kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন প্রকাশ

টিআর কাবিখা ভিজিএফে দুর্নীতির কড়া সমালোচনা

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



টিআর কাবিখা ভিজিএফে দুর্নীতির কড়া সমালোচনা

দরিদ্রদের জন্য নেওয়া সরকারের টিআর, কাবিখাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে প্রতিনিয়তই সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি বাড়ছে।

বিশেষ করে খাদ্যসংক্রান্ত কর্মসূচিতে এসব অনিয়মের ঘটনা বেশি ঘটছে। ফলে দরিদ্ররা এসব কর্মসূচি থেকে আশানুরূপ সুফল পাচ্ছে না।

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বাংলাদেশ সফরে এসে দারিদ্র্যজয়ের ব্যাপক প্রশংসা করে বিদায় নেওয়ার এক দিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার সংস্থাটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। ‘বাংলাদেশ সোশ্যাল প্রটেকশন অ্যান্ড লেবার রিভিউ : টুয়ার্ডস স্মার্ট সোশ্যাল প্রটেকশন অ্যান্ড জব ফর দ্য পুওর’ শিরোনামের এ প্রতিবেদন রাজধানীর শেরে বাংলানগরে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নেওয়া কর্মসূচি নিয়ে এত বছর সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা থাকলেও এই প্রথম বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক এ নিয়ে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যেসব সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চলমান রয়েছে সেগুলোয় সঠিক ব্যক্তিকে বাছাই করা হয়নি। কর্মসূচিতে ঢুকে পড়েছেন ধনী ব্যক্তিরা। এমন অনেক কর্মসূচি আছে যেগুলো অস্বচ্ছ ও দুইবার নেওয়া প্রকল্প। এক ব্যক্তি একাধিক কর্মসূচিতে যুক্ত। যার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আর দুর্বল টার্গেটিং হওয়ার মূল কারণ, ব্যক্তি বাছাইয়ের সময় বৈজ্ঞানিক কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়নি। এ ছাড়া বাস্তবায়নের অদক্ষতা তো রয়েছেই।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে, দারিদ্র্য কমাতে বাংলাদেশ অসাধারণ সাফল্য দেখালেও মনে রাখতে হবে, এ দেশে এখনো দুই কোটি ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এদের দারিদ্র্যসীমা থেকে উঠিয়ে আনতে নগদ টাকা হস্তান্তরের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ সময় অন্যদের মধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রধান চিমিয়াও ফান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জিল্লার রহমান, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক রুশিদান ইসলাম বক্তব্য দেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আমি স্বীকার করি, এসব কর্মসূচিতে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে। তবে আমরা ভালো করছি। আরো ভালো করার সুযোগ আছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে আরো বেশি অনিয়ম হয়। ’ মন্ত্রী বলেন, ‘সরকার দরিদ্রদের জন্য প্রতি কেজি চাল ১০ টাকা করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে এখানেও কিছু দোষত্রুটি উঠে এসেছে। আমরা তার ব্যবস্থা নিচ্ছি। ’ পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘সব এলাকায় চুরি হয় না। আমার এলাকায় চুরি কম হয়। ’

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা খাতে মোট জিডিপির দুই শতাংশের বেশি বিনিয়োগের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানীও রয়েছে। এটি বাদ দিলে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগ কমে জিডিপির ১.৪ শতাংশে নেমে আসে। তা ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ১৪৫টির মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এত কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো সমন্বয় নেই। সমন্বয়হীনতার কারণে একই ব্যক্তি বিভিন্ন কর্মসূচিতে ঢুকে পড়ছে। কর্মসূচিতে দরিদ্রদের শ্রমবাজারে ঢুকানো সংক্রান্ত কর্মসূচি ও সামাজিক বীমা যথেষ্ট নয়।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশে সীমিত কিছু মানুষ যারা সরকারি চাকরি করে তারাই কেবল পেনশন পেয়ে থাকে। বেসরকারি খাতে যারা চাকরি করে, তারা পেনশন পায় না। সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও পেনশন ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।  

অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এক কোটি ২৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের কথা বলা আছে। আমরা সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করব। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য সবার জন্য সুন্দর জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়া। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নেওয়া কর্মসূচি বিস্তৃত করা হচ্ছে। বয়স্ক ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা, ভিজিএফ, টিআর, কাবিখা ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা প্রবর্তনসহ সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে শতভাগ দারিদ্র্যমুক্ত দেশ। আর ২০৪১ সালে হবে বিশ্বের ২০টি ধনী দেশের একটি। ’

বিশ্বব্যাংক বলছে, এ দেশে ১৬ কোটি জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই নারী। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীতে পাঁচ লাখ মানুষের আগমন ঘটে। এ ছাড়া ২০ লাখ মানুষ চাকরির বাজারে ঢোকে। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর চাকরি নিশ্চিত করতে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। আর এটি করতে কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনটিতে চারটি চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হলো—দারিদ্র্যের ব্যাপকতা ও ভঙ্গুরতা, যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ, শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং অভিবাসন ঝুঁকি। এই চারটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে বীমা চালু, দক্ষতা বাড়ানো, সরকারি পর্যায়ে শ্রমিক নিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নেওয়া কর্মসূচিগুলো আরো দক্ষতা ও সক্ষমতাসহ বাস্তবায়ন করতে পারলে দারিদ্র্যের হার বর্তমানের চেয়ে তিন শতাংশ কমত। কিন্তু কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সঠিক ব্যক্তি বাছাইয়ে অনিয়মসহ পুরো পদ্ধতিতেই গলদ আছে।

কারিগরি শিক্ষার কথা উল্লেখ করে হোসেন জিল্লুর রহমান আরো বলেন, এখন কারিগরি বললে মানুষ অন্য চোখে দেখে। সবাই মনে করে এটি গরিবের শিক্ষা। এর নাম পরিবর্তন করে স্কিল ডেভেলপমেন্ট করার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, গ্রামের দারিদ্র্যের চেয়ে শহরের দারিদ্র্য প্রধান সমস্যা।

বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রধান চিমিয়াও ফান বলেন, বাংলাদেশ দারিদ্র্য কমাতে অসাধারণ সফলতা পেয়েছে। তবে এখনো এ দেশে দুই কোটি ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। টেকসই প্রবৃদ্ধি ও মধ্যম আয়ের দেশে যেতে এদের দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠানো জরুরি।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নেওয়া কর্মসূচি প্রসঙ্গে চিমিয়াও ফান আরো বলেন, এখানে দক্ষতার অভাব আছে। সঙ্গে দুর্বল নজরদারি, ব্যক্তি বাছাই, প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, অনেক প্রকল্পই যৌক্তিক নয়।


মন্তব্য