্যাটের কোনা ঘেঁষে। কিন্তু পরেরটিতে আর তা হয় না। বলে হালকা চুম্বন লাগে ব্যাটের। গ্লাভস হাতে জনি বেয়ারস্টোর তা মুঠোবন্দি করতে অসুবিধা হয় না।

গ্যালারিতে নেমে আসে পিনপতন স্তব্ধতা। স্বাগতিক ড্রেসিংরুমে ওড়াউড়ি করে অবিশ্বাসের প্রজাপতি। এক দিনে তিন দফায় চার-চারবার এমন হবে! প্রতি বিরতিতে যাওয়ার সময়ই উইকেট হারাবে বাংলাদেশ!

শুরুটা লাঞ্চের আগে আগে। ইংল্যান্ডকে প্রত্যাশামতো ৩০০-র নিচে আটকে রাখা গেছে। দিনের একেবারে প্রথম বলে তাইজুল ইসলামের উইকেট, পরে আরো এক শিকারে যেন আগের দিনের পরিশ্রমের পুরস্কার পান এই বাঁহাতি স্পিনার। এরপর ওই আগের দিনের নায়ক মেহেদী হাসানের কীর্তির পরিধি আরেকটু বিশাল করার পালা। স্টুয়ার্ট ব্রডকে আউট করে ইংল্যান্ডের ইনিংস কেবল মুড়িয়ে দেননি; তাতে রেকর্ড বইয়ের একটি পাতায় সোহাগ গাজীর পরই ঢুকে যান। বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট অভিষেকে ইনিংসসেরা বোলিংয়ে সোহাগের ৭৪ রানে ৬ উইকেটের পরই এখন মেহেদীর এই ৮০ রানে ৬ শিকার।

এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। ২৯৩-এর জবাব দিতে নেমে তামিম ইকবাল, ইমরুল কায়েসের ওপেনিং জুটিও। রয়েসয়ে ২৯ রান যোগ করেন দুজন। লাঞ্চের আগের শেষ ওভারে বোলিংয়ে আসেন মঈন আলী। তাঁর দ্বিতীয় বলেই বোল্ড ইমরুল (২১)। উইকেটে এলেন ৫৬ ব্যাটিং গড়ের টেস্ট স্পেশালিস্ট মমিনুল হক। তৃতীয় বলে আউট তিনিও! চার বলের মধ্যে ২ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ যায় লাঞ্চে। স্বস্তির আবহে অস্বস্তির হুল ফুটিয়ে।

এখানেই কি শেষ? চা বিরতির ঠিক আগে আগেও তো উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। এবার দারুণ খেলতে থাকা মাহমুদ উল্লাহর (৩৮) হন্তারক আদিল রশিদ। তাঁর লেগ স্পিনে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে আসেন বাংলাদেশের ভরসা। আবারও ওভারের মাঝপথেই দুই দলকে বিরতিতে পাঠান আম্পায়াররা।

খারাপ সময় নাকি অভিশপ্তের মতো পিছু ধাওয়া করে বারবার—এই আপ্তবাক্য কাল সত্যি হয়ে যায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। লাঞ্চের আগে যা হয়, চা বিরতির আগে এর পুনরাবৃত্তি; আবার খেলা শেষ হওয়ার ঠিক আগে আগেও ওই বেদনাবিধুর নাটকের পুনর্মঞ্চায়ন। এবার না হয় একেবারে শেষ ওভারে নয়; কিন্তু ততক্ষণে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে খেলা গড়িয়েছে বাড়তি সময়ে। আলো কমায় জ্বলে উঠেছে ফ্লাডলাইট। মোটে বাকি তিন ওভার। তখনই মুশফিকের আউটে তৃতীয় দফায় বজ্রপাত। ‘কালের আবার কালাকাল’—বাংলা এই বাগধারা কাল চট্টগ্রামের ক্রিকেট ময়দানে তাই ভুল হিসেবে প্রমাণিত। কারণ বাংলাদেশের চার-চারজন ব্যাটসম্যানের মৃত্যুঘণ্টা বেজেছে যে সময় মেনেই! বিরতির ঠিক আগে আগে। কী বলবেন!

কাল বাংলাদেশের ৫ উইকেটের মধ্যে একমাত্র তামিম ইকবালই ওই অভিশাপের খাঁড়ায় পড়েননি। কিন্তু দিনশেষের সংবাদ সম্মেলনে এসে এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেন না তিনি, ‘এটি মানসিকতার ব্যাপার না। তবে লাঞ্চের আগে, চা বিরতির আগে, আবার খেলা শেষ হওয়ার আগে আগে আমাদের উইকেট পড়ল। এটার ব্যাখ্যা কিভাবে দেব, তা বুঝতে পারছি না। এমন হয়ে গেলে কিছু করার নেই। তবে তা যদি না হতো, তাহলে আমরা আরো ভালো অবস্থানে থাকতে পারতাম। বিশেষ করে মুশফিক যদি আউট না হতো। ’ দারুণ খেলে ৪৮ রান করার পর মুশফিকের আউটটিই আসলে ম্যাচের পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে পুরোপুরি। নইলে ৬ উইকেট হাতে নিয়ে ভীষণ শক্তিশালী অবস্থানে থেকে আজ তৃতীয় দিনের খেলা শুরু করতে পারত বাংলাদেশ। এখন ২২১ রানে ৫ উইকেট হারানোয় পিছিয়ে আছে ৭২ রানে। উইকেটে অবশ্য ৩১ রান করা সাকিব আল হাসান রয়েছেন। ড্রেসিংরুমে সাব্বির রহমান, মেহেদী হাসানরাও। ইংল্যান্ডের রান পেরিয়ে যদি প্রথম ইনিংসে মোটামুটি লিড নিতে পারে স্বাগতিকরা, তাহলে টেস্টের লাগাম থাকবে বাংলাদেশের হাতেই।

সেটি আরো বেশি করে চট্টগ্রামের উইকেটের কারণে। যেখানে তামিমের মতো ডাকাবুকো ব্যাটসম্যানকেও খোলসবন্দি হয়ে থাকতে হয়। ১৭৯ বল খেলে করতে হয় ৭৮ রান। আবার দুর্দান্ত ওই ইনিংসের সমাপ্তি সেঞ্চুরিতে না হওয়াতেও আক্ষেপ করেন না। ‘পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা’র মতো ৭৮ রানই তাঁর কাছে মনে হয় ঢের। ২২১ মিনিট ক্রিজে কাটানো এই ব্যাটসম্যানের চেয়ে তো মাঠের চৌকো ২২ গজ কারো ভালো চেনার কথা না। সে সূত্র ধরেই দিনশেষে তামিম বলে যান, ‘উইকেটের বিষয়ে সঠিক মূল্যায়ন করতে হলে বলব, এখানে কেউ সেট নয়। আপনি ৭০, ৮০ কিংবা ১০০ করেন—তাহলেও কেউ সেট না। যদি কেউ মনে করে সে সেট, সমস্যা তৈরি হবে। কারণ প্রতি ওভারে একটা-দুটো বলে কিছু না কিছু হচ্ছে। এটি যে কঠিন উইকেট, সবাই বুঝতে পারছে। ’

সেই কঠিন উইকেটেও অসাধারণ একটি দিন পার করার পথে ছিল বাংলাদেশ। শুধু যদি অভিশপ্তের মতো বিরতির আগের সেই উইকেটগুলো না পড়ত! অন্যগুলো না হয় বাদই দিন, শুধু যদি মুশফিক ওভাবে আউট না হতেন! চট্টগ্রামের আকাশের শেষ বিকেলের লালিমা তখন বাংলাদেশের কাছে মনে হতো প্রকৃতির ফুলেল অভিনন্দন!


মন্তব্য