kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হিলারির হ্যাটট্রিক জয়

হারলে ফল না মানার ইঙ্গিত ট্রাম্পের

নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হিলারির হ্যাটট্রিক জয়

যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিকব্যবস্থায় বিশাল এক প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়ে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ট্রাম্প জানান, আগামী ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের ফল মানবেন কি না, তা সময় এলে জানা যাবে। অর্থাৎ তিনি ফল প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।

এর আগে সপ্তাহ দেড়েক ধরে চালানো নির্বাচনী প্রচারে তিনি বারবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রক্রিয়া দুর্নীতিপূর্ণ এবং পরাজিত হলে তিনি ফল প্রত্যাখ্যান করবেন।

নেভাদা অঙ্গরাজ্যের লাস ভেগাস শহরে গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা) অনুষ্ঠিত এ বিতর্কে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘ভয়ংকর’।

এবারের বিতর্কটিকে ট্রাম্পের জন্য শেষ সুযোগ হিসেবে ধরা হচ্ছিল। তবে সুযোগ কাজে লাগানোর পরিবর্তে বিতর্কের ৯০ মিনিটজুড়ে তিনি যা করলেন তাঁকে নিজের আগে থেকে খুঁড়ে রাখা গর্তই আরো গভীর করা হলো। শেষ পর্যন্ত এ বিতর্কটিও হাতছাড়া হয়ে গেল ট্রাম্পের। জরিপ বলছে, টানা তৃতীয়বারের মতো হেরে গেলেন তিনি। তবে বিতর্ক ছাড়া ভোটারদের জনমত জরিপেও তাঁর অবস্থা তথৈবচ। হিলারির জনসমর্থন ক্রমেই বাড়ছে।

ট্রাম্পের এ অবস্থান নিয়ে অবশ্য তাঁর দলের ভেতরও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রতিদ্বন্দ্বীরা ট্রাম্পের এমন ব্যর্থ ও গোঁয়ারের মতো আচরণের কারণে সংকটে পড়বেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ ট্রাম্প দলেরই প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর প্রচার পদ্ধতির কারণে যে ক্ষতির মুখে তিনি পড়তে পারেন, সেই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে দলের অন্য সদস্যদের জন্যও। আর এ কারণেই একই দলে থাকার পরও ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব তৈরিতে আগ্রহী বহু রিপাবলিকান। বরাবরের মতো এবারও ট্রাম্প ভদ্রতা-সভ্যতার ধার ধারেননি। হিলারি বিতর্কের শেষ পর্যয়ে সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি কথার মাঝখানেই মাইকে মুখ বাড়িয়ে বলেন, ‘জঘন্য মহিলা! জঘন্য মহিলা। ’ মন্তব্য করার পর তিনি তাঁর অভিব্যক্তিই বুঝিয়ে দিচ্ছিল—এ মন্তব্য করে তিনি সন্তুষ্ট।

উইকিলিকসের ফাঁস করে দেওয়া হিলারির একটি বক্তব্য নিয়ে কথা প্রসঙ্গে সাবেক এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘উইকিলিকসকে তথ্য সরবরাহ করে রুশ গোয়েন্দারা। যার সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। পুতিন আবার ট্রাম্পভক্ত। ’ এ সময় ট্রাম্প বারবার হিলারির বক্তব্যকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করলে সাবেক ফার্স্টলেডি বলেন, ট্রাম্প পুতিন তার পুতুল হিসেবে ব্যবহার করবেন। ’ জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘পুতিনকে আমি চিনি না। তবে তিনি আমার প্রশংসা করেছেন বলে শুনেছি। হিলারি একজন মিথ্যাবাদী। নানাভাবে বিষয়টি প্রমাণিত। তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে ই-মেইল নিয়ে যা করেছেন, তা গুরুতর অপরাধ। ’

পুরো সময় ট্রাম্প হিলারিকে রাগিয়ে দেওয়ার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেন। হিলারির ‘সার্ভিস রেকর্ড’ বারবার টেনে ট্রাম্প বলার চেষ্টা করেন, কথায় সাবেক এই সিনেটর যতটা পারদর্শী কাজে ততটা নন। বরং যখন যে কাজই করেছেন ব্যর্থ হয়েছেন। তবে হিলারিকে চটিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় কখনোই সফল হননি ট্রাম্প। প্রতি দফায় হিলারি ঠাণ্ডা মাথায় তাঁর কাজের বিশদ ব্যাখ্যা করে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন।

তবে বিতর্কের সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে নির্বাচনের ফল প্রসঙ্গে ট্রাম্পের মন্তব্যের বিষয়টি। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ইতিহাসে ফল প্রকাশের পর কোনো প্রার্থী মেনে নেননি, এমন ঘটনা ঘটেনি। এমনকি ১৯৬০ সালে জন এফ কেনেডি যখন খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে রিচার্ড এম নিক্সনকে পরাজিত করেন বা ২০০০ সালে ফ্লোরিডার ভোট নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে যখন জর্জ বুশ জয়ী হন তখনো ফল মেনে নেন আল গোর।

সঞ্চালক ফক্স নিউজের উপস্থাপক ক্রিস ওয়ালেস বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘কি করব (ফল মেনে নেবেন কি না) তা তখনই দেখা যাবে। আমি আপনাদের সবাইকে ধোঁয়াশার মধ্যেই রাখতে চাই। ’

রাজনৈতিকভাবে তিন সপ্তাহ ধরেই ধুঁকছেন ট্রাম্প। প্রথম বিতর্কে হিলারির কাছে পরাজয়, বিশ্ব সুন্দরীর সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া, দ্বিতীয় বিতর্কের মাত্র দুই দিন আগে নারীদের প্রতি তীব্র অসম্মানজনক আলাপচারিতার ভিডিও প্রকাশ এবং এরপর একের পর এক নারীর সামনে এসে বলা ট্রাম্প তাঁদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন—সব মিলিয়ে ট্রাম্প পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি।

তবে বিতর্কে ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা। যেসব নারী তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ আনছেন তাঁরাও মিথ্যা বলছেন। এগুলো গণমাধ্যমের সৃষ্টি এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের নিয়োগ করা মানুষ। তিনি দাবি করেন, নারীদের তিনি যতটা শ্রদ্ধা করেন ততটা আর কেউই পারেন না। এ প্রসঙ্গটি নিয়ে হিলারি এ সময় ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেন।

বিতর্কে অভিবাসী প্রসঙ্গে দুই প্রার্থীর মত জানতে চান সঞ্চালক। ট্রাম্প বলেন, “হিলারি অবৈধ অভিবাসীদের জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’ চান। হিলারি চান না সীমান্ত বলে কোনো বস্তু থাক। তবে আমাদের অবশ্যই সীমান্তে কড়াকড়ি করতে হবে। মাদককে দূরে রাখতে হবে। আমরা মাদক নিচ্ছি আর তারা নগদ অর্থ নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের মধ্যে কিছু বাজে লোক আছে, তারা এ কাজে সহায়তা করছে। ”

এ সময় লস অ্যাঞ্জেলেসেই দেখা হওয়া এক কিশোরীর প্রসঙ্গ টনেন হিলারি। মেয়েটির জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু তার মা-বাবা অভিবাসী। মেয়েটি আশঙ্কা করছে, ট্রাম্প নির্বাচিত হলে হয়তো তার মা-বাবাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে। হিলারি বলেন, ‘আমি কোনো পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করতে চাই না। ট্রাম্প অভিবাসীদের ফেরত পাঠাতে যে বাহিনী গড়ার কথা বলছেন আমি তাদের দেখতে চাই না। ’ হিলারি অভিযোগ করেন, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলার কথা বললেও ট্রাম্প যখন দেশটির প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তখন বিষয়টি তোলেননি। ট্রাম্পও হিলারির বিরুদ্ধে কম কথা বলেননি। তিনি ক্লিনটন ফাউন্ডেশনকে ‘শয়তানের আখড়া’ বলে অভিহিত করেন। জবাবে ট্রাম্পের দাতব্য প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প ফাউন্ডেশনের কথা তোলেন হিলারি। তিনি অভিযোগ করেন, ওই ফাউন্ডেশনের দপ্তরে ট্রাম্পের ছয় ফুট লম্বা ছবি আছে। ওটা কার পয়সায় লাগানো?

দুজনের কথায় গর্ভপাত প্রসঙ্গটিও উঠে আসে। ট্রাম্প বলেন, গর্ভধারণের একেবারে শেষ সময়ে মায়ের গর্ভ থেকে সন্তানকে বের করে ফেলে দিতে চান হিলারি। জবাবে মিসেস ক্লিনটন বলেন, ‘কথা দিয়ে ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। নারী তার একান্ত ব্যক্তিগত একটি বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে সেটা তার ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। এখানে সরকারের নাক গলানো ঠিক হবে না। আমরা চীনের মতো গর্ভপাতে কাউকে বাধ্য করতে পারি না। আবার রোমানিয়ার মতো সন্তান ধারণের বাধ্যবাধকতাও আরোপ করতে পারি না। ’

সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী (নাগরিকদের আগ্নেয়াস্ত্র বহনের অধিকার) প্রশ্নে তাদের অবস্থান জানতে চাওয়া হলে হিলারি বলেন, আমি এর পক্ষে। তবে কার কাছে অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করতে হবে। এ সময় ট্রাম্প ফুট কাটেন, ‘তাহলে গত ১৫-২০ বছর ধরে সিনেটে বসে আপনি কী করলেন? আমার চাইতে একটি বিষয়েই আপনি এগিয়ে আছেন আর তা হলো অভিজ্ঞতা। যদিও এই অভিজ্ঞতা ইতিবাচক নয়। ’

তবে এ দফায় ট্রাম্পের এ অভিযোগের সুন্দর একটি জবাব তৈরি করে এনেছিলেন হিলারি। তিনি সত্তরের দশক থেকে তাঁর কাজের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে বলেন, ট্রাম্প বাবার কাছ থেকে অর্থ এনে ব্যবসা শুরু করেছেন। টেলিভিশনে রিয়ালিটি শো পরিচালনা করেছেন। আর এক সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীকে ‘খাওয়ার মেশিন’ বলে অভিহিত করার মতো কাজ করে গিয়েছেন। ‘আমি যখন হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে বসে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যু কার্যকর করার অভিযান দেখছিলাম, তখন তিনি ‘সেলিব্রিটি অ্যাপ্রেন্টিসদের’ আতিথেয়তা দেওয়ার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। ’ জবাবে ট্রাম্প তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্যের প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন।

সঞ্চালক আলেপ্পো প্রসঙ্গে তুললে ট্রাম্প বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে হিলারির ভুল নীতির কারণেই আলেপ্পোর এই ভোগান্তি হচ্ছে। এ সময় তিনি বলেন, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান। মসুলে হামলা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, হিলারিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেতানোর জন্যই ইরাকের মসুলে হামলা চালানো হচ্ছে। মসুলকে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দখলমুক্ত করতে গত সোমবার থেকে ইরাকের সেনাবাহিনী ও কুর্দি পেশমেরগা বাহিনী অভিযান শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিমানবাহিনী ও উপদেষ্টারা এ বাহিনীর হয়ে কাজ করছেন। আইএস হটানোর এ যুদ্ধকেই ‘হিলারিকে জেতানোর যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেন ট্রাম্প।

এ ছাড়া দুই প্রার্থীর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগ্যতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন।

বিতর্ক শেষে সিএনএন/ওআরসি পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৫২ শতাংশ ভোটার মনে করেন হিলারি বিতর্কে জয় পেয়েছেন। একই কথা ট্রাম্পের ক্ষেত্রে মনে করেন ৩৯ শতাংশ ভোটার। তবে তাঁরা মনে করেন আগের দুটি বিতর্কের তুলনায় এবার ট্রাম্পের পারফরম্যান্স ভালো। ৫৯ শতাংশ দর্শক মনে করেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য হিলারির প্রস্তুতি ভালো, অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রস্তুতিকে ভালো বলেছেন ৩৫ শতাংশ দর্শক। তাৎক্ষণিক এই জরিপে ৫৪৭ জন নিবন্ধিত ভোটার অংশ নেন।

তবে এবারও হিলারির তুলনায় ট্রাম্পের প্রস্তুতির ঘটতি চোখে পড়ছিল। ট্রাম্প প্রস্তুতিমূলক কোনো বিতর্কে অংশ নেননি। তাঁর সহযোগীরা বিতর্কের আগে যে দিস্তা দিস্তা নথি তৈরি করেছেন, অভিযোগ রয়েছে, ট্রাম্প সেগুলোতেও হাত লাগাননি। উইকিলিকস প্রসঙ্গ টানা থেকে বিরত থাকাসহ নানা বিষয়ে তাঁকে সতর্ক করেছিলেন রিপাবলিকান নেতারা— সেগুলোও গ্রাহ্য করার প্রয়োজনবোধ করেননি ট্রাম্প। নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের অবস্থার নাটকীয় কোনো পরিবর্তন না হলে হিলারির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ।


মন্তব্য