kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আওয়ামী লীগের কাউন্সিল আজ শুরু

থাকছে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির আহ্বান

তৈমুর ফারুক তুষার   

২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



থাকছে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির আহ্বান

আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নৌকায় নির্মিত বিশাল মঞ্চ। ছবি : শেখ হাসান

‘উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছি দুর্বার, এখন সময় বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার’—এই স্লোগান নিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন হচ্ছে আজ শনিবার। দুই দিনব্যাপী জাঁকজমকপূর্ণ এ সম্মেলনে দলের নেতাকর্মীদের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জোরালো প্রস্তুতি শুরু করার নির্দেশনা দেওয়া হবে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভাষণে এমন নির্দেশনা দেবেন বলে দলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আগামী জাতীয় নির্বাচনে তৃণমূলের মতামত নিয়েই দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে সম্মেলনে ঘোষণা দিতে পারেন দলীয় প্রধান। সেই সঙ্গে তিনি সবাইকে মিলেমিশে কাজ করে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে বিজয়ী করার আহ্বান জানাবেন। জনগণের পাশে থেকে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে তাদের মন জয় করার পরামর্শও তিনি দেবেন তৃণমূল নেতাকর্মীদের।

২০তম জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্বে কারা আসবেন, তা নিয়ে গতকাল শুক্রবারও নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা আলোচনা ছিল। বিশেষ করে দলের সাধারণ সম্পাদক কে হবেন তা নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন শোনা যায়। দলের একটি অংশের মতে, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদেরই এবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন। তবে অন্য একটি অংশের মতে, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামই শেষ পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক পদে তৃতীয়বারের মতো আসীন হবেন।

সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে ওবায়দুল কাদের গতকাল সকালে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আকাশে চাঁদ উঠলে সবাই দেখতে পাবে। ’ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলন উপলক্ষে গঠিত স্বেচ্ছাসেবক ও শৃঙ্খলা উপপরিষদের এক সভা শেষে তিনি এ কথা বলেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি থেকে দূরে থাকা তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ এবার সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে যুক্ত হতে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে সোহেল তাজকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দীর্ঘ বক্তব্য দেবেন। ওই বক্তব্য লিখিত আকারে কাউন্সিলর, ডেলিগেট ও অতিথিদের সরবরাহ করা হবে। শেখ হাসিনার বক্তব্যসংবলিত ৫০ পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকা ছাপার কাজ গতকাল শেষ করেছে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপপরিষদ। পুস্তিকায় আওয়ামী লীগ সভাপতির বক্তব্যের পুরোটা না হলেও গুরুত্বপূর্ণ সব অংশই থাকবে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি এখনই শুরু করতে হবে। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা যদি মানুষের কাছে ঠিকমতো পৌঁছানো যায় তবে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জনগণ আবারও সরকার গঠনের সুযোগ দেবে। এ জন্য আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। দলীয় সূত্রে জানা যায়, জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নও দেওয়া হবে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে। দলীয় সভাপতির ভাষণে এসব বিষয় উল্লেখ করার সম্ভাবনা রয়েছে।

সূত্র মতে, সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সভাপতি জনগণকে মূল্যায়ন করতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানাবেন। শেখ হাসিনার লিখিত বক্তব্যের পুস্তিকায় উল্লেখ আছে, ১৯৪৯ সালে দল গঠনের পর থেকেই এ দেশের জনগণ ঐতিহাসিক নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে আওয়ামী লীগের পক্ষে থেকেছে, ভোট দিয়েছে। এখনো জনগণ আওয়ামী লীগের পক্ষে আছে বলেই সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছে। ফলে জনগণের আবেগকে মূল্যায়ন করতে হবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রাখতে হবে।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, দলীয় প্রধানের বক্তব্যে যেসব বিষয় গুরুত্ব পাবে এর মধ্যে আছে—আওয়ামী লীগ ভোগে নয়, ত্যাগে বিশ্বাসী। মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকা ও তাদের উন্নয়নের জন্য কাজ করা দলের নেতাকর্মীদের দায়িত্ব। জনগণ আওয়ামী লীগের শক্তি এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জনগণের সেবক। তাই সেবার মানসিকতা নিয়ে ব্যক্তিগত চাহিদা, লোভ-লালসা ত্যাগ করে, মানুষের মনোভাব বুঝে তাদের জন্য কাজ করতে হবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সভাপতি তাঁর ভাষণে দল থেকে নির্বাচিত সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিকে সব সময় জনগণের পাশে থাকার আহ্বান জানাবেন। জনকল্যাণ ও দারিদ্র্য দূরীকরণে যেসব জনপ্রতিনিধি সফলতা দেখাবেন তাঁদের কাজের বিশেষ মূল্যায়নের অঙ্গীকার করবেন প্রধানমন্ত্রী। ’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতা জানান, ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ গড়ার মধ্য দিয়ে এ দুটি বিশেষ উৎসব পালন করতে চায় আওয়ামী লীগ। সম্মেলনে দলীয় সভাপতি এ লক্ষ্য পূরণে নেতাকর্মীদের যথাযথ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাবেন। এ ছাড়া দলকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করার আহ্বানও থাকবে শেখ হাসিনার বক্তব্যে।

দলীয় সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রীর লিখিত ভাষণে বিভিন্ন খাতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্জন তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে ২০১৪ সালে বিএনপির নির্বাচনে অংশ না নিয়ে সহিংস আন্দোলন কর্মসূচির সমালোচনা, ‘যুদ্ধাপরাধীদের’ বিচারে সরকারের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করবেন শেখ হাসিনা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে বিএনপিকে তাদের দাবি অনুযায়ী যেকোনো মন্ত্রণালয় ছেড়ে দিতে সরকার যে প্রস্তুত ছিল সে বিষয়টিও তুলে ধরবেন তিনি। শেখ হাসিনার বক্তব্যে জঙ্গিবাদ দমনের প্রসঙ্গও উঠে আসবে। এ ছাড়া দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে যারা সহিংসতায় যুক্ত ছিল তাদের আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার কঠোর থাকবে বলে জানাবেন।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া। এ কারণে সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এ ক্ষেত্রে সরকার অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়নি। এসব বিষয় শেখ হাসিনার বক্তব্যে তুলে ধরার সম্ভাবনা রয়েছে। সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, দেশের উন্নয়নে ডিজিটাইজেশন খাতে অবদান, ক্রীড়া ক্ষেত্রে অর্জন, শিক্ষা খাতে উন্নতি, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের কথাও উল্লেখ থাকতে পারে।

সূত্র মতে, আওয়ামী লীগ সভাপতি বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের জন্য সরকারের পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলতে পারেন। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে কোনো কোনো মহলে সমালোচনা থাকায় ওই প্রকল্পের বিষয়েও বক্তব্য থাকতে পারে। সুন্দরবনের ক্ষতি না করেই যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে সে বিষয়টি তুলে ধরবেন শেখ হাসিনা।  

আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, এক-এগারোর সময় তাঁকে দেশে ফিরতে না দেওয়া, ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তারকালে ড. ওয়াজেদ মিয়াকে লাঞ্ছিত করার বিষয়টিও তুলে ধরবেন শেখ হাসিনা। এক-এগারোর জরুরি অবস্থার সময় প্রতিবাদ করার জন্য ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবেন তিনি।

আওয়ামী লীগের সম্মেলন শুরু হচ্ছে আজ সকাল ১১টায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছয় হাজার ৫৭০ জন কাউন্সিলর ছাড়াও ডেলিগেট, দেশি-বিদেশি অতিথি মিলিয়ে প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ উপস্থিত থাকবে। সম্মেলনের প্রথম দিনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, দলীয় নেতৃবৃন্দ ও অতিথিদের ভাষণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ধ্যায় গণভবনে চীন ও ভারত থেকে আগত অতিথিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। আগামীকাল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে হবে কাউন্সিল অধিবেশন। এতে শুধু দলের কাউন্সিলররা অংশ নেবেন। এর মধ্য দিয়ে আগামী তিন বছরের জন্য আওয়ামী লীগের নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে।

দলীয় সূত্র মতে, কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আসবে। দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের পরিধি ৭৩ সদস্য থেকে বেড়ে ৮১ হবে। জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড কমিটির পরিধিও বাড়ানো হবে। গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের পরিবারের সদস্যদের আওয়ামী লীগের সদস্য হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড গঠনের বিষয়টিও গঠনতন্ত্রে সংযোজন করা হবে।

এবার আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রেও পরিবর্তন আসবে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধশালী দেশে পরিণত করার ঘোষণা থাকবে ঘোষণাপত্রে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবস্থান ব্যক্ত করা হবে এতে। নতুন ঘোষণাপত্রে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ খাতের কর্মপরিকল্পনা সংযোজন করা হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন, ব্লু ইকোনমি গুরুত্ব পাবে ঘোষণাপত্রে। সরকারের চলমান মেগাপ্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি যুক্ত হচ্ছে এতে।

২০২০ সালের মধ্যে নারী শিক্ষায় দেশের নারী-পুরুষের অনুপাত সমান করে জেন্ডার সমতা নিশ্চিতকরণের ঘোষণা থাকছে এবার ঘোষণাপত্রে। যোগাযোগ, শিক্ষা, শিল্প-বাণিজ্য, স্থানীয় সরকার, বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি, পররাষ্ট্র, আইনের শাসনের মতো খাতগুলোতেও নতুন পরিকল্পনা যুক্ত হবে ঘোষণাপত্রে।


মন্তব্য