kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নেমেই মেহেদীর দিন

নোমান মোহাম্মদ চট্টগ্রাম থেকে   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



নেমেই মেহেদীর দিন

স্বপ্নিল অভিষেক। চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট মেহেদী হাসান মিরাজের। ছবি : মীর ফরিদ

আকাশ থেকে রুপালি শঙ্খচূড় হয়ে রোদ্দুর ছোবল বসায় দিনজুড়ে। কিন্তু ৯২ ওভার বোলিং-ফিল্ডিং করেও তো ওই বিষে নীল হয় না বাংলাদেশ।

কালকের এমন সাফল্য ঝলমলে দিনে ওসব গরম-টরম নিয়ে ভাবতে বয়েই গেছে মুশফিকুর রহিমের দলের!

ম্যাচের আগের দিন আবেগে টইটম্বুর সংবাদ সম্মেলন করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। তা শেষে মাঠের সবুজে হাঁটার সময়ও তাঁর কণ্ঠে ছিল আবেগের খেলা। অভিমানের ঢেউ। এরই ফাঁকে জানিয়ে যান ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের টসটি কত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে, ‘এই উইকেটে যত আগে ব্যাটিং করা যায় ততই ভালো। টস তাই অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ’ কিন্তু লাল-সবুজের ১৬ বছরের টেস্টযুগে দীর্ঘতম বিরতি শেষে খেলতে নেমে ওই টসের ভাগ্য পরীক্ষায় তো জিততে পারেন না মুশফিক। ইংল্যান্ড আগে ব্যাটিং নেওয়ার তাই আশঙ্কাটা গুহা ছেড়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসে ক্রমেই। সাড়ে ১৪ মাস পর টেস্ট খেলতে নামা, এই সময়ে ইংল্যান্ডের ১৬টি টেস্ট খেলা, তাদের ব্যাটিং লাইনের শক্তি-গভীরতা সব কিছুই ছড়ায় শঙ্কার রেণু। পাঁচ দিনের টেস্টের প্রথম দিন শেষেই না ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ!

কিন্তু দিন শেষে চিত্রনাট্যের কী দুর্দান্ত পরিবর্তন! ২৫৮ রানেই যে ইংল্যান্ডের সাত উইকেট তুলে নেওয়া গেছে! সিরিজের প্রথম টেস্টে তাই প্রবলভাবেই রয়েছে বাংলাদেশের সম্ভাবনা। চাই কী তা ইংল্যান্ডের চেয়ে একটু বেশিই!

আর সে জন্য সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব ১৮ বছরের এক তরুণের। মেহেদী হাসানের। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে যিনি পুরোদস্তুর অলরাউন্ডার। যাঁর বোলিংয়ের চেয়ে ব্যাটিং সামর্থ্য নিয়েই আলোচনা ছিল খানিকটা বেশি। কিন্তু কাল অফ স্পিনার হিসেবে তিনি রীতিমতো নাকানি-চুবানি খাওয়ান ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের। দিনভর ৩৩ ওভার বোলিং করে নেন পাঁচ-পাঁচটি উইকেট। সাফল্যের এই ছবিটা যে কল্পনার রঙে আঁকতে পারেননি, দিনশেষে তো নিজেই স্বীকার করে নেন মেহেদী। আর অভিষিক্ত এই তরুণের স্পিনবিষে এভাবে নীল হওয়ার আশঙ্কা ইংল্যান্ড ক্যাম্পেও তো ছিল না নিশ্চিতভাবে।

মেহেদীর সঙ্গে কাল টেস্ট ক্যাপ ওঠে বাংলাদেশের আরো দুজনের মাথায়—সাব্বির রহমান ও কামরুল ইসলাম। একই টেস্টে অন্তত তিন অভিষেকের ঘটনা দেশের ক্রিকেটে অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০০০ সালে ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের কথা আলাদা। এর বাইরে ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বুলাওয়েতে জাভেদ ওমর, মানজারুল ইসলাম, মোহাম্মদ শরীফ ও মুশফিকুর রহমান—এই চারজনের পথ শুরু একসঙ্গে। ২০০২ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কলম্বোয় প্রথম টেস্টে আলমগীর কবির, এহসানুল হক, হান্নান সরকার ও তালহা জুবায়ের চতুষ্টয়ের। দ্বিতীয় টেস্টে অলক কাপালি, তাপস বৈশ্য ও তুষার ইমরান ত্রয়ীর। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ডানেডিন টেস্টে জুনায়েদ সিদ্দিকী, সাজেদুল ইসলাম ও তামিম ইকবালের। আরো দীর্ঘ সময় পেরিয়ে কাল আবার একসঙ্গে তিনজনের টেস্ট পথচলা শুরু। তাতে প্রথম দিনটি বিবর্ণ পেসার কামরুলের। আরেকজন সাব্বির রহমানও ছাড়েন একটি ক্যাচ। কিন্তু এই দুজনের সব ব্যর্থতা পুষিয়ে যায় মেহেদীর বীরত্বে।

ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই অধিনায়ক মুশফিক বল তুলে দেন মেহেদীর হাতে। প্রথম বলেই ইয়া বড় টার্নে পরাস্ত ইংল্যান্ডের অভিষিক্ত বেন ডাকেট। সকালের সূর্য সব সময় দিনের পূর্বাভাস ঠিকঠাক দেয় না। কিন্তু সাতসকালের এই ঘূর্ণিতে বোঝা হয়ে যায় চট্টগ্রামের উইকেটের চরিত্র। মেহেদীর সাফল্যের প্রতিশ্রুতিও যেন মিশে থাকে তাতে। ডাকেট বারকয়েক বেঁচে গেলেও দশম ওভারে আর পারেননি। তাঁকে বোল্ড করে দেন এই অফস্পিনার। পরের ওভারে সাকিব আল হাসান আসেন বোলিংয়ে। দ্বিতীয় বলেই বোল্ড অ্যালিস্টার কুক। ঠিক পরের ওভারে মেহেদীর বলে গ্যারি ব্যালান্সের বিপক্ষে এলবিডাব্লুর আবেদন প্রত্যাখ্যাত। বোলার শুরুতে আবেদন করতে যেন দ্বিধান্বিত। কিন্তু অধিনায়ক মুশফিক দ্রুততম সময়ে চেয়ে বসেন রিভিউ। তাতে ঠিকই আউট ব্যালান্স! ২১ রানে তিন উইকেট হারিয়ে ইংল্যান্ড তখন কাঁপছে থরথর করে।

মেহেদীর পাশাপাশি ওই ‘রিভিউ’ও চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম দিনের আলোচিত ‘চরিত্র’। ইনিংসের প্রতি ৮০ ওভারে উভয় দলের সামনে সুযোগ থাকে দুটি করে ‘অসফল’ রিভিউয়ের। অর্থাৎ যতক্ষণ না কোনো দল দুবার ভুল প্রমাণিত হবে, আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্ষমতা থাকে তাদের। এই সুযোগ নিয়ে আম্পায়ারিংকে যেন রীতিমতো কাঠগড়ায় তুলে দেয় দুই দল। এক মঈন আলীই রিভিউয়ের সৌজন্যে বেঁচে যান পাঁচ-পাঁচবার। আম্পায়ার আউট দেওয়ার পরও নিজে রিভিউ নিয়ে তিনবার। আরো দু’বার আম্পায়ারের আঙুল না ওঠার চ্যালেঞ্জ জানাতে গিয়ে ব্যর্থ বাংলাদেশ। কাল প্রথম দিনের ৯২ ওভারে সাত-সাতটি রিভিউ হয়েছে। ভালো আম্পারিংয়ের জন্য এই দিনটি ভালো বিজ্ঞাপন নয় নিঃসন্দেহে।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নতির বিজ্ঞাপন হিসেবে আবার এই দিনটি যথার্থ। ২১ রানে ইংল্যান্ডের তিন উইকেট ফেলে দেওয়ার পর জো রুট-মঈন আলীর জুটিতে খানিকটা প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। সে জুটিও ভাঙেন মেহেদী। সাকিব আবার বেন স্টোকসকে বোল্ড করলে ১০৬ রানে পাঁচ উইকেট চলে যায়। বাংলাদেশ তখন নিশ্চয়ই প্রতিপক্ষকে ২০০ রানের মধ্যে বেঁধে রাখার স্বপ্ন দেখে। ষষ্ঠ উইকেটে মঈন (৬৮), জনি বেয়ারস্টো (৫২) তা হতে দেন না। কিন্তু শেষ সেশনে এই দুজনের উইকেট তুলে নিয়ে নিজের পাঁচ উইকেট পূরণ করেন মেহেদী। ম্যাচের লাগামও থাকে তাই বাংলাদেশের কাছে।

ইংল্যান্ডের স্কোর সাত উইকেটে ২৫৮ রান—এর চেয়ে অনেক খারাপের আশঙ্কায় দিন শুরু হয়েছিল মুশফিকের দলের। হ্যাঁ, ২১ রানে তিন উইকেট তুলে নেওয়ার পর অবশ্য এর চেয়ে অনেক ভালোর আশাও ছিল। তবে যেখানে শেষ হয়েছে, মন্দ কী! চট্টগ্রামের স্পিনসহায়ক উইকেটে যথেষ্ট লড়াকু রান তুলে ফেলেছে ইংল্যান্ড। যেখানে আবার চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের ব্যাপার রয়েছে। তবু প্রথম দিন শেষে জয়ের বাতিঘর আর অলঙ্ঘনীয় দূরত্বে মনে হচ্ছে না। বিজয়ের স্বপ্ন মনে হচ্ছে না অবাস্তব।

থাক, নিয়ত রংবদলের টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম দিন শেষে অত দূরের চিন্তা করার দরকার নেই। মাঠে ধান পাকতে অনেক দেরি, এখনই ভাত রান্নার কথা ভেবে লাভ কী!


মন্তব্য