kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিত্তবান ছাড়া নেই ‘আসল অ্যাম্বুল্যান্স’!

তৌফিক মারুফ   

১৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বিত্তবান ছাড়া নেই ‘আসল অ্যাম্বুল্যান্স’!

সিলেট শহর থেকে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত এক রোগীকে নিয়ে আসা হবে ঢাকায়। ওই রোগীর স্বজনদের একজন ওয়েবসাইট ঘেঁটে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালের ফোন নম্বরে যোগাযোগ করলেন অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য।

জানানো হয় ভাড়া পড়বে ৫০ হাজার টাকা। ঢাকার বাইরে গেলে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৮৫ টাকা হারে নির্ধারণ করা হয়েছে। পরে স্বজনরা ওই রোগীকে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় ঢাকা নিয়ে আসে স্থানীয় একটি অ্যাম্বুল্যান্সে।

আবার রাজধানীর ধানমণ্ডির সোবাহানবাগের জুম নামের একটি অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিস কম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেন মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন এক রোগীর স্বজন। তিনি তাঁর রোগীকে নিয়ে যাবেন ফরিদপুরের থানা রোডের নিজের বাড়িতে। এ জন্য জুম থেকে ভাড়া চাওয়া হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। তবে ওই জুম থেকেই জানানো হয়, এ ছাড়া তাদের কাছে সাধারণ এসি ও নন-এসি অ্যাম্বুল্যান্সও আছে। সাধারণ এসি অ্যাম্বুল্যান্স নিলে ঢাকা থেকে ফরিদপুর শহর পর্যন্ত ভাড়া পড়বে ১০ হাজার টাকা, আর নন-এসির জন্য ভাড়া ৯ হাজার টাকা।

অন্যদিকে ঢাকার শেরে বাংলানগরের জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে রোগী আনার জন্য যোগাযোগ করা হলে ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে জানানো হয়—ভাড়া পড়বে সাড়ে সাত হাজার টাকা। পরে ওই রোগীকে মোহাম্মদপুরের আল মারকাজুল নামের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অ্যাম্বুল্যান্সে মাত্র দেড় হাজার টাকায় নিয়ে যাওয়া হয় ইউনাইটেডে।

ভাড়ায় এত বড় ব্যবধান কেন—জানতে চাইলে ইউনাইটেড হাসপাতালের পরিচালক (মিডিয়া) ডা. সাগুফা আনোয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুসারে একটি অ্যাম্বুল্যান্স যেমন হতে হবে আমাদের অ্যাম্বুল্যান্স ঠিক তাই। আমাদের অ্যাম্বুল্যান্সে পুরোপুরি লাইফ সাপোর্টের সুবিধাসংবলিত ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের হাসপাতালের আইসিইউ বা সিসিইউতে একজন রোগীর জন্য যা যা প্রয়োজন এর সবটাই ওই অ্যাম্বুল্যান্সে দেওয়া আছে। সঙ্গে একজন করে ডাক্তার, নার্স ও প্যারামেডিক্স থাকেন। ফলে খরচ স্বাভাবিকভাবেই বেশি পড়ে যায়। ভালো অ্যাম্বুল্যান্স চাইলে তো ভাড়াও ভালোই লাগবে—এটাই নিয়ম। ’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এ ধরনের অ্যাম্বুল্যান্স কোনোভাবেই গ্যাসে চালানো উচিত নয়, কারণ ভেতরে অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেন থাকে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের বিপদ ঘটতে পারে। তাই আমাদের অ্যাম্বুল্যান্স সব সময়ই অকটেনে চলে। এসব কারণেও ব্যয় বেশি পড়ে যায়। ’

জুম অ্যাম্বুল্যান্সের কর্মকর্তা এস এম মাহাবুল আজিম কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁদের কাছে তিন ক্যাটাগরির অ্যাম্বুল্যান্স রয়েছে। গ্রাহকরা তাঁদের আর্থিক সক্ষমতা অনুসারে যার যেটা প্রয়োজন সেটাই নেন। আইসিইউ সুবিধাসংবলিত অ্যাম্বুল্যান্স সবার পক্ষে নেওয়া সম্ভব হয় না। প্রায় ৯৮-৯৯ শতাংশ গ্রাহকই সাধারণমানের অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে থাকে। আর ১-২ শতাংশ চায় বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্স। আইসিইউসংবলিত অ্যাম্বুল্যান্সে একজন করে ডাক্তার ও নার্স থাকেন। শুধু তাঁদেরই দিতে হয় ১৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া আইসিইউ সুবিধাসংবলিত অ্যাম্বুল্যান্সের গাড়ির মানেও ব্যবধান রয়েছে। এ গাড়ি হচ্ছে ন্যূনতম ৩০০০ সিসির। বানানোই হয়েছে অ্যাম্বুল্যান্স হিসেবে। চলে তেলে। আর সাধারণগুলো হচ্ছে ১৭০০ সিসির মাইক্রোবাস। চলে গ্যাসে। ফলে খরচে তো ব্যবধান থাকবেই।

মাহাবুল আজিম বলেন, ‘সব সরকারি হাসপাতালে আমাদের অ্যাম্বুল্যান্স যেতে পারে না। কোনো কোনো সরকারি হাসপাতাল ঘিরে থাকে স্থানীয় সিন্ডিকেটের লোকজন। তাদের এলাকার প্রাইভেট অ্যাম্বুল্যান্স ছাড়া অন্য অ্যাম্বুল্যান্স ঢুকতে গেলেই বাধা ও মারধরের মুখে পড়তে হয়। যেমন আমরা মহাখালী ক্যান্সার ও বক্ষব্যাধি হাসপাতাল এলাকায় কখনো অ্যাম্বুল্যান্স পাঠাতে পারি না। সেখানে গেলেই স্থানীয়রা ঝামেলা করে। ’

দেশে সরকারি অ্যাম্বুল্যান্সগুলোর প্রায় সবই সাধারণমানের। এগুলোর মধ্যে উন্নতমানের বা জীবনরক্ষাকারী তেমন কোনো উপকরণ নেই। আবার ডাক্তার-নার্সও থাকেন না। ফলে সরকারি অ্যাম্বুল্যান্সের প্রতি রোগীরও আগ্রহ অনেকটা কম। তবে একই ধরনের বেসরকারি অ্যাম্বুল্যান্সগুলোর ভাড়ার তুলনায় সরকারি অ্যাম্বুল্যান্সের ভাড়া অনেক কম। কিলোমিটার হিসাবে এ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার হাসপাতালে দুটি অ্যাম্বুল্যান্স আছে। কিন্তু দুটোই সাধারণমানের। এর ভেতরে বেড ও স্ট্রেচার ছাড়া আর কিছুই নেই। প্রয়োজন হলে হাসপাতাল থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে দেওয়া হয়। আর ভাড়া নেওয়া হয় সরকার নির্ধারিত রেটে। ’

এদিকে গত শনিবার ঢাকা মেডিক্যালে বহিরাগত অ্যাম্বুল্যান্সের চাপায় চারজনের মৃত্যুর ঘটনার পর ওই হাসপাতালের সামনে থেকে প্রশাসনের ভয়ে সব প্রাইভেট অ্যাম্বুল্যান্স সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে তিন দিন ধরে ওই ঢাকা মেডিক্যালের রোগী ও লাশ বহনের জন্য অ্যাম্বুল্যান্স পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ বিষয়টিকে ধর্মঘট বলে প্রচার চালালেও আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মঘট পালনের কথা বলেনি কেউ। এমন অবস্থার মধ্যেই গতকাল সোমবার বিকেলে অন্য এলাকার একটি অ্যাম্বুল্যান্স ঢাকা মেডিক্যাল থেকে একজনের মৃতদেহ নিতে গেলে ওই এলাকার অ্যাম্বুল্যান্স সিন্ডিকেটের লোকজন বাধা দেয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত র্যাবের গোয়েন্দা টিমের সদস্যরা তাত্ক্ষণিক তানভীর ও হাবিব নামের দুই দালালকে আটক করে। পরে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে মোবাইল কোর্টে ওই দুই দালালের বিচার করে ছয় মাস করে কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিত্সক কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোর অ্যাম্বুল্যান্স সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে রোগীর ভোগান্তিও যেমন কমবে, তেমনি প্রাইভেট অসাধু অ্যাম্বুল্যান্স ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যও অনেকটা কমে যাবে। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠান ভালো মান বজায় রেখে অ্যাম্বুল্যান্স সরবরাহের ব্যবসা করছে সরকারের উচিত তাদের একটি গাইডলাইনের মধ্যে নিয়ে আসা। তখন সব মিলিয়ে দেশের অ্যাম্বুল্যান্স ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

এদিকে গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সিএমএসডিতে বিভিন্ন হাসপাতালের জন্য সরকারি অ্যাম্বুল্যান্স বিতরণকালে বলেছেন, অদক্ষ চালক ও হেলপার দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স চালালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্ত্রী বলেন, জীবন বাঁচানোর অ্যাম্বুল্যান্স দিয়ে জীবন কেড়ে নেওয়া হলে তাদের রেহাই দেওয়া হবে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সব মানুষের পক্ষে বেশি ভাড়া দিয়ে উন্নতমানের অ্যাম্বুল্যান্স ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। তাই কম ভাড়ায় চলতে পারে এমন কিছু অ্যাম্বুল্যান্সও রাখা দরকার। তবে তাঁরাও যেন ন্যূনতম একটি মান বজায় রাখে সেদিকে আমরা খেয়াল রাখব। ’

মহাপরিচালক বলেন, ‘আমরা যেমন গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি, তেমনি সব ধরনের অ্যাম্বুল্যান্সকেই সরকারি স্বাস্থ্য বাতায়নের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। এতে অনেক সুফল পাওয়া যাবে। ’

এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে চালু করা স্বাস্থ্য বাতায়নের ‘১৬২৬৩’ নম্বরে ফোন করলে সেখান থেকে সরাসরি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা, বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিষয়ে খোঁজখবর ও পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিসের সুবিধার কথা জানানো হয়। তবে এই কলসেন্টার থেকে শুধু বিভিন্ন হাসপাতাল ও অ্যাম্বুল্যান্স সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ফোন নম্বর দেওয়া হয়। যোগাযোগের দায়িত্ব থাকে গ্রাহকের ওপর। ফলে এর সঠিক মাত্রায় সুফল পায় না মানুষ। এ ক্ষেত্রে ওই কল সেন্টার থেকে সরাসরি অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া ঠিক করে দেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা থাকলে সেটা মানুষের জন্য বেশি উপকার হবে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। কারণ কল সেন্টার থেকে এখন যে সেবা দেওয়া হয় সেটা অন্য অনেক কল সেন্টার বা ইন্টারনেট থেকেই সহজে পাওয়া যায়।

৪০টি অ্যাম্বুল্যান্স বিতরণ : দেশের বিভিন্ন এলাকার সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য ৪০টি অ্যাম্বুল্যান্স বিতরণ করা হয়েছে গতকাল সোমবার। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এসব অ্যাম্বুল্যান্সের চাবি সংশ্লিষ্ট এলাকার কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেন। আগামী মাসে আরো ১৪টি অ্যাম্বুল্যান্স হস্তান্তর করা হবে বলেও অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

এ সময় মন্ত্রী কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, কোনো অ্যাম্বুল্যান্স ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি এ সময় এসব অ্যাম্বুল্যান্সের দিকে খেয়াল রাখার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক, সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।


মন্তব্য