kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বন্ধ হয়ে গেল সিটিসেল

বিশেষ প্রতিনিধি   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বন্ধ হয়ে গেল সিটিসেল

শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল দেশের প্রথম ও একমাত্র সিডিএমএ (কোড ডিভিশন মাল্টিপল অ্যাকসেস) প্রযুক্তির মোবাইল ফোন অপারেটর প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (পিবিটিএল) বা সিটিসেলের কার্যক্রম। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম এ মোবাইল ফোন অপারেটরের কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেন।

তার আগে বিকেল পৌনে ৫টার দিকে বিটিআরসির পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) এয়াকুব আলী ভূইয়া সিটিসেলের প্রধান কার্যালয় প্যাসিফিক সেন্টারে র‌্যাব ও পুলিশ নিয়ে হাজির হন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিটিআরসির বকেয়া পরিশোধ না করায় সিটিসেলের তরঙ্গ স্থগিত করা হয়েছে। ’

বেতার তরঙ্গ স্থগিতের কারণ ব্যাখ্যা করেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ। এ সময় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ও বিটিআরসির অন্যান্য কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

তারানা হালিম জানান, আপিল বিভাগের নির্দেশনায় সিটিসেলকে সরকারের পাওনা ৪৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকার দুই-তৃতীয়াংশ চার সপ্তাহের মধ্যে পরিশোধ করতে বলা হয়েছিল। এ নির্দেশনা অনুযায়ী গত ১৯ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির  প্রায় ৩১৯ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা ব্যর্থ হওয়ায় ২০ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে তাদের জন্য বরাদ্দ বেতার তরঙ্গের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে সিটিসেল প্রথম দফায় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করেনি। এ কারণে তাদের নতুন করে কার্যক্রম শুরুর আর সম্ভাবনা নেই। পরবর্তী সিদ্ধান্ত হিসেবে তাদের বেতার তরঙ্গ স্থায়ীভাবে বাতিল করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাদের লাইসেন্সও বাতিল হয়ে যাবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সিটিসেল দেশের প্রথম মোবাইল অপারেটর হিসেবে লাইসেন্স পাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছিল। কিন্তু তারা শুরু থেকেই রাজস্ব, ভ্যাট যেমন পরিশোধ করেনি, তেমনি একাধিক ব্যাংকের ঋণ এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বকেয়াও দেয়নি।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ বলেন, সিটিসেলের গ্রাহকদের অন্য অপারেটরের নেটওয়ার্কে স্থানান্তরের জন্য গত এক আগস্ট থেকে ১৬ আগস্ট এবং পরে তা বাড়িয়ে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে গ্রাহকদের কথা বিবেচনা করেই দীর্ঘদিন বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করার পরও সিটিসেলের বেতার তরঙ্গের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলেও সিটিসেলকে অবশ্যই সরকারের বকেয়া পরিশোধ করতে হবে। তবে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাওনা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানকেই আদায় করতে হবে।

গত ৩১ জুলাই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সিটিসেলের গ্রাহকদের ১৬ আগস্টের মধ্যে বিকল্প সেবা বা ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরামর্শ দেয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এ মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে সরকারের প্রায় ৪৭৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা রাজস্ব বকেয়া রয়েছে। লাইসেন্স নবায়নের পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কমিশন থেকে সিটিসেলকে সরকারের বকেয়া রাজস্ব জমা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে চিঠি এবং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কেন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না—এ  মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এর পরও সিটিসেল বিভিন্ন সময়ে বকেয়া পরিশোধের অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও তা করেনি। সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব পরিশোধ না করে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া লাইসেন্সের শর্তাবলির পরিপন্থী এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ অবস্থায় বিটিআরসি প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল করার এখতিয়ার রাখে।

৩ আগস্ট বিটিআরসির চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের জানান, ১ আগস্ট সিটিসেল বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু গ্রাহকদের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করে তাদের অপারেটর বদলের জন্য ১৬ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।

১৬ আগস্ট গ্রাহকদের অপারেটর বদলের জন্য আরো সাত দিন সময় দেওয়া হয়। এরপর সিটিসেল আদালতে গেলে আপিল বিভাগ টাকা পরিশোধ সাপেক্ষে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে প্রতিষ্ঠানটিকে দুই মাস সময় দেন।

সেদিন বিটিআরসির আইনজীবী খন্দকার রেজা-ই-রাকিব সাংবাদিকদের জানান, ১৭ আগস্টের আগ পর্যন্ত সিটিসেলের কাছে বিটিআরসির পাওনা রয়েছে ৪৭৭ কোটি টাকা। এর দুই-তৃতীয়াংশ এখন থেকে এক মাসের মধ্যে, আর এক-তৃতীয়াংশ পরবর্তী এক মাসে পরিশোধ করতে হবে। তা ছাড়া ১৭ আগস্টের পর থেকে প্রতিদিন বিটিআরসির আরো ১৮ লাখ টাকা করে পাওনা হচ্ছে। প্রতিদিনের এই টাকা অবিলম্বে পরিশোধের নির্দেশ দিয়ে আদালত বলেছেন, টাকা না পেলে বিটিআরসি যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে।

সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী জানান, আদালতের নির্দেশ অনুসারে প্রথম কিস্তিতে প্রায় ৩১৯ কোটি টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও সিটিসেল দিয়েছে ১৩০ কোটি টাকা। এতে তারা আদালতের আদেশও লঙ্ঘন করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিটিআরসি ছাড়াও সিটিসেলের কাছে অনেকেরই পাওনা রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের টাকা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন পরিশোধ করেনি। প্রতিষ্ঠানটির কাছে চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের পাওনাও বকেয়া রয়েছে। এ অর্থ আদায়ের জন্য ব্যাংকটি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে।  

বাংলাদেশের প্রথম মোবাইল ফোন অপারেটর হিসেবে সিটিসেলের যাত্রা শুরু ১৯৮৯ সালে। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানের ৪৪.৫৪ শতাংশ মালিকানা সিঙ্গাপুরভিত্তিক সিংটেল এশিয়া প্যাসিফিক ইনভেস্টমেন্ট  নামের একটি প্রতিষ্ঠানের। এ ছাড়া ফার ইস্ট টেলিকম লিমিটেডের ১৭.৫১ শতাংশ ও প্যাসিফিক মোটরস লিমিটেডের ৩৭.৯৫ শতাংশ মালিকানা রয়েছে।

বিটিআরসির তথ্য অনুসারে দীর্ঘদিন ধরে সিটিসেলের গ্রাহক বাড়ছে না। ২০১০ সালের অক্টোবরে এর গ্রাহক ছিল ১৯ লাখ সাত হাজার। বর্তমানে তা দুই লাখের নিচে নেমে এসেছে।


মন্তব্য