kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রিজার্ভের অর্থ চুরি

আসামি করা হচ্ছে দুই দেশের ২৩ জুয়াড়িকে

ওমর ফারুক   

২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আসামি করা হচ্ছে দুই দেশের ২৩ জুয়াড়িকে

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির সঙ্গে দুই দেশের ২৩ জুয়াড়ি, ফিলিপাইনের ৩০ জন ব্যাংকার ও ভুয়া ব্যাংক হিসাবধারীকে চিহ্নিত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ চক্রের সঙ্গে বেশ আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ জনেরও বেশি কর্মকর্তার।

তদন্ত গুছিয়ে এনে রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিগগির অভিযোগপত্র দেবে সিআইডি। তাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিদেশি জুয়াড়িদের আসামি করা হবে। তবে ফিলিপাইনের ব্যাংকার ও ভুয়া ব্যাংক হিসাবধারীদের সবাইকে আসামি করা হবে না। কয়েকজনকে মামলায় সাক্ষীও করা হবে। বিদেশি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা নেবে বাংলাদেশ। ইন্টারপোলও ইতিমধ্যে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশকে সহায়তা করা শুরু করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় গত ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা হয়। সিআইডি সেই মামলার তদন্ত করছে। মামলায় এখনো অভিযোগপত্র দেয়নি সিআইডি। গ্রেপ্তারও করা হয়নি কাউকে।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক (ফেড) অব নিউ ইয়র্কের অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের প্রায় ২০০ কোটি ডলার হ্যাক হয়। এর মধ্যে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার ছাড় করে ফেড। এর মধ্যে ফিলিপাইনে যায় আট কোটি ১০ লাখ ডলার। শ্রীলঙ্কায় যায় দুই কোটি ডলার। আদালতের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ফিলিপাইন থেকে বাংলাদেশ ফেরত পেয়েছে এক কোটি ৫২ লাখ ডলার। বাকি অর্থ আদায়ে ফিলিপাইনের রেমিট্যান্স সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফিলরেম ও জুয়াড়ি প্রতিষ্ঠান সোলায়ারের বিরুদ্ধে সে দেশের আদালতে মামলার প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ।

সিআইডির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান. রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত বিদেশি জুয়াড়িদের শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হংকং, ম্যাকাও ও ফিলিপাইনের নাগরিক। এ ছাড়া জড়িত বিদেশি ব্যাংকার ও ভুয়া ব্যাংক হিসাবধারীদেরও চিহ্নিত করা হয়েছে। জড়িতদের তালিকা সংশ্লিষ্ট দেশেও পাঠানো হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে ওই সব দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ইন্টারপোল প্রতিনিধিদের নিয়ে সমন্বয় সভা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, রিজার্ভ চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিদেশিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে গত ৪ থেকে ৬ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে সভা হয়েছে। তাতে বাংলাদেশের পক্ষে সিআইডির ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের কমান্ড্যান্ট মো. শাহ আলম ও সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হান উদ্দিন খান অংশ নেন। তাঁদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের দুজন কর্মকর্তাও ছিলেন।  

এ প্রসঙ্গে সিআইডি কর্মকর্তা মো. শাহ আলম কালের কণ্ঠকে জানান, ‘রিজার্ভ চুরি ও চুরির অর্থ স্থানান্তরের ঘটনায় ছয় দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিঙ্গাপুরে আমাদের সভা হয়েছে। আরো দুটি দেশের প্রতিনিধিরা টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে সভায় অংশ নেন। রিজার্ভ চুরির মামলার বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্তদের গ্রেপ্তারে আমরা দেশগুলোর সহযোগিতা চেয়েছি। তারা আমাদের সহযোগিতা করছে। ’

এর আগেও এসব দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুটি সভার তথ্য উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, পরের সভাটি ঢাকায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে জন্য সিআইডি কাজ করছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সম্পৃক্ত সন্দেহে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ জনেরও বেশি কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁরা দাবি করেছেন, না বুঝে এমন ভুল কাজ করেছেন তাঁরা। তবে সিআইডির কর্মকর্তারা অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছেন ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকের পাঁচটি অ্যাকাউন্টে চুরির অর্থ গেছে। ওই ব্যাংকের কর্মকর্তা ও হিসাবধারীদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল। এ ছাড়া চুরি হওয়া রিজার্ভ রিজাল ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে যেসব জুয়াড়ির কাছে গেছে, তাদের সঙ্গেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা বেশ আগে থেকেই যোগাযোগ রাখছিলেন।

এর আগে সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের তদন্ত কমিটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা রিজার্ভ চুরির ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁদের একজন সুইফটের ভুয়া প্রতিনিধিকে পাসওয়ার্ড দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরো বেশি কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পেয়েছে কমিটি। যদিও সরকার প্রতিবেদনটি এখনো প্রকাশ করেনি।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। পরে তা না করে বলেছেন, রিজার্ভ চুরির বাকি অর্থ উদ্ধারের পর প্রতিবেদন প্রকাশ করবে সরকার।

সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সিআইডির তদন্তে এ পর্যন্ত ফিলিপাইনের ৩০ জনকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। তারা সবাই ফিলিপাইনের বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা ও ভুয়া হিসাবধারী। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে রিজার্ভ চুরির মামলায় সাক্ষী করা হবে। বাকিদের আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। সিঙ্গাপুরের বৈঠকে চিহ্নিত হওয়া এসব ব্যক্তির মধ্য থেকে কয়েকজনকে আসামি আর হবে, কয়েকজনকে সাক্ষী করা হবে, তা নিয়ে আট দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে হংকং, ম্যাকাও ও ফিলিপাইনের ২৩ জন জুয়াড়িকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের সবাইকে এ মামলায় আসামি করা হবে। অবশ্য ইতিমধ্যে তাদের মধ্যে কয়েকজন নিজেদের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পালিয়েছে বলেও ওই বৈঠকে নিশ্চিত হয়েছে সিআইডি।

বাকিরা যাতে পালাতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশ কর্মকর্তাদের অনুরোধ করা হয়েছে। সব দেশের পুলিশের কর্মকর্তা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে একমত হয়ে বলেছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সিঙ্গাপুরের বৈঠকে ইন্টারপোলের সদস্যরাও ছিলেন। তাঁরা রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত বিদেশিদের গ্রেপ্তারে সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভের অর্থ চুরি হওয়ার পর গত ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে মুদ্রাপাচার প্রতিরোধ ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মতিঝিল থানায় মামলা করেন। সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিগগির মামলার অভিযোগপত্র দেবেন তাঁরা।


মন্তব্য