kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সাংবাদিকতার স্বাধীনতা থাকতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

প্রেস ক্লাবের ৩১ তলা বঙ্গবন্ধু মিডিয়া কমপ্লেক্সের ভিত্তি স্থাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সাংবাদিকতার স্বাধীনতা থাকতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের আধুনিক ভবন নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ছবি : পিআইডি

রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণে দায়িত্ব পালনের জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।   তিনি বলেন, শুধু সংবাদপত্র নয়, সাংবাদিকতারও স্বাধীনতা থাকতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৩১ তলা বঙ্গবন্ধু মিডিয়া কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার আপনাদের অনেক সুবিধা দিয়েছে। সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে; অনেক আইন করা হয়েছে। ওয়েজ বোর্ড গঠন করা হয়েছে। সরকার আপনাদের কল্যাণে কাজ করছে। তাই বলব, আপনি সুবিধা ভোগ করবেন অথচ দায়িত্ব পালন করবেন না, এটা হতে পারে না। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশের প্রতি সকলের একটা দায়িত্ব থাকে, কর্তব্য থাকে। সমাজের প্রতি দায়িত্ব থাকে, কর্তব্য থাকে। সেই দায়িত্বটাও পালন করতে হয়। ’

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, সমকাল সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি গোলাম সারওয়ার এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলামও বক্তব্য দেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, সম্পাদক এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

গতকাল ছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৬২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রধানমন্ত্রী প্রেস ক্লাব চত্বরে প্রবেশ করেই বিশাল অট্টালিকার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর তিনি সভাস্থলে যান। সে সময় ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু...’ গান গেয়ে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়। গান পরিবেশন করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজোয়ানা চৌধুরী বন্যা। মঞ্চে উঠতে উঠতে গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলান প্রধানমন্ত্রী। ‘বড় আশা করে এসেছি গো, কাছে ডেকে লও...’ গানটিও পরিবেশন করেন বন্যা।

এরপর কোরআন, গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক পাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘কিভাবে সাংবাদিকদের সহযোগিতা করা যায় সে চেষ্টা আমাদের রয়েছে। সেই ’৯৬ সাল থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছি। সাংবাদিকদের কল্যাণে অনেক আইন আমরা করেছি। তথ্য অধিকার আইন করে দিয়েছি। তথ্য কমিশন করে দিয়েছি। সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৮টি আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন ও সংস্কার আমরা করেছি। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংবাদপত্রকে আমরা সেবাশিল্প খাত ঘোষণা করেছি। আমরা ইতিমধ্যে অষ্টম ওয়েজ বোর্ড ঘোষণা করেছি। এর পরে তো আরো দাবি আছে। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যিনি সংবাদপত্রের মালিক হন, তিনিই সম্পাদক হয়ে যান। মালিকানাটা যেহেতু নিজের হাতে থাকে, তাই মাঝে মাঝে সেখানে সাংবাদিকতার সুযোগ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই। যে কারণে আমি সব সময় বলে থাকি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা না, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা থাকতে হবে। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে এখন সাংবাদিকতার যথেষ্ট স্বাধীনতা আছে। যদিও প্রতিপক্ষ বিশ্বব্যাপী প্রচার করে বেড়ায়, দেশে সাংবাদিকতার কোনো সুযোগ নেই, স্বাধীনতা নেই। বাক্স্বাধীনতা নেই। স্বাধীনতা যদি নাই থাকে, তাহলে এ কথা বলার স্বাধীনতা তারা কোথা থেকে পেল?

শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির পিতার কথা—গণতন্ত্রের নীতিমালা থাকবে, আর সাংবাদিকদের নীতিমালা থাকবে না, এটা হতে পারে না। আমিও বলি, দেশে গণতন্ত্রের জন্য নীতিমালা থাকলে কেন সাংবাদিকদের জন্য নীতিমালা থাকবে না? এটা থাকতে হবে। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারা দেশে পত্রিকার সংখ্যা সাড়ে সাত শতাধিক। ২৪টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। অনুমতি চেয়েছে আরো ৪৪টি। এরপর রেডিও রয়েছে। টিভি চ্যানেলে টক শো দেখলে কে বলবে যে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই বা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নেই?

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। গণমানুষের অধিকার আদায়ের জন্য তৃণমূল থেকে এ সংগঠন গড়ে উঠেছে। দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ সরকারে গেছে। দুর্ভাগ্য হলো, এমন কিছু দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়, যে দলগুলো মাটি ও মানুষের মধ্য থেকে গড়ে ওঠেনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো একদিন আমরা টেলিভিশন খুলে দেখতে পেলাম, কেউ একজন ঘোষণা দিচ্ছেন—আজ থেকে আমি রাষ্ট্রপতি হলাম। ’ তিনি বলেন, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে, মার্শাল ল দিয়ে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়েছে। পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে এ দেশে এভাবেই হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের আর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি চলেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ক্ষমতায় এসেই তারা প্রথম বক্তৃতায় বলেছে, তারা কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নিয়ে আসেনি, দেশকে সঠিকভাবে চালাতে তারা ক্ষমতায় এসেছে। তারা রাজনীতিকদের গালি দিয়ে আরম্ভ করলেও নিজেরাই পরে রাজনীতিক সেজে যায়। রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার কাজে লেগে যায়। ২১ বছর এ ধরনের সরকারের অধীনে দেশ চলেছে।

দেশের উন্নয়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাকে অনেকেই জিজ্ঞাসা করেন, বাংলাদেশের এ রকম উন্নয়নের ম্যাজিকটা কী? আমি তাঁদের বলি, একটাই ম্যাজিক। আর তা হলো আমি দেশকে ভালোবাসি, দেশের মানুষকে ভালোবাসি। জনগণকে ভালোবাসি বলেই দেশ উন্নত হচ্ছে। ’

বঙ্গবন্ধু সাংবাদিক ছিলেন : প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা হয়তো জানেন না যে বঙ্গবন্ধু ছাত্রজীবনে সাংবাদিক ছিলেন। তিনি ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি সাংবাদিকতা করেছেন। কলকাতা থেকে তখন দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকা বের হতো। বঙ্গবন্ধু সেটির পূর্ববঙ্গ প্রতিনিধি ছিলেন। পরে ইত্তেফাক পত্রিকা বের হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তা হাতে হাতে বিক্রি করতেন। বঙ্গবন্ধু নিজেও সেটা করেছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এ সম্পর্কে অনেক কথাই লিখেছেন। ’ তিনি বলেন, ‘এ কারণে আমিও সাংবাদিক পরিবারের একজন সদস্য। ’

জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, এর সঙ্গে জাতির পিতার সম্পৃক্ততা ছিল। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ১৮, তোপখানা রোডের লাল দোতলা ভবনটি (বর্তমান স্থানের আগের অবকাঠামো, মুক্তিযুদ্ধকালে ক্ষতিগ্রস্ত) ‘পূর্ব পাকিস্তান প্রেস ক্লাব’-এর নামে বরাদ্দ দেয়। ২০ অক্টোবর সাংবাদিক নেতারা দেখা করেন যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। ওই বৈঠকে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। ৬২ বছর পরে সেই জমিতে প্রেস ক্লাবের আধুনিক ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে প্রেস ক্লাবে নৈশভোজে নিমন্ত্রণ জানানো হয় বঙ্গবন্ধুকে। তিনি নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। বলেন, খালি হাতে প্রেস ক্লাবে যাবেন না, জমি বরাদ্দের চূড়ান্ত কাগজ নিয়ে তবে যাবেন। নানা প্রক্রিয়া শেষে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রেস ক্লাবের জমির লিজ চূড়ান্ত দেন। কিন্তু পঁচাত্তরের আগস্টে নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবকে জমি হস্তান্তর করতে পারেননি। তাঁকে হত্যার পর থেমে যায় নতুন জমিতে ক্লাব ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য অনুদান নিয়ে বড় মিডিয়া হাউসগুলোর এগিয়ে না আসায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ফান্ড গঠনে সবাইকে সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

বঙ্গবন্ধু মিডিয়া কমপ্লেক্স : ২.০৬ একর জমির ওপর ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব বঙ্গবন্ধু মিডিয়া কমপ্লেক্স’-এর নকশা করা হয়েছে। আয়তাকার ভবনের প্রতি তলার আয়তন ১৯ হাজার ৮০০ বর্গফুট। প্রথম ১০ তলা মিটিং, কনফারেন্সের জন্য ব্যবহার করা হবে। ১১ তলা থেকে ২৮ তলা পর্যন্ত সংবাদপত্র, দেশি-বিদেশি সংস্থা, টিভি, রেডিওর জন্য ভাড়া দেওয়া হবে। ২৯ তলা থেকে ৩১ তলা পর্যন্ত হেলথ ক্লাব, সুইমিং পুল, জিমনেশিয়াম, গেস্ট হাউস, ডাইনিং হল, সিনেপ্লেক্স প্রভৃতির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে।

জঙ্গি দমনে সাংবাদিকদের পাশে চাইলেন তথ্যমন্ত্রী : অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশে জঙ্গি দমনের যুদ্ধ চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃঢ় পদক্ষেপে জঙ্গিবাদ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তারা পিছু হটেছে। জঙ্গি দমনের এ যুদ্ধে গণমাধ্যম ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা করেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা জঙ্গির রাজনৈতিক মিত্রদের বর্জন করবেন, তাদের বিচার করার জন্য আমাদের পাশে থাকবেন। ’

তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দেশের উন্নয়নের জন্য দুটির ভূমিকা অপরিসীম। গণমাধ্যম শক্তিশালী হলে দেশবিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্রান্ত থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব।


মন্তব্য