kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

সর্বনাশা ইয়াবা

বড় গলদ তদন্তে

রাজধানীতে গত দুই মাসে ১১ লাখ ইয়াবা বড়ি জব্দ করেছে পুলিশ। গত সোমবারই যাত্রাবাড়ী থেকে জব্দ করা হয়েছে ছয় লাখ ইয়াবা। ভয়ংকর এই মাদকের চালান ঢুকছে মূলত কক্সবাজার, টেকনাফ ও আনোয়ারা দিয়ে। তারপর ছড়িয়ে যাচ্ছে ঢাকাসহ সারা দেশে। র‌্যাব-পুলিশের অভিযানে চালান ধরাও পড়ছে মাঝেমধ্যেই। আটক হচ্ছে বাহকরা। তবে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে মূল হোতারা। এ জন্য পুলিশের দুর্বল তদন্তকে দায়ী করা হচ্ছে। প্রভাবশালী কারবারিরা নানাভাবে তদন্তে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে

আশরাফ-উল-আলম ও সরোয়ার আলম   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বড় গলদ তদন্তে

সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক থেকে গত বছরের ৪ জুলাই গভীর রাতে এক লাখ ৭৮ হাজার ২০০টি ইয়াবা বড়ি জব্দ করে র‌্যাব; যার মূল্য পাঁচ কোটি ৩৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা পাচারে ব্যবহূত ট্রাক ও এর চালক ঈশা খাঁকেও আটক করা হয়।

এ বিষয়ে মামলা হয় সাভার থানায়। ঘটনার পর র‌্যাব সাংবাদিকদের জানিয়েছিল, ঈশা খাঁ নিজেই ব্যবসায়ী। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় দেড় বছর। ঈশা খাঁ কার মাধ্যমে ইয়াবা পাচার করেছিলেন, সেই ইয়াবা কোথায়, কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল—আজ পর্যন্ত তদন্ত করে তা বের করতে পারেনি পুলিশ।

গত বছরের ২৭ আগস্ট রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে একটি প্রাইভেট কার আটক করেন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ও অপরাধ তথ্য (দক্ষিণ) বিভাগের সদস্যরা। সে সময় সুমন সিকদার, মায়া আক্তার, নাসিক আহমেদ ওরফে আনন্দ, সামছুল হক, ফারুক হোসেন ও জালালুর ইকরাম ওরফে জুয়েল নামে ছয়জনকে হাতেনাতে আটক করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে জব্দ করা হয় ৩৭ হাজার ইয়াবা বড়ি। এ ঘটনায় মামলা হয় ভাটারা থানায়।

মামলায় উল্লেখ করা হয়, কক্সবাজারের ইয়াবা ব্যবসায়ী ইউসুফ, সিদ্দিক ও সনেট চৌধুরী ইয়াবা চালানের সঙ্গে জড়িত। তাঁরা ঢাকা, কুমিল্লা, নরসিংদী এলাকায় ইয়াবা পাচার করে বিভিন্নজনের কাছে বিক্রি করেন। মামলা তদন্ত শেষে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়া হয় আদালতে। কিন্তু পলাতক ওই আসামিদের নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় তাঁদের আদালতে সোপর্দ করা সম্ভব হয়নি বলে চার্জশিটে উল্লেখ করে পুলিশ।  

মাদক মামলায় ২১ দিনের মধ্যে চার্জশিট জমা দিতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ নিয়ম মেনে চার্জশিটও দেয়। কিন্তু দুর্বল তদন্তের কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান মূল হোতারা।

ইয়াবা বা মাদকদ্রব্য জব্দের সময় হাতেনাতে আটক ব্যক্তিরা ছাড়াও আরো কারো জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করার দায়িত্ব মামলার তদন্ত কর্মকর্তার। তাদের খুঁজে বের করার দায়িত্বও তাঁদের। কিন্তু বিভিন্ন মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিপুল পরিমাণ ইয়াবা জব্দের পর পলাতক ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে বের করতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়ে ইয়াবার উৎস খোঁজা থেকে বিরত থেকেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। পুলিশের দুর্বল তদন্তের সুযোগ নিয়ে বহাল তবিয়তে মাদক কারবার করে যাচ্ছেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।

বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মামলার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এজাহারে মূল হোতাসহ জড়িত অনেকের নাম এলেও পরে আর তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।    

গত ৮ আগস্ট রাতে রাজধানীর সবুজবাগ থানাধীন কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে একটি মাইক্রোবাসে অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল বিভাগের একটি টিম তিন লাখ ইয়াবা বড়ি জব্দ করে। এ ঘটনায় এস এম সালাউদ্দিন,

মো. জাকির ও খায়রুল আমিন নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা পুলিশকে জানান, তাঁদের সঙ্গে থাকা শাহ আজম নামের আরেক ইয়াবা কারবারি পালিয়ে গেছেন। এরপর গত আড়াই মাসেও পুলিশ আজমকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

এ ঘটনায় করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, টেকনাফ সীমান্ত থেকে লাখ লাখ ইয়াবা এনে আসামিরা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। গ্রেপ্তারের পর খায়রুল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে হাতেনাতে গ্রেপ্তার হলেও জবানবন্দিতে তিনি অপরাধ স্বীকার করেননি।

খায়রুলরা কাদের কাছে ইয়াবা পৌছে দিতেন সে উৎস এখনো বের করতে পারেনি পুলিশ।

গত ৫ আগস্ট রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় একটি মাইক্রোবাস থেকে দুই লাখ ইয়াবা জব্দ করে ডিএমপির অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল বিভাগের আরেকটি টিম। এ ঘটনায় সাইফুল ইসলাম কামাল, মো. আলাউদ্দিন ও ইব্রাহিম হাওলাদার নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় মামলা হয় খিলক্ষেত থানায়। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, শহীদ নামের এক আসামি পালিয়ে গেছেন। শহীদ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা সরবরাহের কাজ করেন। কিন্তু তাঁকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। মামলায় তাঁর নাম অজ্ঞাতপরিচয়ই রাখা হয়েছে। আসামিরা কোথায়, কার কাছে ইয়াবার চালানটি সরবরাহের চেষ্টা করেছিলেন তাও বের করতে পারেনি পুলিশ।

গত তিন বছরে মাদকের বড় বড় চালান ঢাকায় এসেছে বলে বিভিন্ন মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ ও র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ সারা দেশে ১৪৭ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী আছে। ইয়াবার কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে তারা। অন্য মাদকও বিক্রি করছে। মিয়ানমার থেকে কৌশলে ইয়াবার চালান বাংলাদেশে নিয়ে আসছে। ভারত থেকে ফেনসিডিল আনছে। তাদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব ও পুলিশ। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ গ্রেপ্তারও হয়েছে। তারা জামিনে বের হয়ে ফের একই কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। যেসব ইয়াবার চালান এরই মধ্যে ধরা পড়েছে সেগুলোর পেছনে কারা রয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

জানা যায়, মূলত থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসছে ইয়াবা। টেকনাফ, কক্সবাজার হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে ভয়ংকর এই মাদক। ২০০২ সাল থেকে নাফ নদী দিয়ে বাংলাদেশে ইয়াবার ঢোকা বাড়তে থাকে। পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্যদের হাত করে চালান নিয়ে আসে। বান্দরবানের চাকঢালা সীমান্ত ও সেন্ট মার্টিনস দ্বীপ দিয়েও ইয়াবার চালান আসছে। পরে সেগুলো কক্সবাজার হয়ে ঢাকায় আনছে পাচারকারীরা।

সম্প্রতি ইয়াবার কয়েকটি বড় চালানসহ বাহকরা গ্রেপ্তার হয়েছে। বড় চালানের মামলাগুলোর নথি থেকে দেখা যাচ্ছে, কেবল বাহকদেরই বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে। দুর্বল তদন্তের কারণে এসব চালানের পেছনের মূল হোতারা বাইরে থেকে যাচ্ছে।

মাদকসংক্রান্ত মামলায় দুর্বল তদন্তের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ফৌজদারি মামলা পরিচালনায় অভিজ্ঞ আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী কালের কণ্ঠকে বলেন, যখন কোনো এজাহার দায়ের হয় এবং এজাহারে একাধিক পলাতক আসামি থাকে, তখন পলাতক ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে বের করবে পুলিশ। আটক মাদকের উৎস বা তা কোথায় চালান হচ্ছিল তাও খুঁজে বের করার দায়িত্ব তদন্ত কর্মকর্তার। এ জন্য প্রথম দায়িত্ব গ্রেপ্তার আসামিদের আদালতে পাঠিয়ে তাদের স্বীকারোক্তি আদায় করা। গ্রেপ্তারের সময় যেসব সাক্ষীর সামনে আলামতের জব্দ তালিকা তৈরি করা হয় তাদেরও জবানবন্দি দিতে আদালতে পাঠানো উচিত। এসব না করায় তদন্তে দুর্বলতা থেকে যায়। আইনের চাহিদা অনুযায়ী সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করার পুলিশের যে দায়িত্ব রয়েছে তা পালন না করায়ই মাদক কারবারের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের সাবেক পিপি সমাজী বলেন, ‘আমার মতে তদন্তে দুটি কারণে দুর্বলতা থাকে। হয় মামলা দায়েরকারী অথবা তদন্ত কর্মকর্তারা ফৌজদারি কার্যবিধি সম্পর্কে জানেন না; অথবা রাষ্ট্রীয় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনি তদন্তে অগ্রসর হন না। ’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, অনেক সময় প্রভাবিত হয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা সঠিকভাবে তদন্ত করেন না। মাদক কারবারিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাদের কোনো লোক গ্রেপ্তার হলে বিভিন্নভাবে তারা তদন্তে বাধা সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক অথবা অর্থের প্রভাব খাটিয়ে রাঘব বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, মাদক মামলায় দুই রকমের তদন্ত হয়। প্রথমে যেকেনো মাদক ধরা পড়ার পর তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে আসামিকে সাজা দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ সাজা দুই বছর। থানায় যখন আরেকটি মামলা হয় তখন ওই মামলার তদন্ত করেন একজন পরিদর্শক। ভ্রাম্যমাণ আদালত আসামিকে সাজা দেওয়ার পর ওই আসামির আইনজীবীরা আদালতে জানান, পুলিশ কোনো তদন্ত ছাড়াই সাজা দিয়েছে। ওই সময় পুলিশ কোনো তদন্ত করেনি, তা সত্য। কিন্তু হাতেনাতে আসামিকে ধরার পরই ভ্রাম্যমাণ আদালত সাজা দেন। কিছু মামলায় পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে চার্জশিট দেয়। এই ফাঁকে আসামিরা আদালত থেকে জামিন নিয়ে নেয়। বাস্তবে কোনো মাদক মামলার তদন্তে পুলিশের কোনো গাফিলতি বা দুর্বলতা নেই।

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ইয়াবাসহ অন্য মাদকের কারবারিদের ধরার চেষ্টা চলছে। ইয়াবার কারবার ঠেকাতে যা যা করা দরকার তাই করা হচ্ছে। তালিকাভুক্ত কারবারিদের রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই।

ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, মাদক কারবারিদের তালিকা করে ধরার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে পুলিশ একাধিক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে। বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে।


মন্তব্য