kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঋণ সহায়তা ৫০% বাড়াবে বিশ্বব্যাংক বাড়বে সুদও

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ঋণ সহায়তা ৫০% বাড়াবে বিশ্বব্যাংক বাড়বে সুদও

ঢাকার বিমানে ওঠার সময়ই যেন বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য পকেটে ডলার ভরে নিয়েছিলেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। রবিবার পড়ন্ত বিকেলে ঢাকায় নামার পর অপেক্ষায় ছিলেন ভোরের।

গতকাল সোমবার সকাল সকাল সচিবালয়ে আসেন, সেখানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা বৈঠক করেন। তার পরই এলো সুখবর। আগামী তিন বছরে বাংলাদেশের জন্য ঋণ সহায়তা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিলেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট। সে হিসাবে তিন বছরে বাংলাদেশের পাওয়ার কথা প্রায় ৭৫০ কোটি ডলার। আর দারিদ্র্যজয়ী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দেহ থেকে অপুষ্টি ঝেড়ে ফেলতে আগামী দুই বছরে আরো ১০০ কোটি ডলার (প্রায় আট হাজার কোটি টাকা) সহায়তারও ঘোষণা দিলেন তিনি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের পর বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টকে সঙ্গে নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আসেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সেখানে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অসামান্য সফলতার প্রশংসা করে জিম ইয়ং কিম বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নে ঘনিষ্ঠভাবে সহায়তা করবে বিশ্বব্যাংক।

শিশুদের জন্য সহায়তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বলেন, আগামী দুই বছরে বর্তমানের চেয়েও ১০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত সহায়তা দেবে বিশ্বব্যাংক। এ অর্থ বাংলাদেশের শিশুদের অপুষ্টির পাশাপাশি তাদের খর্বাকৃতি দূর করতে সহায়তা করবে।  

নিজেদের তহবিল বাড়িয়ে বিশ্বজুড়েই ঋণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ফলে সব দেশেই বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তা ৫০ শতাংশ হারে বাড়বে, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুলাই নাগাদ আগামী তিন বছরে সংস্থাটির কাছ থেকে ৫০০ কোটি ডলার পাওয়ার কথা রয়েছে। জিম ইয়ং কিম জানালেন, তা বেড়ে প্রায় ৭৫০ কোটি ডলারে পৌঁছবে। তবে সুসংবাদ দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দিলেন, এ জন্য বাড়তি সুদও গুনতে হবে বাংলাদেশকে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর থেকেই ঋণের সুদের হার বাড়ানো ও শর্ত কঠিন করার কথা বলে আসছে বিশ্বব্যাংক। সর্বশেষ গত বছরের ৩০ অক্টোবর বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট কাইল পিটারস অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবুদল মুহিতের সঙ্গে দেখা করে ঋণের সুদের হার বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার (আইডিএ) আওতায় বিশ্বব্যাংক এখন ঋণের বিপরীতে ০.৭৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ করে। অর্থাৎ ১০০ টাকা ঋণ নিলে সার্ভিস চার্জ আসে ৭৫ পয়সা। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা এখন ঋণের সুদের হার ৪ শতাংশ করতে চায়। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের এমন প্রস্তাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে অর্থমন্ত্রী মুহিত জানান, জাতিসংঘের কাছ থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেতে আরো কয়েক বছর সময় লাগবে। ওই সময় পর্যন্ত সুদের হার বিদ্যমান অবস্থায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালের আগে ঋণের সুদের হার না বাড়াতে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোকে অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। গতকাল বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকেও একই অনুরোধ জানান অর্থমন্ত্রী।

সহযোগী সংস্থা আইডিএর আওতায় স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশকে দুই হাজার ৪০০ কোটি ডলার সহায়তা করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে বাংলাদেশকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল সংস্থাটির। এর মধ্যে প্রথম দুই অর্থবছরে ২১০ কোটি ডলার ছাড় হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে নিজের বক্তব্যের শুরুতেই দারিদ্র্য জয়ে বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করেন বিশ্বব্যাংকের প্রধান। তিনি বলেন, “দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ স্মরণ রাখার মতো সফলতা দেখিয়েছে। সেটি উদ্যাপন করতেই আমি বাংলাদেশে এসেছি। দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্যের কারণেই ‘বিশ্ব দারিদ্র্যমুক্ত দিবস’ উদ্যাপন করতে আমি এ দেশে এসেছি। ” প্রসঙ্গত, গতকালই ছিল বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস।

কেবল দারিদ্র্য জয়ই নয়, কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনেও বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে। সেই প্রসঙ্গ টেনে জিম ইয়ং কিম বলেন, কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ৬ শতাংশ হারে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এটি খুব শিগগির ৭ শতাংশে পৌঁছবে। উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত রাখতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নারী ও শিশুর পুষ্টিহীনতা দূর করার পাশাপাশি অবকাঠামো খাতে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।

প্রসঙ্গত, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে তিক্ততা যোগ হয় পদ্মা সেতুকে ঘিরে। এ সেতু নির্মাণে সংস্থাটি ১২০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার চুক্তি করেও পরে তা স্থগিত রাখে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে। পরে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এ সেতু নির্মাণ করছে।

এ প্রসঙ্গে মতামত জানতে চাইলে তা এড়িয়ে গিয়ে কৌশলী হন জিম ইয়ং কিম। তিনি বলেন, ‘এ সেতুর গুরুত্ব আমরা বুঝি। আমরা এ সেতুতে অর্থায়ন প্রসঙ্গে আলোচনা চালিয়ে আসছিলাম, কিন্তু সরকার সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে দেয়। তবে পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের যে ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা ছিল, সেই অর্থ আমরা ফেরত নিইনি। পরে তা বাংলাদেশের অন্যান্য খাতের উন্নয়নে দেওয়া হয়েছে। যা হোক, বাংলাদেশের সমৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য আরো কিভাবে সহায়তা করা যায়, সেই বিষয়ে আমরা আরো জোরালোভাবে উপায় খুঁজছি। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। ’

পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংক সরে গেলেও এ সেতু নির্মাণে যে ঋণ দেওয়ার কথা ছিল, সংস্থাটি তা বাংলাদেশের অন্যান্য খাতে দিয়েছে বলে জানালেন অর্থমন্ত্রীও। মুহিত জানান, ‘বিশ্বব্যাংক আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশের যোগাযোগ অবকাঠামোসহ সব খাতেই বিশ্বব্যাংক সহায়তা দিয়ে থাকে। পদ্মা সেতুতে যে তহবিল বিশ্বব্যাংকের দেওয়ার কথা ছিল, তারা অন্যান্য প্রকল্পে সেটি দিয়েছে। এর মধ্য দিয়েই বিষয়টির সমন্বয় হয়েছে। ’

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সেই সময়কার টানাপড়েনের সম্পর্ক কেটে গেছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। আশা করি, সংস্থাটি তা পূরণ করবে। ’

আগামী দিনে বাংলাদেশে সহায়তার ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে জানিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রধান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির প্রভাব মোকাবিলা ছাড়াও বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে আর কোন কোন ক্ষেত্রে সহায়তা করা যায়, আগামী দুই দিনে তা খতিয়ে দেখব আমরা। ’

বৈঠকে জিম ইয়ং কিমের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাংকের ৯ সদস্যের প্রতিনিধিদলে সংস্থার দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যানেট ডিক্সন, বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল রোমার এবং ঢাকার আবাসিক প্রতিনিধি চিমিয়াও ফান উপস্থিত ছিলেন।

আর অর্থমন্ত্রী মুহিতের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে ছিলেন অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহউদ্দিন।


মন্তব্য