kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পাচারের ‘রাজধানী’ আনোয়ারা

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



পাচারের ‘রাজধানী’ আনোয়ারা

ইয়াবা পাচারের রুট হিসেবে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকা টেকনাফ ও কক্সবাজারকেও ছাড়িয়ে গেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা। উপজেলাটির উত্তরাংশে দেশের অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র কর্ণফুলী নদী ও চট্টগ্রাম বন্দর।

দক্ষিণাংশে শঙ্খ নদ, পশ্চিমাংশে বঙ্গোপসাগর। তিন দিকেই নৌপথ থাকায় আনোয়ারাকে ইয়াবা ‘রাজধানীতে’ পরিণত করেছে পাচারকারীরা।

সর্বশেষ এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই দফায় ৯০ লাখ ইয়াবা আনোয়ারার উপকূলে খালাস হয়েছে বলে তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। যার একটিতে ছিল ৫০ লাখ, অন্যটিতে ৪০ লাখ ইয়াবা। এ উপজেলার ২১ জন শীর্ষ পাচারকারীর নাম রয়েছে র‌্যাব-৭-এর তালিকায়। অবশ্য ইতিমধ্যে জাফর ও আলো নামের দুজন শীর্ষস্থানীয়  কারবারি র‌্যাবের সঙ্গে ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আনোয়ারার  কয়েক শ ট্রলার বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যায়। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার কয়েক হাজার ট্রলারও সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত। এর মধ্যে কিছু ট্রলারে মাছ ধরার আড়ালে ইয়াবা পাচার হয়। পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিতে শঙ্খ নদের খানখানাবাদ হয়ে তৈলারদ্বীপ কিংবা আশপাশের গ্রামে ইয়াবা খালাস করছে। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরের তীরে শঙ্খ নদের মোহনা থেকে কর্ণফুলীর মোহনা পর্যন্ত প্রায় ৪৫-৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়েও ইয়াবার চালান খালাস হয়। খালাসের পরপরই অটোরিকশাসহ বিভিন্ন গাড়িতে করে চালান চলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম নগরীতে। সেখান থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

কর্ণফুলীতে মাছ ধরার ট্রলারগুলো সদরঘাট ফিরিঙ্গিবাজার কিংবা দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজারে চাক্তাই এলাকায় পৌঁছে যাচ্ছে। সেখানেও পণ্য খালাসের আড়ালে ইয়াবা খালাস হয় বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য আছে। স্থলপথে বিভিন্ন থানা পুলিশের কড়া পাহারার কারণে ইয়াবার বড় চালানগুলো এখন সমুদ্রপথেই পাচার হচ্ছে। আর পাচারের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হচ্ছে আনোয়ারা।

আনোয়ারার উপকূলীয় এলাকা ও চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকেই দেশের সর্ববৃহৎ ইয়াবা চালানের কয়েকটি ধরা পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। র‌্যাব-৭ ও কোস্ট গার্ড পূর্ব জোন অভিযান চালিয়ে চলতি বছর এ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক পাচারকারীচক্রের কাছ থেকে এক কোটি ছয় লাখের বেশি ইয়াবা বড়ি জব্দ করেছে। র‌্যাব-৭ ও কোস্ট গার্ডের জব্দ চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্থলপথের চেয়ে নৌপথে অন্তত ৭০ শতাংশ বেশি ইয়াবা ধরা পড়েছে, যার বেশির ভাগই আনোয়ারাকেন্দ্রিক পাচারকারীচক্রের ইয়াবা।

বঙ্গোপসাগরে নজরদারি করা কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন এম শহীদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টেকনাফ ও কক্সবাজারে ধারাবাহিক অভিযানের কারণেই পাচারকারীরা স্থান পরিবর্তন করেছে। চট্টগ্রাম নগরীর কাছে আনোয়ারা সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় এ উপজেলাকে পাচারকারীরা ব্যবহারের চেষ্টা করছে। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শুধু আনোয়ারা নয়, আরেকটু সামনে গিয়ে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি এলাকায়ও ইয়াবা খালাস হয়েছে। কোস্ট গার্ড ওই এলাকা থেকেও ইয়াবার বড় চালান জব্দ করেছে। ’

এ কর্মকর্তা বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া ইয়াবার চালান আটক প্রায় অসম্ভব। কারণ বঙ্গোপসাগরের হাজার হাজার ট্রলার মাছ ধরে। এর মধ্যে কোনটিতে ইয়াবা আছে, সেটা খুঁজে বের করা কঠিন। ’

প্রাপ্ত তথ্য মতে, কোস্ট গার্ড পূর্ব জোন গত বছর সাগরপথে পাচারকালে জব্দ করেছিল ১৪ লাখ ৬০ হাজার ইয়াবা বড়ি। এ বছর এ পর্যন্ত জব্দ করা হয়েছে ৪৬ লাখ ৩৭ হাজার ইয়াবা। আর র‌্যাব-৭ গত বছর জব্দ করেছিল ৩২ লাখ ৬৩ হাজার ইয়াবা। চলতি বছর এ পর্যন্ত ৬০ লাখেরও বেশি ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। র‌্যাব-৭ ও কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের কর্মকর্তারা উদ্ধারচিত্র পর্যালোচনা করে নিশ্চিত করেছেন, বড় চালানগুলো ধরা পড়েছে সাগরপথেই।

র‌্যাবের জব্দ করা চালানগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে সাগরপথ থেকে আট লাখ ১০ হাজার ইয়াবা জব্দ করা হয়েছিল। এ বছর চারটি বড় অভিযানে আটক করা হয়েছে ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ইয়াবা। বাকি ইয়াবা স্থলপথ থেকে জব্দ করা হয়। কর্ণফুলীর মোহনা থেকে সর্বাধিক ২৮ লাখ ইয়াবা জব্দ করা হয় গত ১৫ জানুয়ারি।

আনোয়ারা উপজেলা ঘিরেই ইয়াবা পাচারের সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে উঠেছে বলে নিশ্চিত করেছেন র‌্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতা উদ্দিন আহমেদ। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আনোয়ারাকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। র‌্যাব-৭ ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে এ চক্র ভাঙার চেষ্টা করছে। ’ সাগরপথে পাচারের সময় ইয়াবার বড় বড় চালান জব্দ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতেই ইয়াবা পাচারকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি। র‌্যাব-৭ সে কাজটিই করছে। ’

ইয়াবা পাচার ঠেকাতে আনোয়ারার স্থানীয় সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় এখন এক লাখের বেশি নগদ টাকা জমার ক্ষেত্রেও কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। অপরিচিত গ্রাহকের বেলায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জমা টাকার উৎস জেনে নিয়ে কিংবা ব্যাংক হিসাবধারীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে টাকা লেনদেন করছে। ব্যাংক চ্যানেলে মাদকের টাকার প্রবাহ ঠেকাতেই এ কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা।  

তালিকাভুক্ত ইয়াবা পাচারকারী যারা : আনোয়ারার ২১ জনকে শীর্ষ পাচারকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে র‌্যাব-৭। তারা হলো ইউসুফ ওরফে কালা মনু, মুজাহিদ, আবু, সবুর, রহিম, কাশেম, ফয়েজ, শফিক, ফরিদ, সেলিম, নূর সৈয়দ, জালাল, মানু, আবু সৈয়দ, জাহাঙ্গীর, নাছির, সেলিম, আফছার, জাফর ও কালু।

তালিকাভুক্ত পাচারকারীদের কয়েকজন পলাতক ও মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। কয়েকজন এলাকায় অবস্থান করছে। কেউ কেউ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে চলাফেরা করে। তালিকায় জনপ্রতিনিধিও রয়েছে।

চলে না সমন্বিত অভিযান : দেড় বছরের বেশি সময় ধরে আনোয়ারা দিয়ে ইয়াবা পাচার বাড়লেও তা বন্ধে সমন্বিত অভিযান চালানো হচ্ছে না। সীমানা বিরোধসহ নানা সীমাবদ্ধতার অজুহাতে সমন্বিত অভিযান চালায় না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইয়াবা উদ্ধার প্রশ্নে জেলা ও নগর পুলিশের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বিরোধ আছে। কোস্ট গার্ড সাগরপথে অভিযান চালায়। কিন্তু হাজার হাজার মাছ ধরার ট্রলারের মধ্যে কোন ট্রলারে ইয়াবা পাচার হচ্ছে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে বড় চালান আটকে সমস্যা হয়। র‌্যাব-৭ মূলত স্থলভাগে অভিযান চালালেও এখন সাগরেও অভিযান শুরু করেছে। বড় সাফল্যও পাওয়া গেছে। তবে সাগরপথে পাচার হওয়া ইয়াবা জব্দে জেলা ও নগর পুলিশের বড় কোনো সাফল্য নেই।

সিদ্ধান্ত আসছে কোর কমিটির বৈঠকে : আনোয়ারা দিয়ে ইয়াবা পাচার বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এ নিয়ে জেলা কোর কমিটিতে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক সামসুল আরেফিন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘ইয়াবার ভয়াল থাবা বন্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে থানা এলাকা কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ইয়াবা পাচার বন্ধের প্রশ্নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিত অভিযান চালাবে। ’

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সাগরপথে কোস্ট গার্ড ও র‌্যাব ইয়াবা জব্দ করছে। পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইয়াবা জব্দে আরো বেশি সক্রিয় হতে। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘টেকনাফ ও কক্সবাজারে স্থলপথে পুলিশের কড়া তল্লাশির কারণে পাচারকারীরা সাগরকে নিরাপদ ভাবছে। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার চালান সাগরেই হাত বদল হচ্ছে। এখন সাগরপথেও কড়া নজরদারি করা হবে। ’ বঙ্গোপসাগরের আনোয়ারা অংশের প্রায় ৫০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা এবং শঙ্খ নদের মোহনায় নজরদারি বাড়াতে জেলা পুলিশ সুপারকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।


মন্তব্য