kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ পরিকল্পনা

চাকরির শুরুতেই ফ্ল্যাট সরকারি কর্মকর্তাদের

আশরাফুল হক রাজীব   

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



চাকরির শুরুতেই ফ্ল্যাট সরকারি কর্মকর্তাদের

ফাইল ছবি

সরকারের নবীন কর্মকর্তারা চাকরিজীবনের শুরুর দিকেই ফ্ল্যাটের মালিক হবেন। সহজ কিস্তি ও সুদে ঋণ দিয়ে চাকরির চার বছরের মধ্যেই ফ্ল্যাটের চাবি তুলে দেওয়া হবে তাঁদের হাতে।

নবীন কর্মকর্তাদের দুর্নীতি থেকে দূরে রাখা এবং সরকারি চাকরিতে মেধাবীদের আকৃষ্ট করার জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঝিমিয়ে পড়া বেসরকারি আবাসন খাতকে চাঙ্গা করতে তাদের দিয়েই এসব ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ আগ্রহে এ-সংক্রান্ত নীতিমালার খসড়া তৈরি করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সুশাসনবিষয়ক ইউনিট। গতকাল সোমবার এ-সংক্রান্ত নীতিমালা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে তাদের মতামত চাওয়া হয়েছে।

এর আগেই প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়কে বিবেচনায় রেখে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় নিজস্ব মালিকানার অব্যবহৃত জমিতে বহুতল ভবন (ফ্ল্যাট) নির্মাণ করার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একইভাবে বিভিন্ন স্থানীয় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক, রাসিক,  চউক, খুউক) পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব আবুল কালাম আজাদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী এ সুবিধা পাবেন। চাকরিজীবনের শুরুতে একটি ফ্ল্যাটের চাবি তুলে দিতে পারলে দুর্নীতি হ্রাস পাবে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হলে কেউ আর আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হবে না। নবীন কর্মকর্তারা আন্তরিকতার সঙ্গে কর্মসম্পাদনে উৎসাহিত হবেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই এ-সংক্রান্ত নীতিমালার খসড়া করা হয়েছে। ’

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রায় ১৩ লাখ সরকারি কর্মজীবীর মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশকে আমরা ভাড়ায় বাড়ি দিতে পারি। এ কারণেই সরকারি বাড়ি বরাদ্দ পেতে এত চাহিদা। বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা বর্তমান সরকারের অবশিষ্ট মেয়াদ তিন বছরের মধ্যে ৮ শতাংশকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। আর নবীন কর্মকর্তাদের ফ্ল্যাট দেওয়ার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে ভাড়ায় বাড়ি পাওয়ার চাহিদা কমবে। এখানে বেসরকারি খাতও লাভবান হবে। ’

সরকারি কর্ম কমিশন পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে (পিএসসি) উদৃ্লত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ২৬ হাজার ১৭৯ জনকে ক্যাডার এবং ২৮ হাজার ৪১৬ জনকে ননক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ৩৪তম বিসিএসে দুই হাজার ১৭৭ এবং ৩৫তম বিসিএসে দুই হাজার ১৫৮ জনকে ক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশালসংখ্যক ননক্যাডার কর্মকর্তাকে নবম গ্রেড পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৩৬ ও ৩৭তম বিসিএসের নিয়োগ কার্যক্রম চলছে। বছরওয়ারি বর্তমান নিয়োগের হার অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরে অন্তত পাঁচ থেকে ১০ বছর চাকরির যোগ্যতাসম্পন্ন (নবম থেকে পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত) ক্যাডার ও ননক্যাডার পদে কর্মকর্তার সংখ্যা হবে আনুমানিক ৫০ হাজার। এ ছাড়া এরই মধ্যে ১০ বছরের বেশি সরকারি চাকরি করছেন কিন্তু সরকারি সুবিধায় কোনো ফ্ল্যাট, প্লট বা বাড়ি অর্জন করেননি এমন কর্মকর্তার সংখ্যাও ৩০ হাজার হবে। নবীন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ জাতীয় কর্মকর্তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন।

পিএসসির তথ্য পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর নতুন কর্মকর্তার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি নিজ মালিকানার ফ্ল্যাট নেই এমন কর্মকর্তার সংখ্যাও প্রচুর। বাস্তবতার বিচারে এত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তার ফ্ল্যাট নির্মাণ ও বিতরণ সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নেই। ব্যাপক চাহিদার বিপরীতে সরকারি সংস্থার ফ্ল্যাট নির্মাণের মতো একক পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে অধিক কর্মকর্তাকে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মডেল অনুসরণ করে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে। এ মডেল গ্রহণ করা হলে সরকারি কর্মকর্তারা সহজেই নিজ পছন্দ অনুযায়ী ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হবেন। এর ফলে বিশালসংখ্যক কর্মকর্তাকে এ সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হবে। অন্যদিকে আবাসন খাতের মন্দাবস্থা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই খসড়া নীতিমালাকে গাইডলাইন ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়কে পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে।

খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, জাতীয় বেতন স্কেলের নবম বা এর ওপরের গ্রেডের সব বেসামরিক কর্মকর্তা এ নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত হবেন। তবে নবীন কর্মকর্তারা অগ্রাধিকার পাবেন। নবীন কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার অক্ষুণ্ন রেখে কর্মকর্তাদের বয়স গ্রুপ অনুযায়ী তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করে কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩০ থেকে ৩৫ বছরের বয়সী কর্মকর্তাদের জন্য ৫০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ থাকবে। ৩৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীরা পাবেন ৩৫ ভাগ কোটা। অবশিষ্ট ১৫ শতাংশ কোটা পাবেন ৪৬ থেকে ৫২ বছর বয়সী কর্মকর্তারা। এই ফ্ল্যাট পেতে হলে চাকরি স্থায়ী হতে হবে এবং আবেদনের তারিখে বয়স হতে হবে ন্যূনতম ৩০ বছর। ৫২ বছরের বেশি বয়সী কর্মকর্তারা আবেদনের যোগ্য বিবেচিত হবেন না। স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী হলে একজন বিবেচিত হবেন। সরকারি সংস্থা থেকে আগে কোনো আবাসন সুবিধা পেলে তাঁরা যোগ্য বিবেচিত হবেন না। নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। একটি আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি এসব আবেদন নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করবে। যোগ্য কর্মকর্তাদের ফ্ল্যাট কেনার জন্য সরকারি তফসিলি ব্যাংক ঋণ দেবে। ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত পেনশন সুবিধা ও সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাট ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকের কাছে বন্ধক থাকবে। সর্বোচ্চ ৮৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া যাবে। সুদের হার ব্যাংক রেটের বেশি হবে না। ফ্ল্যাট হস্তান্তরের তারিখ থেকে কিস্তি শুরু হবে। ঋণের কিস্তি কর্মকর্তার বাড়িভাড়া ভাতার বেশি হবে না। ঋণের কিস্তি পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রথমে মূলধন সমন্বয় করা হবে। ঋণ পরিশোধ শেষ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মারা গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সমস্যার সমাধান হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, নবীন কর্মকর্তাদের ফ্ল্যাট দেওয়ার সিদ্ধান্তটি খুবই আচমকা এসেছে। এটা বিস্ময়করও বটে। কারণ সরকারের বর্তমান নিয়ম-নীতি সবই এসবের বিপরীত। সরকারি আচরণবিধি অনুযায়ী সরকারের কর্মচারীরা ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন না। তাঁরা এ ধরনের একটি সম্পদ অর্জন করলে সেটি তাঁদের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করা হয়।


মন্তব্য